গল্প: #পথচলা
লেখা> আবির হাসান নিলয়
...
"আপনি কি এমনিই গোমড়া মুখো"?
বৈশাখ মাস। আকাশে উড়ছে না না রং বেরং এর ঘুড়ি। নিলয় এক মনে তাকিয়ে আছে আকাশে ওড়া ঘুড়িগুলোর দিকে। বছরের ফাল্গুন মাস থেকে শুরু করে জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ অবদি ঘুড়ি ওড়ানো যায়।
ছতলা বিল্ডিং এর ছাদে দাড়িয়ে শহরতলী ছেলে মেয়ে এমনকি বড়রাও ঘুড়ি উড়াচ্ছে সেটা এই ছাদের এক কর্ণারে দাড়িয়ে সবার ঘুড়ি উড়ানো দেখছে।
- আপনি কি কথা কম বলেন, নাকি মেয়েদের সাথে কথাই বলেন না?
মেয়েটির কথা শুনে চমকে ওঠে নিলয়। এতক্ষনে নিলয় খেয়াল করনি মেয়েটি পাশে এসে দাড়িয়ে কথা বলছে। খানিকটা চুপ থেকে নিলয় বললো..
- নাহ, আসলে ঘুড়ি ওড়ানো দেখছি। তাই খেয়াল করিনি।
- হুমম,,আচ্ছা দেখুন না আকাশটা আজ কত রঙিন লাগছে। আজ আকাশ যেন বহুরুপি ঘুড়ির নানা রঙে সেজেছে।
- হুমম, কিন্তু আমাকে আপনি গোমড়া মুখো বলেছেন কেনো?
- বাহ, এটা আপনি শুনতেও পেয়েছিলেন? আমি তো মনে করেছি শুনেন নি আপনি। কালা আপনি..হি হি হি..
নিলয় মেয়েটির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকায়। মেয়েটির হাসিতে যেন পবিত্রতার ছোয়া খেলা করছে। কি মাতাল করা সেই হাসি। নিলয় পলকহীন তাকিয়ে হাসির মায়াতে পড়তে লাগল।
.
মেয়েটি হল এই ছতলা বাড়িটার মালিকের মেয়ে। নাম নীলাভা। তারা থাকে পাঁচ তলাতে আর আমরা থাকি উপরের ছ তলায়।
কখনো কথা হয়নি মেয়েটির সাথে। খালি নামটা জেনেছিলাম ওর ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে।
সাথে মাঝে মাঝে সিড়ি দিয়ে ওঠা নামার সময় দেখা হয়ে যেত দুজনার। আবার নিলয় যখন সাইকেল নিয়ে বের হতো মেয়েটি তার সাইকেল এর সামনে অকারনে দাড়িয়ে তাকিয়ে থাকতো। কথা বলেনি কেউ কখনো কারো সাথে।
.
নীলাভা নিলয়ের দিকে তাকিয়ে দেখল, ছেলেটি এক দৃষ্টি দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। কেমন মায়াবী সেই চাহনি। নিলয়ের সেই চাহনির গভীরতার মাঝে খুজতে লাগল কিছু অব্যক্ত কথোপকথন।
- এভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো? (নীলাভা)
- ইয়ে মানে, না আসলে, কই নাতো।
- মিথ্যেও বলতে পারেন আপনি, বাহ বেশ ভালো তো।
নিলয় লজ্জায় মাথাটা নিচু করে নেয়। নিলয়রা এই বাড়িতে এসেছে তা প্রায় দেড় বছর হল। নিলয় চুপচাপ একটা ছেলে। দূরের প্রকৃতি বা কোনো সৌন্দর্য এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে তা দেখাই হল ওর প্রধান কাজ।
ঝাকড়া চুলের সাথে চোখে চশমা পরা। ছেলেটির মাঝে কেমন উদাশীতনতার প্রতিচ্ছবি বেশ ভাবে বোঝা যায়। আর এসব দেখে দেখে নীলাভা কখন যে ছেলেটির প্রেমে পড়ে গেছে তা টেরও পায়নি।
- আপনি আর কাগজের প্লেন বানান না কেনো? (নীলাভা)
- আমি কাগজের প্লেন বানায় আপনি তা জানেন?
