জীবনী: অশ্রু ভেজা ডায়েরী
((পর্ব:১৯))
(সত্য ঘটনা।)
.
.
(৫২)
গোসল সেরে খাওয়ার জন্য লজিং বাড়ির দিকে হাঁটা দিলাম। হৃদয়টা যেমন হাহাকার করছে, শূন্যতাও তৈরি হয়েছে চারপাশে। বাজারে ঢুকতেই আবার ফোন!
এবার রিসিভ করলাম,
- বারবার ফোন দিচ্ছেন কেন?
- তুমি আমাকে কি পেয়েছো? যা খুশি তাই করবে?
- আমি আবার কি করলাম? আপনাকে মুক্তি দিলাম। তাছাড়া আপনার মুক্তি খুব প্রয়োজন। আমার সাথে থাকলে আমার কথামতো চলতে হয়, পরাধীনতায় থাকতে হয়।
- শোন, বাজে কথা রাখো। আমি জানি তুমি আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না, আর আমিও না। সন্ধ্যার পরপরই বাড়িতে চলে আসবে।
- সরি, আমি পারবো না।
- তোমাকে না বলেছি ইংলিশ বলবে না।
- মাফ করবেন, আবার সাথী হতে সম্পর্ক ভাঙিনি। তাছাড়া মাদরাসার সবাই আপনার আমার সম্পর্ক অন্যভাবে দেখে। মামাকেও কে যেন বলেছে, আর আমার বাড়িতেও। তাই দয়া করে ভুলে যান আমাকে, আর কখনো সম্পর্কের দাবিতে আসবে না।
- তুমি থেকে আপনি হয়ে গেলাম! বাহ!
- লজিং বাড়ি চলে আসছি। আপনি ভালো থাকুন।
বলেই ফোনটা কেটে দিলাম। সন্ধ্যার সময় আবারো ফোন দিলো। বুঝতে পারছি না, এই লোকের সমস্যা কি!
- আবার কেন?
- শোন, কোন কথা শুনতে চাই না, আমি শহর থেকে ফিরছি। ১০মিনিটের মধ্যে বাড়িতে আসো। যদি না আসো তাহলে সরাসরি মাদরাসায় যাবো।
- কি সব পাগলের মতন বলছেন?
- আমি তো পাগলিই। তুমি বাড়ি আসো নতুবা আমি যাবো।
বাধ্য হয়ে বাড়িতে আসলাম। আপা, বড় আম্মা সবাই জিজ্ঞেস করছে ভাইয়ের সাথে কিছু হয়েছে কিনা! আমি চুপ করে বসে থাকলাম। আপা বললো,
- কাল থেকে এখন পর্যন্ত খায় নি। তাই বলছি কিছু হয়েছে নাকি?
আমি সেদিকে না গিয়ে অন্যকথা বলছিলাম। উনি বাড়িতে আসলেন। আমাকে দেখে এক গাল হেসে দিলেন।
আমি উনার ঘরে গিয়ে দেখলাম বসে আছেন।
- খাবার খান নি কেন?
- ক্ষুধা ছিলো না তাই।
- মিথ্যা কথা বলছেন কেন?
- মিথ্যা বলি না।
- কথা না বলে খেয়ে নিন। আর কেন ডেকেছেন? আমাকে থ্রেড করেন?
আমার কথায় হিহি করে হাসলো। আমার ফোনটা হাতে নিয়ে বললো,
- কি সব ভাঙা ফোন নিয়ে আসছো?
- এই খবরদার ভাঙবেন না। এটা আমার আপুর ফোন।
- তাড়াতাড়ি সিম খুলো আর এটাতে লাগাও।
- এবার কিন্তু ভালো হচ্ছে না।
আমার জোরাজুরিতে জড়িয়ে ধরে মুখ টিপে ধরলেন, আর ফিসফিস করে বললেন,
- বাড়ির সবাই কিন্তু জেগে আছে। আমি চাই না সবাই এই ব্যাপারটা জানুক। বেশি জোর দেখালে কিন্তু তোমাকে মেরে আমিও মরবো।
- মারেন।
আমি উনার চোখের কাছে আবারো হেরে যাই। টলমলে চোখ দেখে দু'হাত প্রসারিত করে জড়িয়ে ধরে বললাম,
- কেউ চায় না সম্পর্কটা বেঁচে থাকুক। ক্লাসের সবাই আমার সাথে মিশে না, কথাও বলে না।
- তোমাকে কি বলবো জানি না, তবে তোমাকে ছাড়া বর্তমান সব সুখ অচল।
আমি বেশি কথা না বলে মাদরাসায় চলে আসলাম। মাদরাসায় এসে দেখলাম মাহবুব ভাই বাজারে যাচ্ছে। আমাকে কিছু বললো না।
.
(৫৩)
মাহবুব ভাই বাজার থেকে ফিরলো মুখ গোমরা করে। আমাকে একান্তে ডেকে বললো আরিফ ভাই নাকি ওকে খুব রাগ দেখিয়েছে। ওর সাদা মুখটা কালো দেখে আমার প্রচণ্ড রাগ হলো।
দ্রুত ফোন দিলাম আরিফ ভাইকে।
- কি খবর? আপনি মাহবুব ভাইকে কি বলেছেন? আপনি কি আমাকে শান্তিতে থাকতে দিবেন না নাকি?
