জীবনী: অশ্রু ভেজা ডায়েরী
((পর্ব:১৬))
(সত্য ঘটনা)
.
.
(৪৪)
বাড়িতে থেকে ফোন করে শহরে গেলাম। গত মাসে টিউশনির টাকা পেয়েছি, জমানোও কিছু ছিলো।
আমি উনাকে বলেছি দেখা করবো শুধু। উনিও আমাকে বৈশালী মিষ্টিমেলাতে ডাকলেন। আমিও গেলাম।
ঘুম ঘামছিলাম, উনি বললেন,
- কি ব্যপার ঘামছো কেন?
- তাড়াহুড়ো করে এসেছি তো তাই হয়।
- কিছুক্ষণ বসে রেষ্ট নাও আমি কাজটুকু শেষ করি।
- জ্বী আচ্ছা।
আমি মিষ্টিমেলার ভিতরে ফ্যানের বাতাসে বসে মালিকের সাথে কথা বলতে বলতে উনার কাজ শেষ হয়ে গেল। মালের গাড়িকে বিদায় দিয়ে আমার কাছে আসলেন।
- বল, তোমার অভিযোগ কি?
- আমার সাথে একটু চলেন।
- কোথায়?
- একটা পাঞ্জাবি কিনবো আপনার জন্য।
- আমার লাগবে না, আমার পাঞ্জাবি আছে তো।
- বেশি কথা বলবেন নাতো। গতমাসে টিউশনির টাকা পেয়েছি, তাতেই হবে।
উনি আমাকে নিয়ে মার্কেটে গেলেন। একটা পাঞ্জাবিও তার পছন্দ হয়ে গেল। ৬০০ টাকা দিয়ে কিনে দিলাম। আমার পছন্দ না হলেও উনার নাকি ওটাই পছন্দ হয়েছিলো। কি আর করার!
আমাকে রিকশায় তুলে দিয়ে উনি চলে গেলেন। উনাকে গিফট দিতে পেরে আমার ভালো লাগছে। শুধু উনাকেই নয়, যে কাউকে গিফট দিতে পারলে আমার ভালো লাগে।
পরীক্ষার পড়ার চাপে অনেকটা অসুস্থ হয়ে গেলাম। এমন অসুস্থ যে বিছানায় লাফালাফি করতে থাকলাম।
বলে রাখা ভালো যে, আমার মাথার সমস্যা ছিলো। এজন্য চশমাও নিয়েছি। যখন মাথা ব্যাথা শুরু হয় তখন প্রচণ্ড ভাবেই শুরু হয়।
এক বছরে দু'বার কিংবা তিনবার এরকম হতো। আমার এরকম অবস্থা দেখে মাহবুব ভাই পাশে এসে মাথা টিপতে থাকলেন। তার আগে অবশ্য মাথায় পানিও দেয়া হয়েছিলো।
আমি অসুস্থ হলে মাহবুব ভাই বেশিরভাগ সময় পাশে থাকতো। মাথা টিপে দিতো কিংবা ওষুধ এনে দিতো। নাজির মামা তখন বাড়িতে ছিলেন।
অবস্থা বেগতিক দেখে মাহবুব ভাই আরিফ ভাইকে ফোন দিলেন। তিনি সবেমাত্র রংপুর থেকে এসেছেন।
আমার অসুস্থতার কথা শুনে বেশকিছু খাবার আর ডাক্তার নিয়ে মাদরাসায় আসলেন।
আমাদের মাদরাসার মসজিদ উনাদের জামাত হলেও এখানে কখনও আসেন না।
তিনি একদিন বলেছিলেন, আমাদের মাদরাসার কমিটিরা প্রায় কম-বেশি সবাই বড়লোক। আরিফ ভাইয়ের নাকি বড়লোক পছন্দ নয়।
ডাক্তার নিয়ে আসলেন, ডাক্তার সবকিছু পরীক্ষা করে কিছুদিন রেষ্টে থাকতে বললেন।
ওষুধ কিছু দিয়ে ডাক্তার সাহেব চলে গেলেন। ভাই আমার পাশে বসে থাকলেন।
মনির ভাই আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন, আমি মাথা ব্যথায় উত্তর দিতে পারি নি।
পুরো দু'তলার সব ছাত্র আমার বেডের পাশেই দাঁড়িয়ে আমার লাফালাফি দেখছে।
বেশ কয়েকজন হুজুরও এসেছেন। আরিফ ভাই মাহবুব ভাইকে বললেন,
- মাহবুব কালকে ওর কাপড়-চোপর গুছিয়ে দিয়ো তো, কয়েকদিনের জন্য বাড়িতে রেখে আসবো।
- জ্বী, ভাই।
ডাক্তারের ওষুধ খেয়ে কিছুটা সুস্থ অনুভব করলাম রাতে। পড়াশোনার চাপে জীবন প্রায় ওষ্ঠাগত। ক্বওমীর ৮টি সাবজেক্টের পড়া শেষ করে দাখিলের পড়া শুরু করতে হতো। আবার প্রাইভেটের পড়া দেখতে হতো। দাখিলে বিজ্ঞান নিছিলাম বলেই হয়তো অতিরিক্ত চাপ নিয়ে ফেলেছিলাম।
এখন মনে মনে ভাবি, হয়তো আমার জীবনের চরম ভুল ছিলো দাখিলে বিজ্ঞান নেয়া।
.