- হুমমম....জানি। আপনার ঐ রঙিন কাগজের বানানো প্লেনগুলো বানিয়ে যখন দুর আকাশে ওড়ানোর চেষ্টাতে ছুড়ে দেন সেগুলো যে বাতাসের টানে উড়ে আসে আমার ব্যালকনির সামনে। প্লেন গুলো দেখতে বেশ সুন্দর লাগে। একদিন খোজ নিয়ে জানতে পারি এটা আপনারই কাজ।
- ওহ আচ্ছা..আসলে অফিসের কাজে কদিন ধরে ব্যস্ত আছি তো তাই ঠিকঠাক সময়মত প্লেন বানাতে পারছি না।
দুজনেই চুপ। আবার তারা সেই উড়া ঘুড়ির রঙিন আকাশ পানে চেয়ে রইল। কারো মুখে কোনো কথা নেই। নীলাভা মনে মনে ভাবছে," এ নিলয় গাধাটা যেন আগে থেকেই আমার সাথে কথা বলুক। কিন্তু সে তো কিছুই বলছে না। খালি সামনে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে আছে। কী দেখে যে আমি এই ছেলেটার প্রেমে পড়লাম কে জানে"?
এ দিকে নিলয় ভাবে, "কতদিন ধরে এই ঘনকালো চুল, সাথে ঠোটে সবসময় লাগিয়ে রাখা হালকা লিপিষ্টিক এর সাথে মিষ্টি হাসির মেয়েটির সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছি কিন্তু কোনো এক অজানা ভয়ে বলতে পারিনি"
দুর থেকে মেয়েটির হাসি, তার পাগলামি নিলয়কে তার অনুভুতির দরজাতে তোলপাড়োতা এনে দিয়েছে। মিষ্টি হাসির মেয়েটির প্রেমেও যে নিলয় পড়েছে সেটা আর বুঝতে বাকি নেয়। তাই নিলয় চুপ করে ভাবছে কি ভাবে নিলাভার সাথে কথা বলা যায়।
- আপনি কি কাগজের প্লেন ওড়াতে ভালোবাসেন? (নিলয়)
- হুমমম,,খুব ভালোবাসি। কালি প্লেন নয় ঐ ঘুড়ি ওড়াতেও ভালোবাসি।
- তাহলে উড়ান না কেনো?
- আব্বু বকা দেয়। আর তাছাড়া আমি ঘুড়িও বানাতে পারি না। বাজার থেকে কেনা ঘুড়ি উড়ানোতে কোনো মজা নেই। নিজে না বানিয়ে উড়ানোতে মজাটা অনেক বেশিই।
- হুমম, ঠিকই বলেছে।
দুজনেই আবার চুপ। এতদিনে কথাগুলো দুজনের মনের অন্তরালে সাজানো ছিল একে অন্যকে মনের মাধুবী সাজিয়ে বলবে বলে। কিন্তু আজ কেউই সেই জমানো কথা বলতে পারছে না। মনের মাঝে দুজনার সেই জমানো কথার ফোয়ারা শুকিয়ে জমা হচ্ছে কি সব উদ্ভট কথা।
.
নীলাভা আকাশ পানে চায়। নিলয়ও সেই দৃষ্টির বাইরে নয়। দুজনে ঐ দুর পবনে উড়ে চলা শক্খ ও গাংচিলের দিকে তাকিয়ে আছে। কত স্বাধীনতা চিলের মাঝে। নীলাভা নিলয়ের দিকে তাকায়। মুখের নিচে দাড়ির কাছে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। মাথাটা উচু করে তাকিয়ে আকাশ দেখছে।
- তো, মি. নিলয় আপনি পারেন না ঘুড়ি ওড়াতে? (নীলাভা)
- হুম পারি।
- একা ঘুড়ি উড়িয়ে যে কোনো মজা নেই।
- হুমম তা ঠিক
মেয়েটি দেখতে কি অপরুপা। একবার দেখলে ইচ্ছে করে, সারাক্ষন তাকিয়ে থাকি। কিন্তু আজ নিলয় মেয়েটির দিকে তাকাতে পারছে না। কারন, সে যে আজ সৌন্দর্যের খুব কাছে চলে এসেছে। যা তার চোখ ঝলসে যাচ্ছে। লজ্বা, সংকোচতা নিলয়কে বাধা দিচ্ছে নীলাভার দিকে তাকাতে।
নীলাভা আবার আকাশে ওড়া ঘুড়ির দিকে তাকিয়ো ভাবছে, "ছেলেটা কি গর্দভ রে। প্রতিদিন দুর থেকে তাকিয়ে থাকবে। অথচ আজ একবারো তাকাচ্ছে না। আর আমি রোজ এত কথা বলি কিন্তু আজ কোনো কথায় বের হচ্ছে না। কি যে অস্বস্থি লাগছে। ইচ্ছে করছে হাম্বাটার গালে কষে চড় দিই। কেনো সে তাকাচ্ছে না, কেনো সে কথা কথা বলছে না কে জানে?