- ও কি করেছো জানো? গতপরশু যখন তোমার সাথে কথা বলছিলাম তখন ও আমাকে মিসডকল দিয়েছে। মনে হয় ও তোমার মামাকে বলে দিয়েছে। তাই ঝেরেছি কিছুটা।
- আমি আর কিছু শুনতে চাই না। আপনার সাথে সম্পর্কটা হয়তো একবছরের। কিন্তু ওর সাথে আমার ক্লাসমেটের সম্পর্ক সাত বছরের। কালকে যদি ওকে ডেকে ভুল স্বীকার না করেন তো সত্যিই বলছি কখনো কথা বলবো না আপনার সাথে। কালকে ভুল স্বীকার করে তবেই ফোন দিবেন, তার আগে রিসিভ করবো না।
ক্লাসের সবাই আমাকে আবার ভুল বুঝতে শুরু করেছে। ছাদের এক পাশে বসে কিছুক্ষণ কাঁদলাম। সবসময় আমারই সাথে কেন এমন হয়! সবাই আমাকেই ভুল বুঝে!
পরদিন মাহবুব ভাইকে ডেকে কি কি যেন বলেছে, পরে শুনেছি ভুল স্বীকার করেছে। তারপর সেদিন রাত্রে কথা বলেছি।
উনি প্রায়ই উনার কষ্টের কথা বলতো। উনি কিভাবে মাদরাসা ছাড়লেন, বাবা মারা যাওয়ার পর কেমন ছিলেন ইত্যাদি। আমি শুধু চুপচাপ শুনতাম। বড্ড ভালোবাসতাম উনাকে। মনে হয় উনি আমাকে ছেড়ে চলে গেলে মরেই যাবো।
পরীক্ষার দু'সপ্তাহ আগে অফিসে ক্লাস বন্ধের জন্য ছুটি চাইলাম। এসময় মাদরাসার পড়া কিভাবে পড়বো? কারণ বইগুলো রিভিশন করা বাকি।
আমাদের ক্লাসের ১০জনের সবাই ছাদে গিয়ে হাতে হাত রেখে শপথ করলাম আমরা ছুটি চাই, নয়তো মাদরাসা ত্যাগ করবো।
ছুটি দিলো না, অনেক বুঝালো আমাদেরকে। সবাই সবার বেড গুছিয়ে ফেলেছে। সব জায়গা ঠিক, কোথায় গিয়ে উঠবো। ভ্যান ডাকতে গেছে শাহিন।
পুরো মাদরাসা আমাদের কর্মকান্ডে হতভম্ব। হুজুরেরা বারবার বোঝাতে লাগলেন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন হুজুর আসতে থাকলো।
শেষপর্যন্ত পরীক্ষার এক সপ্তাহ আগে ছুটি দেয়ার দিন ধার্য করলো। তবে আমাদের সবথেকে ভাগ্য খারাপ ছিলো এ কারণে যে, প্রতি এব সপ্তাহ পরপর আমাদের দু'টো করে পরীক্ষা।
অবাক হচ্ছেন? ভাবছেন এতো বেশ সুবিধাই।
কিন্তু নাহ, আমরা সে সুযোগ পাই নি। শুধুমাত্র বৃহস্পতিবার বন্ধ থাকতো। বাকি দিনগুলো মাদরাসার ক্লাস হতো।
খুব চাপে ছিলাম সবাই। মাদরাসার পড়া তৈরি করতেই অরেকটা সময় কেটে যেত।
আবার দাখিলের জন্য গভীর রাত পর্যন্ত পড়তে হতো। এমন রাত গেছে যে রাতে মাত্র দু'ঘন্টা ঘুমিয়েছি। শুক্র ও শনিবার পরপর দু'টো পরীক্ষা হওয়ায় শনিবারের পরীক্ষার উপর চাপ পড়তো। বই রিভিশন করার সময় থাকতো না।
পরীক্ষার সময় একেবারে হাঁপিয়ে গিয়েছিলাম। শুকিয়েও গিয়েছিলাম। বিশ্রাম নেয়ারও সময় পেতাম না।
হুজুর অসময়ে শুয়ে থাকতে দেখলে লাঠি নিয়ে তাড়া করতো, যতই হই না কেন আমরা সিনিয়র।
.
(৫৪)
দাখিল পরীক্ষার আগে আরিফ ভাই আমার বাড়িতে আসতে চেয়েছিলো। উদ্দেশ্য হাঁসের গোস্ত খাবে। আসতে আসতে বলে আসে নি, সব খাবার ভেস্তে গেছে। আব্বুর কিছু গালিও সহ্য করতে হয়েছে।
খাবার অপচয় বলে কথা! পরেরদিন আচ্ছা মতন গালি দিয়েছি তাকে। রাগে সারাদিন ফোন রিসিভ করি নি।
হালকা বৃষ্টি হচ্ছিলো, উনি রংপুরে থাকে এসময়।
আম্মুর কাছ থেকে হাঁসের গোস্ত বাটিতে নিয়ে শহরে গেলাম। দু'ঘন্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি।
রাগে মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে, বারবার ফোন করছিলাম। চলে যেতে চেয়েও যেতে পারছি না।
ঘন্টা দুয়েকপর আসলেন। এসেই মুচকি হাসি দিয়ে এমন একটা কথা বললেন যাতে আমি সব ভুলে গেলাম।
তবুও কিছুটা রাগ ছিলো তার প্রতি। আমাকে রিকশায় তুলে দিয়ে উনি চলে গেলেন। আমিও বাড়িতে চলে আসলাম।
তবে পরীক্ষা তিনদিন আগে আরিফ ভাই চারজনকে নিয়ে আমাকে এসে বাড়ি থেকে নিয়ে গেছে।
বাড়িতে বলেছিলো, 'পরীক্ষার সময় কোন সমস্যা হবে না। সাইন্সের পরীক্ষাগুলোতে উনিই নিয়ে যাবেন।'
সেদিন মাদরাসা আর ঢোকা হয়নি। তাতেই বারোটা বেজে গেছে। এত রাতে গেট খুলে দিবে না।
তাই বাধ্য হয়ে আরিফ ভাইয়ের বাসায় গেলাম। রাতে ঘন্টাখানেক জীববিজ্ঞান পড়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। তখনো তিনি দোকান বন্ধ করে আসেন নি।
রাতে ঠান্ডা অনুভব করলাম। হায় হায় উনি আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পরেছেন। উনি মনে হয় এখনি এসেছেন, তাইতো হাত-পা ঠান্ডা। নিজেকে ছাড়াতে চেষ্টা করলাম, উনি বলে উঠলো,
- ঠান্ডা লেগেছে। বাইরে খুব শীত। এমন করছো কেন?