- এই ছেলে আপনার কি কোনো গার্লফ্রেন্ড আছে? (নীলাভা)
- নাহ,কেনো বলুন তো?
- এমনি, না থাকাটাই ভালো।
- তা আপনার বয়ফ্রেন্ড আছে?
- নাহ
- গুড
দুজনেই মনের অজান্তে হাসছে এমন উদ্ভট প্রশ্ন করে। নীলাভা ভাবে, "ছেলেটা আস্ত হাম্বা একটা। হাম্বাটা কি বোঝে না যদি বয়ফ্রেন্ড থাকতো তাহলে তোর সাথে এতক্ষন কথা বলতাম? আর ওর কেইবা গার্লফ্রেন্ড হবে? দেখতে একদম হাম্বার মতই কোনো মেয়ে পছন্দ করবে নাকি? আমি যে কেনো করলাম এই বোকাটাকে তা ভেবেই পাচ্ছি না। আচ্ছা ও কি আমাকে পছন্দ করে? কী জানি, হয়ত করে, তাকিয়ে থাকে তো সবসময় সেটা দেখি। তাহলে বলছে না কেনো সেটা?
- আপনাকে একটা কথা বলি? (নিলয়)
- হুমম বলুন।
- আপনাকে না হলুদ শাড়িতে বেশ মোহনীয় লাগছিলো। খুব সুন্দর লাগছিল আপনাকে। হাতে ছিল লাল চুড়িদার। হাতের গোছা ভরা মেহেদির রঙে রাঙানো নকশা। খোপাতে লাল ফুল। ঠোটে হালকা লিপিষ্টিক। সেদিন আপনাকে বেশ সুন্দর লাগছিল।
- হুমম,সেদিন পহেলা বৈশাখ ছিলো তো তাই বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছিলাম।
- ওহ,,ঐ দিন আপনার পিছু পিছু সাইকেল চালিয়ে মেলাতে গিয়েছিলাম। সারাটা সময় আপনাকে দেখেছি। ভেবেছিলাম আপনি আমাকে দেখতে পেয়ে কাছে এসে তাকানোর অপরাধে বকা দিবেন। আর সেই সুযোগে কথা বলতে পারবো। কিন্তু আপনি একবারের জন্য তাকাননি। মেলাতে ঘুরতে ব্যস্ত ছিলেন।
- হুমম, বান্ধবিরা ছিলো তো তাই খেয়াল করিনি।
দুজনেই আবার চুপ। চারিদিকে সন্ধ্যার কালো রং তার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। আকাশে দুজনে তাকিয়ে দিল ঘুড়িগুলোও খুব একটা নেই। দূর পবনে উড়ে চলা শংখ চিলের দল তার ঘরে উড়ে চলার রাস্তায় ডানা মেলেছে। একটু দুরে বড় কদম গাছটার মাঝে সারাদিনের পাখিগুলো বাসায় এসে তাদের আলাপচারিতা সারছে। একটু পরেই শুনো যাচ্ছে ঝি ঝি পোকার বিকট শব্দ। ছাদে দাড়িয়ে দুজন মানবী এই সন্ধ্যার রুপে নিজেদের সাজাচ্ছে।
নিলয় নীলাভার দিকে তাকালো। মেয়েটি আনমনে তাকিয়ে আছে দুর গগনে। নিলয় ভাবছে, ভালোবাসি কথাটি বলবো কি না নীলাভাকে। কিন্তু মেয়েটি কি আমাকে ভালোবাসে? যদি সে না বাসে তাহলে আমি যদি বলি সে রেগে যাবে। আর যদি সে বাসে তাহলে কেনো বলছে না কেনো আমাকে"? নিরাবতা ভেঙ্গে নিলয় বললো...
- একটা কথা বলতে পারি?
- হুমমম বলুন।
- নাহ থাক, অন্যদিন বলবো।
দুজনেই আবার চুপ। নীলাভা সেই থেকে ভাবছে, সেদিন পহেলা বৈশাখে আড়চোখে তাকিয়ে দেখছিলাম চশমা পরা এই গাধাটাকে। কালো গেন্জিতে বেশ মানিয়েছিল হাদারামটাকে। দেখেছিলাম, আমার আশে পাশে বারবার সাইকেল চালিয়ে ঘুরতে। ভেবেছিলাম ও এসে কথা বলবে কিন্তু হাম্বাটা কথা না বলেই খালি চেয়ে চেয়ে দেখছিলো।
আচ্ছা ও কেনো সেদিন আমার পিছু পিছু ঘুরেছিল? কেনো সে আমাকে দেখছিল বারবার? এর আগেও যতবার দেখা হয়েছে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেছে ও। কিন্তু কেনো? তবে কি এই গাধাটা আমাকে ভালোবাসে? যদি বাসে তাহলে এতক্ষনে বলছে না কেনো আমায়? উফফ, ইচ্ছে করছে নীল টি শার্ট পরা হাদাটাকে ছাদ থেকে ফেলে দিই।
- কি হল বলুন কি বলবেন? (নীলাভা)
- নাহ থাক, কিছু না। সন্ধ্যা নেমে গেছে যান বাসয় যান।
- হুমম যাবো।
ঐ ছেলে আমি কখন যাবো কি না যাবো তোকে বলতে বলেছি? ইচ্ছে করছে দিই একটা চড়। আচ্ছা হাম্বাটাকি জানে না মেয়েরা ভালোবাসলেও তা বলতে পারে না? নীলাভা এসব ভাবছে। তখনি নীলাভা বললো....
- আচ্ছা সেদিন কেনো আপনি আমার পিছু পিছু মেলাতে গিয়েছিলেন? কেনো বারবার তাকাচ্ছিলেন? কেনো রোজ দুর থেকে তাকিয়ে থাকেন আমার দিকে?
নিলয় চুপ। নীলাভার মুখের দিকে তাকালো সে। নীলাভা নিচের ঠোট বাকা করে নিলয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। পলকহীন হয়ে দুজন দুজনার দিকে তাকিয়ে চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টাতে আপ্রান যুদ্ধ করে চলেছে। নীলাভা ঘুরে দাড়ালো সেখান থেকে প্রস্থানের জন্য। নীলাভা ভেবেই নিয়েছে হাম্বাটা তাকে ভালোবাসি বলবে না। যা করার তাকেই করতে হবে।
ঠিক তখনি হুট করেই নিলয় একটি অসামান্য কাজ করে বসল। নীলাভার ডান হাত ধরে নিলয় বলতে শুরু করলো...
"রঙিন ঘুড়ির দুর আকাশে দুজনে, ভালোবাসার ঘুড়ি উড়াবো। রঙিন কাগজের প্লেন বানিয়ে দুজনে ঐ মহাকাশে পাঠাবো। কাগজের নৌকা ভাসাবো আমাদের ভালোবাসার সরোবরে। তুমি আমার কাধে মাথা রেখে ঐ দুর গগনে গাংচিলের খেলা দেখবে। তুমি কি আমার পাশে থাকবে সারাটা সময়? তুমি কি আমায় ভালোবাসবে সবটাসময়"?
নীলাভা চুপ হয়ে একদৃষ্টিতে নিলয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। নিলয় নীলাভার চোখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে চোখের অস্পষ্ট অনুভুতির শব্দগুলো। নীলাভা কিছু বললো না। শুধু একবার আকাশপানে তাকিয়ে দেখল আকাশটা এখনো বেশ বোঝা যাচ্ছে। আস্তে করে হাতটি ছাড়িয়ে নীলাভা দৌড়ে চলে গেল। যাওয়ার আগে নিলয়ের হাতে গুজে দিল একটি ছোট্ট কাগজ। নিলয় কাগজটি খুলে দেখলো সেখানে লেখা একটি নাম্বার।
নিলাভা অনেকদিন আগেই লিখে রেখেছিল নিলয়কে দেবে বলে। কিন্তু নিলয়ের অব্যক্ত অনুভুতির সিক্ত চাহনির মায়াতে বারংবার পড়ে গেছিল সে। তাই একদিনে সে দিতে পারেনি। কিন্তু আজ কাগজটি হাতে দিয়ে চলে গেল অন্দরমহলে।
নিলয় কাগজটি হাতে নিয়ে মুচকি হাসে। কারন, এটা কোনো মুল্যহীন কাগজ নয়। এটাতে লেখা আছে তার প্রেয়সীর নাম্বার। যা সাধারন কাগজের থেকেও অসাধারন কিছু।
(১০৮)
-------(সমাপ্ত)-----
āĻোāύ āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āύেāĻ:
āĻāĻāĻি āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āĻĒোāϏ্āĻ āĻāϰুāύ