- আপনার ঠান্ডা শরীরের স্পর্শে আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
- কিছু হবে না। ঘুমাও, রাত অনেক হয়েছে। সকালে স্কুল আছে।
চুপ করে চোখ দু'টো খুললাম। এইদিন উনাকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি, যদিও এর আগে এত কাছে থেকে দেখার সুযোগ পাইনি।
মনে মনে ভাবছিলাম, 'যদি কেউ এমন করে সারাজীবন জড়িয়ে রাখতো!'
আমি জানি, খুব ভালোবাসা মানুষের জীবনে টিকে থাকে না। যতই ঘনিষ্ঠতা থাকুক না কেন, একদিন বিচ্ছিন্ন হবেই। তবে খুব কম সম্পর্কই টিকে থাকে।
ভাবতাম, হায় যদি আমাদের সম্পর্কটা টিকে থাকতো!
মাঝে মনে হয় তাকে বুঝি খুব শীঘ্রই হারিয়ে ফেলবো।
আবার কখনো মনে হয়, নাহ! উনি তো আমাকে খুব ভালোবাসেন, হারাবেন কেন?
আমি অভিমান করলে তো খুব দ্রুত ভাঙান। ভালোবাসাগুলোতো এমনি হওয়া উচিত। যখন কথা বলতে বলতে টাকা শেষ হয়ে যেত তখন উনিই ফ্লেক্সিলোড করে দিতেন।
উনার সাথে থাকাকালীন খুব কম টাকাই লোড করতে হয়েছে। বেশিরভাগ সময়েই তিনি লোড করে দিতেন।
আমি অপেক্ষা করতাম উনার ফোনের জন্য, ছটফট করতাম কি করছে তা জানার জন্য।
ভালোবাসেছিলাম তাকে, খুব ভালোবেসেছিলাম। যে ভালোবাসা হয়তো বফ-গফকেও হার মানাবে।
এতটা বিশ্বাস, ভালোবাসা, মান-অভিমান ছিলো যে, উনি কেমন ছিলো বুঝতাম না তবে আমি বেশ ভালো ছিলাম।
মাঝে মাঝে রাগ ভাঙানোর জন্য আই লাভ ইউ বলতো।
আমি উনার পাগলামি দেখে হেসে ফেলতাম।
বলতাম, 'মানুষ শুনলে তো হাসবে।'
উনি বলতেন, 'মানুষ কি দু'টাকা দিয়ে আমাকে সাহায্য করে যে তাদের হাসাতে আমার কিছু এসে যায়?'
আমি চুপ থাকতাম।
((চলবে))
জীবনী: অশ্রু ভেজা ডায়েরী
((পর্ব:২০))
(সত্য ঘটনা)
.
.
(৫৫)
২০শে ফেব্রুআরি আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিলো। একথাটা মনে করা খুবই সহজ। কারণ ২১শে ফেব্রুয়ারি আমার বড় ভাইয়ের বিয়ে হয়েছিলো।
মাঝে মাঝে দিনটাকে স্বরণ করে বলতাম কোনদিন একবছর পূর্ণ হবে। দিনটা এমন একদিন পরলো যেদিন আমার পরীক্ষা ছিলো, সম্ভবত আরবী ২য় পত্র, শনিবার ছিলো।
রাত বারোটা বাজার কিছুক্ষণ পর ফোন দিলেন,
- কি খবর পাগলা লোক?
- আজকে এক বছর তো পূরণ হলো।
- আমার তো পরীক্ষা আছে।
- সমস্যা নাই, সন্ধ্যার পর বাড়িতে আসবা। আজ একসাথে খাবো। বল কি খাবা? মাছ না গোস্ত?
- আপনার যা ইচ্ছে, তবে আমার একটা ইচ্ছে পূরণ করবেন?
- বলো,
- পাঞ্জাবিটা আজ গায়ে দিবেন? সেই কিনে দিলাম, একদিনও তো পরলেন না।
- ঠিক আছে পরবো।
রাতে সেদিন তাহাজ্জুদ পরে দোয়া করলাম, 'হে আল্লাহ আরিফ ভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্কটা যথার্থ মনে করলে সারাজীবন রেখে দাও, নতুবা উনার থেকে আলাদা করে দাও। সবসময় উনাকে ভালো রেখ।'
উপরের কথাটুকু প্রায় নামাযের মুনাজাতে পড়তাম। পরীক্ষা খুব ভালো হলো সেদিন।
এক সপ্তাহ আর কোন পরীক্ষা নেই। ঘুম থেকে উঠে সন্ধ্যায় নামায আদায় করে বাইরে বের হলাম। আমিও নতুন পাঞ্জাবি গায়ে দিছি আজ। সম্ভবত উনার বড় আব্বা মারা গেছিলেন সেদিন।
আমি বাড়ি গিয়ে ফোন দিলাম। উনি তখনো মরহুমের বাড়িতে। আমাকে বললেন বাড়িতে কিছুক্ষণ থাকতে।
আমি সবার সাথে গল্প করছিলাম। উনি আসলেন, আমাকে দেখে আড়ালে হাসলেন।
পাঞ্জাবিটা পরে উনাকে খুব সুন্দর লাগছিলো। সাথে প্যান্টও পরেছিলেন। সেদিনই প্রথম উনাদের বাড়িতে ভাত খেয়েছি, যদিও বা প্রায় সময় জোরাজুরি করেছিলো।
মাঝে মাঝে উনি ভীষণ রাগ করতো। রাগ করলেও খুব দ্রুত তা ভেঙে দিতাম আই লাভ বলে। উনি তখন এক গাল হেসে দিতেন।
দু'জনে কিছুক্ষণ একান্তে বসে থাকলাম। পাশাপাশি লেপ মুড়িয়ে ফিসফিস করে নানান রকম গল্প করতাম। কখনো সুখময় গল্প, আবার কখনো হতাশার গল্প।
উনার ভাষ্যমতে উনি ভালো আছেন, বেশ ভালো আছেন। একটা সময় থাকার জায়গা না থাকায় স্কুলের বারান্দায় থাকতে হতো। তখন তাদের সংসারে অভাব অনাটন লেগে ছিলো।
মাঝে মাঝে এসব কথা বলতে গিয়ে হতাশ হয়ে যেতেন। আমি নিরবে চুপ করে থাকতাম। বহুবার তাকে বাহুডোরে বুকে টেনেছি। ইচ্ছে হয়, যদি সারাজীবন এই মানুষটাকে কাছে পেতাম তাহলে হয়তো জীবনে কষ্ট থাকলেও কষ্ট পেতাম না।
যেভাবেই হোক আমাকে খুশি রাখতেন। প্রায় প্রায় আমার মুখ ভার দেখে জিজ্ঞেস করতেন কি হয়েছে। আমি চুপ করে থাকলে বুকে জড়িয়ে ধরে ভাইয়ের ভালোবাসায় ভরিয়ে দিতেন।
পরম স্নেহের পরশ পেয়ে কেই না দুঃখে থাকে?
অনেক সময় আমি খুব কষ্টে থাকলে তাকে বলতাম, 'আপনি আমাকে একটু জড়িয়ে ধরবেন? খুব শক্ত করে।'
মাঝে মাঝে ভাবতাম, এই সম্পর্কটা টিকবে তো? এর শেষ কোথায়?
উনি আমাকে আমার মতো করে সারাজীবন ভালোবাসবে তো? এইতো বেশ ভালো আছি আমি।
.
(৫৬)
কথা ছিলো সাইন্সের পরীক্ষার সময় আরিফ ভাই নিজে নিয়ে যাবেন। কিন্তু নিজে না গিয়ে অন্য মানুষের মারফতে পরীক্ষার হলে পাঠালেন। আবার কথা দিয়েছিলেন প্রাকটিকেলে নিয়ে যাবেন।
এবারেও গেলেন না, টাকা দিলেন একা যাবার জন্য। খুব রাগ হলাম। রাগে মাথা গিজগিজ করতে লাগলো। কাছে পেলে মনে হয় ছিঁড়ে খাব এমন অবস্থা।
তখন থেকে একটু একটু করে পিছে ফেরা। পরীক্ষা শেষ হলো, বাড়িতে চলে আসলাম।
আমি ক্লান্ত! বড্ড ক্লান্ত। পরীক্ষার শেষের কয়েকদিন বেশ কয়েকবার মনকষাকষি হয়েছে। আমিও রাগ ভাঙাইনি, উনিও ভাঙায়নি।
দু'জন দু'জনার মতো করে চলছি। খুব কম সময়ে কথা হতো। হলেও খুব অল্প সময়ের জন্য কিংবা ব্যস্ততার কথা বলে ফোন রেখে দিতো।
সেবার বাড়িতে আমি খুব অসুস্থ ছিলাম। জন্ডিজ হয়ে একেবারে মরার মতো অবস্থা হয়েছিলো। শরীর শুকিয়ে কাট হয়ে গিয়েছিলো।
সত্যি কথা বলতে নিজে নিজে ভাবতাম আমি হয়তো আর বাঁচবো না। মৃত্যুর ঘন্টা বাজছে। সে যাত্রায় বেঁচে গেলাম। বাড়িতে প্রায় মাসখানেক থাকার পর মাদরাসা থেকে হুজুর বারবার ফোন দিচ্ছেন, কেন মাদরাসায় আসছি না।
বাড়িতে কোনমতেই ভালো লাগছিলো না। ভাবলাম বছর শেষ হতে আর তো মাত্র দু'মাস বাকি। তাই বছরটা শেষ করে ক্বওমীর লেখাপড়ার ইতি টানি।
আসাদ নামের এক বন্ধু আমাকে নিতে আসলো। আসাদ আমার খুব ভালো বন্ধু, অনেক কিছু শেয়ার করা হয়।
বাড়ি থেকে যাবার সময় মনে মনে ভাবলাম, 'যে আরিফ ভাই আমার থেকে অসুখের সময় অভিমানের কারণে একবার খোঁজ নিলো না, নিশ্চই সে হয়তো আমাকে আর তার জীবনে চায় না।'
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম তাকে মুক্তি দিবো, এবারই শেষবার।
মাদরাসায় এসেও ভালো লাগছিলো না। আরিফ ভাই কেন জানি দেখা করতে চাচ্ছিলো না। শুধু বলতো ব্যস্ত আছি।
আমি ঠিকমতোই বুঝি, উনার ব্যস্ততা কোথায়!
তাইতো ফোনে একটু কথা বলার জন্য রাত একটা পর্যন্ত জেগে থাকতাম।
তবুও বলতো , পরে ফোন দাও। আমি বিরক্ত, বেশ বিরক্ত!
ভালো লাগছিলো না, মনে হয় মরে যাই। উনি ছাড়া কিছুই ভালো লাগছিলো না। আগের সময়গুলো মিস করতে থাকি।
শেষপর্যন্ত উনার যত গিফট ছিলো সব ফেরত পাঠালাম। সাথে দিলাম লম্বা একটা চিরকুট।
অনেক কথাই লেখা ছিলো। সত্যি বলতে আমি জানতাম, এই জিনিষগুলো পেলে উনি আমাকে মুক্তি দেবেন এবার। একেবারেই মুক্তি দিবেন।
সেই চলে গেল, আর ফিরলো না। আমিও হতাশার সাগরে ঢুবে ঢুবে মরতে লাগলাম। জীবনটা বৃথা মনে হতে লাগলো। মনে হচ্ছিলো সুইসাইড করি।
কিন্তু মনকে বুঝ দিতাম, একজন ছেলে বন্ধুর জন্য এতটা করা বুঝি সত্যিই ঠিক নয়। সে যদি আমাকে ভুলে থাকতে পারে তবে আমি কেন পারবো না।
তবে মিস করবো গহীনের সেই স্মৃতিগুলো। মিস করবো সেই দিনটির কথা যেদিন খুব কাছ থেকে তাকে দেখেছি।
যেদিন উনি আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে বলেছিলেন, 'আমরা তো একটাই আত্মা, দেহ দু'টো।'
আমি তাকে বলতাম, সেদিনই তোমাকে মুক্তি দিবো যেদিন তুমি বিয়ে করবে।'
কিন্তু সে আশায় বালি। তা আর হলো কই? বেশি ভালোবাসা মানুষের কাছে টিকে না। আমার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। উনার সাথে সম্পর্ক ভেঙে যাবার পর কোন জায়গায় স্থির থাকতে পারতাম না।
উনার সাথে কথা বলার জায়গাগুলোতে বসে বসে সময় কাটাতাম আর নাম্বারটা দেখতাম।
.
(৫৭)
নির্জীব হয়ে গিয়েছিলাম। বুকের এক পাশটা খাঁ খাঁ করে সবসময়। সামনে দেখলেও কথা বলার সাহসটুকু হারিয়ে ফেলেছিলাম।
হয়তো ও আমাকে দেখেছে, কিন্তু আমার চোখের জল কখনোও দেখেনি। আজ অবধিও সে জানে না, তাকে হারিয়ে আমি কত কেঁদেছি।
শেষপর্যন্ত একেবারে চলে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। ক্বওমী পরীক্ষার রেজাল্ট অনেক ভালো করলাম। সেবারও ২য় হয়েছিলাম। কথা দিয়েছিলো আমি চলে আসার পর দিনে একবার ফোন দিবেন। কিন্তু সেটাও মিথ্যা বলেছিলেন।
তখন শুধু একটাই সন্দেহ হয়েছিলো আমার, 'তাহলে কি আমাকে ভালোবেসেছিলো সেটাও মিথ্যে?'
কি দরকার ছিলো আমার জীবনে আসার? আমি তো ওকে আমার জীবনে আসতে বলি নি। ও নিজের ইচ্ছায় এসেছে, আবার ধোঁকা দিলো।
আমি যখন চলে আসি তার দু'দিন আরিফ ভাই আমার ফোন রিসিভ করেছিলো। দেখা করতে চেয়ে মিথ্যা কথা বলেছিলো যে উনি ব্যস্ত।
আমি উনার মিথ্যা খুব দ্রুত ধরতে পারতাম। যে কাউকে ফাঁকি দিলেও আমাকে ফাঁকি দিতে পারতো না। কারণ আমি তার সবটুকু জানি।
দাখিলের রেজাল্ট বের হলো। উনার সাথে সম্পর্ক খারাপ থাকলেও উনার বাড়ির সাথে বেশ ভালো ছিলো। নিজের বাড়ির জন্য যেমন মিষ্টি কিনেছি, ঠিক তেমনি উনার বাড়ির জন্যও কিনেছি।
কথা ছিলো একসাথে মিষ্টি খাবো। কিন্তু নাহ! উনি খেলেন না। তাই আমারো খাওয়া হলো না। শেষপর্যন্ত উনি খাননি। অনেক বন্ধুরা আমাকে চেষ্টা করেছে খাওয়ানোর কিন্তু আমি খাইনি।
তবে মাঝে মাঝে ভাবি, ভালোবেসে কাছে পেতে হবে এমনটা নয়, দূরে থেকেও মানুষকে ভালোবাসা যায়। আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে হয়তো সে পৈশাচিক আনন্দ পেয়েছে কিন্তু তার থেকে বেশি পেয়েছি কষ্ট।
একেবারে চলে আসার পর হুজুর দু'দিন আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছিলেন কিন্তু আমি যাইনি, কারণ একটাই, ওখানে গেলে আরিফ ভাইয়ের মুখ দেখতে হবে। ওকে দেখলে পুরাতন কথা আবার মনে পড়বে।
নানান অজুহাতে দু'বারই হুজুরকে ফিরিয়ে দিয়েছি। সবসময় সব শিক্ষকের কাছ থেকে ভালোবাসা পেয়েছি।
বাড়িতে এসেও তাকে ভুলতে পারি নি। মনকে বুঝ দিতাম বারবার। ভাবতাম কালকে ফোন দিব, কালকে আসলে ভাবি নাহ থাক, পরশু ফোন দিব।
এভাবে সপ্তাহ বা মাস কেটে যেত। হ্যাঁ এখন পুরোপুরি তাকে ভুলে গেছি। তবে স্মৃতিগুলো আমাকে কাঁদায়। যতই হোক, উনিই আমার জীবনের আত্মার সাথে মিশে আছেন।
হয়তো উনি আমাকে ভুলতে পারেন কিন্তু আমি ভুলি নি।
মাঝপথে একদিন ফোন দিয়ে ৪৫মিনিটের মতো কথা বলেছে।
তার না বলা কত কথাই শুনেছি। ভালোবাসার জন্য লুতুপুতুর প্রয়োজন পড়ে না। মুখের মিষ্টি কথা কিংবা আত্মার টানটাই সব থেকে বড়।
তবে আজো আমি তাকে মনে করি। ভাবি, যদি সে ফিরে আসতো? কাছে টেনে বলতো, আমি তোমাকে ভালোবাসি।
অপেক্ষার প্রহর শেষ হয় না।
খুব কাছ দিয়ে গেলেও কথা হয় না।
শুনেছি বেশ ভালো আছে সে। সবসময় তার জন্য দোয়া করি যাতে ভালো থাকে। মাসজিদে কিছু তার জন্য সদকায়ে জারিয়া করে রেখেছি যাতে মৃত্যুর পর সে তার থেকে উপকার লাভ করে।
আমি তার জীবন থেকে হারিয়ে গেছি কিন্তু সে আমার জীবন থেকে হারায়নি। বেঁচে থাকবে আজীবন।
.
জীবনী: অশ্রু ভেজা ডায়েরী
(পর্ব:২১, শেষ পর্ব)
(সত্য ঘটনা)
.
.
(৫৮)
আরিফ ভাইয়ের স্মৃতি কোনভাবেই ভুলতে পারছিলাম না। নানারকমভাবে তাকে ভোলার চেষ্টা করছিলাম। তার উপর শুরু হলো নতুন যুদ্ধ!
হুম, আমার জন্য যুদ্ধই ছিলো। ইন্টারমিডিয়েটের চয়েজ বিষয়টা না বুঝে প্রথম চয়েজ হিসেবে রংপুর সরকারি কলেজ দিছিলাম, ২য়তে ধাপ সাতগাড়া মাদরাসা।
প্রথম চয়েজটাই হয়ে গেল। বাড়িতে খুশি মনে আব্বুকে বলতেই শুরু হলো অমানবিক অত্যাচার।
সবসময় আমাকে গালির উপর রাখতো। কেন আমি মাদরাসায় ভর্তি হলাম না, কেনই বা কলেজে গেলাম!
রমযান মাস চলছিলো, আমার খাওয়া বন্ধ। তবুও রোযা রাখা ছাড়ি নি। সাহরীর সময় পানি খেয়ে রোযা থাকতাম।
আব্বুকে নানান মানুষ নানান কথা বুঝাতো, মূর্খ তো তাই যা যে বুঝায় সেটাই বুঝে।
মানুষেরা আব্বুর কান ভারী করে বলতো, 'মাদরাসার ছাত্র কলেজে গিয়ে বখাটে হয়ে যাবে। কিংবা, পাঞ্জাবির বদলে শার্ট প্যান্ট পড়ে বেড়াবে ইত্যাদি।
দুলাভাই ওর নিজের টাকা দিয়ে আমাকে ভর্তি করিয়ে দিলো। প্রথম ক্লাসটা অনেক কষ্টে করেছিলাম। অত্যাচার দিনদিন বেড়েই চলছিলো।
বাধ্য হয়ে ধাপ সাতগাড়া মাদরাসার ভিপির সাথে দেখা করে কথা বললাম। কিন্তু উনি কিছুই করতে পারলেন না আমার জন্য। কারণ উনাদের ২৪০টা সিট পূরণ হয়ে গেছে।
পরবর্তীতে আমার থার্ড চুজ মুলাটোলে এক ভাইয়ের মাধ্যমে ভর্তি হলাম।
রংপুর সরকারী কলেজে অনেক কষ্টে ভর্তি ক্যানসেল করলাম। শুরু হলো নতুন পথচলা।
প্রতিদিন মাদরাসা যেতাম, সাইকেলে । আমার বাড়ি থেকে সাইকেলে পুরো আধা ঘন্টা লাগতো।
খুব কম সময়ে প্রায় শিক্ষকের মন জয় করে ফেলি। প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় ৪.৮৬ পেয়ে প্রথম হলাম। বার্ষিক পরীক্ষায় যেখানে ফেলের হিড়িক পুরো মাদরাসায় সেখানে প্লাস পেলাম।
সব শিক্ষক আলাদাভাবে উপদেশ দিতে থাকলেন। আমিও তা সানন্দে গ্রহণ করতাম। আগের থেকে পড়তে হতো খুব বেশি। বাড়িতে চাপ নিয়েই পড়তাম।
একদিন পড়া দিতে পারি নি বলে ম্যাডাম বললেন,
- কি বাবা, আজ পড়া পড়ে আসো নি কেন?
- জ্বী, ম্যাডাম আসলে আমার এই বইটা নাই।
- কিনে নাও আজ।
- ম্যাডাম একটু দেরি হবে। আসলে বাড়িতে খুব সমস্যা তো। আর্থিক দিক দিয়ে একটু কোনঠাসায় আছি।
পরদিন ম্যাডাম নতুন একটা বই আমার হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন।
তারপর থেকে আর পড়তে কোন সমস্যা হতো না। বন্ধুদের সাথে বেশ ভালোই চলছিলো দিনগুলো। তবে খুব মিস করতাম ক্বওমীর বন্ধুদের। যাদের সাথে দীর্ঘ পথচলা।
ফাঁকা পেলে ওদের সাথে সময় কাটিয়ে আসি। লেখাপড়ার বিষয়ে অনেক কথা শেয়ার করি।
টেষ্ট পরীক্ষায় অল্পের জন্য প্লাস মিস হলেও ফাইনালে ঠিকই সেন্টার ফার্ষ্ট হয়েছিলাম। এটা আমার জীবনের সব থেকে বড় পাওয়া। তবে এর পিছনে অনেক কষ্ট, হতাশা, দুঃখ ছিলো। দিনের পর দিন কষ্টের সাথে পাঞ্জা লড়ে
আমাকে পড়তে হয়েছে।
জানি না কেনই বা আমার জীবনে এত কষ্ট বরাদ্দ করে রেখেছে আল্লাহ। একটা শেষ হতে না হতে আরেকটার জন্য অপেক্ষা করি। প্রস্তুতি নেই চোখের পানি ফেলার।
বাড়িতে খুব বেশি বন্ধুবান্ধব নেই। যারা ছিলো তারা তাদের প্রয়োজনে বিভিন্ন জায়গায় সেটেল্ট।
নিজের মতো করে মাদরাসা যেতাম, আসতাম, খাওয়া করে বিশ্রাম নিয়ে মোবাইলে কিছুক্ষণ সময় ব্যয় করে শুরু হতো লেখাপড়া।
আমি ফেসবুক ইউজার ১৫এর শেষের দিক থেকে। পাঠক না হয়েও প্রথমেই লেখালেখিতে যোগদান করি।
খুব ছোট ছোট লিখলেও এখন বেশ বড় বড়ই গল্প লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। জানি না কেমন লিখি, তবে চেষ্টা করে যাচ্ছি।
.
(৫৯)
আলীম দ্বিতীয় বর্ষে উঠে নতুন এক যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হলো। আমার এক পাতানো ভাই ছিলো। আব্বু-আম্মু দু'জনই তাকে বেশ ভালোবাসতো। সে সুযোগে সে সবসময় আমাদের বাড়িতে যাতায়ত করতো।
তার ভাষ্যমতে সে আর্মির চাকরি করে। আব্বু আমার চাকরির ব্যাপারে তার সাথে কথা বলেছে। সেও খুব আশা দিয়ে রাখছে। আব্বু বলেছে টাকা পয়সা কোন সমস্যা না।
কিন্তু সে গোপনে আম্মুর কাছেও বেশ কিছু টাকা চেয়েছে।
আমি ভাবতে পারি না, আমার লেখাপড়ার মাঝখানে চাকরি নিয়ে তারা কি শুরু করেছে।
সেদিন বৃহস্পতিবার ছিলো।
আব্বু তাকে আমাদের বাড়িতে ডেকেছিলো। আম্মুও গোপনে তার জন্য বিশ হাজার টাকা রেডি করে রেখেছিলো।
আব্বু বের হয়ে গেলে আম্মু তার হাত ধরে শুধু এ কথা বলেছিলো, 'বাবা, আমাদের কষ্টের টাকা। দেখবেন যেন হেরফের না হয়।'
শুরু হয়ে গেল নতুন অশান্তি। ভাইয়ের হাত ধরাটা আব্বু দেখে ফেলেছিলো। তারপর থেকে দু'জনের মধ্যে কথা বলাবলি বন্ধ।
আম্মু বারবার বোঝানোর চেষ্টা করলেও আব্বু কোনক্রমেই বুঝতে চাইতো না। সেদিনই আর্মি ভাইকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়েছিলো।
এত কাহিনী হয়েছে অথচ বাড়ির আশেপাশে কেউ জানে না। আমি আর আমার আপু বারবার আব্বুর পা ধরে কাঁদছি, কিন্তু দু'দিন ভালো থাকলে পরের দিন থেকে ফের অত্যাচার শুরু হয়ে যায়।
সবসময় গালিগালাজ করতো আম্মুকে। ফাঁক পেলে আমাকেও ছাড়তো না। কিন্তু তারা বুঝতো না, এসব করে কোন লাভ নেই। বরং আমাদের দু'ভাই-বোনের ক্ষতি।
অনেক কষ্টের মধ্যে আলীম পরীক্ষা দিলাম।
সত্যি বলতে সেই দশ মাসে এতটাই কষ্টে ছিলাম তা বলার মতো নয়।
খেতে বসলে আম্মু বলতো রাতে কি কি অত্যাচার করেছে।
রাতে মারলেও আমাকে বলতো।
একদিন রাতে মারার পর আব্বু সামাল দিতে না পেরে আমাকে ডেকেছিলো। সেদিন আম্মুর অবস্থা ভিষণ খারাপ ছিলো।
আমি বুঝেও না বুঝার ভান করে থাকতাম। হাটে গেলে আব্বু আম্মুর দোষগুলো বলতো।
আমি কাঁদতাম, চুপিসারে অনেক কাঁদতাম। একদিন আব্বুর বিপক্ষে যাবার কারণে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলো।
দু'দিন বড় আব্বুর বাড়িতে ছিলাম। বই-খাতা-কলম সব কিছু নিয়ে ভাবতাম, বেঁচে থেকে আর কি হবে!
এর চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো। বারবার আত্মহত্যা করতে গিয়েও ফিরে এসেছি।
সত্যি বলতে, আত্মহত্যা করা মহাপাপ না হলে হয়তো আজ পৃথিবীতে থাকতাম না।
আম্মু খুব কাঁদতো। খাবার খেয়েও শান্তি নেই, খাবারের সময়ও কাঁদতো।
শেষপর্যন্ত চুপিসারে কয়েকদিন ভালো থাকার জন্য আম্মুকে খালার বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম। শুরু হলো নতুন পরীক্ষা। বাড়িতে হৈ হৈ কান্ড শুরু হয়ে গেল। সব দোষ আমার উপর পড়লো।
জীবনে যতটা কষ্ট পেয়েছি, আরেকটু পেলে ক্ষতিই বা কি!
অনেক কষ্টে আপু, দু্লাভাই আর আমি খালার বাড়ি থেকে অনেক কষ্টে আম্মুকে নিয়ে আসলাম।
সেদিন এতটাই কথা বলেছি যে আমার গলার অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। আম্মুকে আপুর বাড়িতে রেখে আমি বাড়িতে আসলাম।
আমি ঢুকার পর ঘুমিয়ে পড়লাম। আব্বু কিভাবে যেন জানলো আম্মুকে নিয়ে আসা হয়েছে।
সেদিন রাত্রে করজোড়ে মিনতি করে দু'জনের মধ্যে আবার মীমাংসা করে দেয়া হলো। দু'ভাই-বোনের মাথায় হাত রেখে শপথ করা হলো যাতে এসব মনোমালিন্য আর না হয়।
সেই থেকে আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। মাঝখানে দু'দিন একটু সমস্যা হয়েছিলো। পরে তা ঠিক হয়ে গেছে।
ঘটনাটা এমন সময় যখন আমি ভার্সিটি কোচিং এর জন্য ভর্তি হয়েছি। কিন্তু এসব কারণে পড়তেও পারি নি। প্রিপারেশন ভালো ছিলো না।
.
(৬০)
মানুষ জীবন অনেকটা গল্পের মতো। আমার জীবনে আরিফ ভাইয়ের ছোঁয়া জীবনের মোড়কে ঘুরিয়ে দিয়েছিলো।
জীবনের শেষপ্রান্তে বাবা-মায়ের সমস্যা শেষে সময়ে ডাক্তারবাবু নামক এক ব্যক্তি আমার জীবনে এসেছিলো।
তিনিই আমার ব্যাপারে সবটা জানতো।
সবসময় সাহস দেয়ার চেষ্টা করতো। তাইতো তাকেও জীবনের একটা সময় ভালোবেসেছিলাম। হয়তো পাঠকরা ভাববেন এটা কেমন ভালোবাসা!
আপনার কোন বড় ওস্তাদকে জিজ্ঞেস করবেন মুহাব্বত বা ভালোবাসা কত প্রকার!
আজকের এই একুশতম পর্বের সাথে আমার ডাক্তারবাবুর ৪টা পর্ব যোগ করবেন।
তবে আরিফ ভাইয়ের ভালোবাসাটুকু আজো খুঁজি আমি। খুনসুটিগুলো খুব মিস করি। তবে মাঝে মাঝে উনাকে ফোন দেই। ইচ্ছে হলে রিসিভ করে দু'মিনিট কথা বলে নতুবা কেটে দেয়। তবে তার মা-বোনকে আজও ছাড়তে পারি নি।
প্রতি সপ্তাহে একটা দিন হলেও কথা বলি।
মাঝে মাঝে গিয়ে তার বৃদ্ধ মাকে দেখে আসি। হাজার হোক একসময় তাকেও তো মা ডেকেছি।
উনি আমাকে ডাকেন, মায়ের আদরে ভরিয়ে দিতে চান। কিন্তু প্রতিবন্ধকতার কারণে সবসময় যেতে পারি না।
জীবনের বেশিরভাগ সময় ধরে রাগ, ঝগড়া, হাসি ভালোবাসা সমূহে ভরা নামগুলোকে খুব মিস করি।
মাহবুব ভাই, আসাদ, রউফ ভাই, আনিস মামা, অয়ন, মাসুদ, শাহিন, আজিজ, আতাউর, রুহুল আমীনদের।
কত মজা করেছি, কত মান অভিমান!
জীবনের এই পর্যায়ে এসে তাদের শূন্যতা খুব মিস করি। বারবার ফিরে পেতে চাই সেই শৈশব ও কৈশরের দিনগুলো।
তারা কি আমাকে মনে রেখেছে? কি জানি!
তবে প্রায় প্রায় যাওয়া হয়, হৃদয়ের অভ্যন্তরে থাকা সুপ্ত মানুষটাকে জাগ্রত করে তাদের কাছে টেনে নেয়া হয়।
তবে পরের পরীক্ষা দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। জানি না, কতটা কঠিন হতে পারে এটি।
যাকগে সেসব কথা।
নীল-সাদার জগতে বেশ ভালোই আছি। বেশ কিছু মানুষ আমার হৃদয়ে ঠাঁই পেয়েছে। #সামিয়াপু, #ঐন্দ্রিলাপু, #মুহসিনাপু, #শিহাব_ভাইয়া, #হিমেল_ভাইয়া, #ছদ্মনীল, #নাহিদ_ভাইয়া, #মুন্না।
আমার জীবনটা একটা গল্প! চাইলে অনেক গল্প তৈরি করতে পারতাম, তবে করিনি। নিজের জীবনী নিজে লেখাকে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম না।
তবে এবার লিখেই ফেললাম। আমার জীবনে আমি নিয়তির কাছে বারবার পরাজিত হয়েছি।
জানি না জীবনের সুখটুকু কোথায়! পরবর্তী জীবনের জন্য প্রতিপালক কি রেখেছেন আমার জন্য।
বর্তমানে সময় কাটানোর জন্য একটা ইসলামীক শিল্পীগোষ্ঠীতে কাজ করি। দায়িত্বে রয়েছি নাট্য পরিচালকের। তবে সঙ্গীতেও থাকি, দলীয়তে। অনেক জায়গায় প্রোগ্রাম করাটা জীবনের ছোটখাট একটা স্বার্থকতা।
শীতকাল আসছে, হয়তো কিছুদিনের জন্য আবার ব্যস্ত সময় কাটাবো। বেশ কয়েকজন আমার সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন, যার কারণেই এত কষ্ট করে লেখা।
হাজারো মানুষের গল্প হাজাররকম। সবার কাছেই হয়তো তার সমস্যাটাই সব থেকে বড়।
হাহা, সবাই খুব ভালো থাকবেন। দেখা হবে কোন একদিন। যেদিন থাকবো আপনারই আশেপাশে কিংবা আপনি থাকবেন আমার আশেপাশে।
নয়তো দেখা হবে সেই কঠিন মুসিবতের দিন, জান্নাতের ভিতর।
((সমাপ্ত))
āĻোāύ āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āύেāĻ:
āĻāĻāĻি āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āĻĒোāϏ্āĻ āĻāϰুāύ