(৪৫)
পরদিন অটোতে উঠিয়ে দিয়ে মাহবুব ভাই চলে গেল। আমি রংপুরে আসলাম, আরিফ ভাই জরুরী কাজে আগেই চলে গেছে। অটোতে ওঠার পর বৃষ্টি শুরু হলো।
বৃষ্টি বলতে মোটামুটিরকমের বৃষ্টি। অটো বৈশাখীর সামনে নামিয়ে দিলো। ভাই বৈশাখী পাশে বসে আছেন। আমাকে দেখে হাসলেন। বৃষ্টি থামার পর বাড়িতে নিয়ে যাবেন এ কথা বললেন।
সৌভাগ্যক্রমে ভাই একটা তার পরিচিত অটো পেলেন। হালকা বৃষ্টির মধ্যেই আমাকে নিয়ে অটোতে উঠলেন। যেতে যেতে অনেক কথাই বললো। এখনো আমি পুরোপুরি সুস্থ নই।
খুব বেশিদিন বাড়িতে থাকা যাবে না। সামনে মাদরাসার বার্ষিক পরীক্ষা। ঈদের ছুটির কিছুদিন পর টেষ্ট পরীক্ষা হয়তো শুরু হবে। সব মিলে ব্যস্ততার মধ্যেও দু'টো দিন বিশ্রামে থাকতে হবে।
বাড়ির সামনে নামিয়ে দিলো, উনি বাড়ি আসতে চাচ্ছিলো না। পরে এসেছিলো মিনিট দু'য়েকের জন্য। আম্মুর সাথে দু'টো কথা বলেই চলে গেল।
উনি চলে যাওয়াতে মনে হলো, এ কয়েকদিন খুব মিস করবো তাকে। জীবনে বড় ভাইয়ের ভালোবাসা পাই নি, জানি না কেমন! হয়তো আমার বড় ভাই থাকলে এর চেয়ে বেশি কিছু করতে পারতো না।
প্রথমে উনাকে ভালো না লাগলেও এখন অনেকটাই ভালো লাগে। রাতে যথারীতি সেদিন ফোন দিলেন,
- তোমার শরীর এখন কেমন?
- জ্বী ভালো মোটামুটি।
- সামনে পরীক্ষা, খুব বেশিদিন থেকো না। তোমাকে ফার্ষ্ট না হলেও সেকেন্ড হতে হবে। যারা আমাকে আর তোমাকে নিয়ে মজা করে তাকে ভালো কিছু করার মাধ্যমে দাঁত ভাঙা জবাব দিবে।
- নামায তো পরেন না, তবুও দোয়া করবেন।
- কালকে সকালে আমাকে ডেকে দিবে।
- কালকে আপনার স্কুল বন্ধ?
- শহরে ঢুকতে হবে স্কুলের কাজে।
- জ্বী আচ্ছা।
যে কয়েকদিন বাড়িতে থাকতাম দিনে ৫,৬ বারও কথা হতো। কেন জানি উনাকে খুব ভালো লাগা কাজ করতেন। মনে মনে ভাবতাম, যিনি আমাকে এত বেশি ভালোবাসেন, আমাকে নিয়ে এতো ভাবেন, তাকে তো ভালোবাসাই যায়।
তারপর থেকে প্রায় দিন সকালে ঘুম থেকে উঠিয়ে দিতে হতো।
কোন কোন দিন আমি ক্লাসে বসে ফোন দিতাম। উনি ফোন রিসিভ করতো না। কেটে দিলে বুঝতাম উনি ঘুম থেকে উঠেছেন। কেটে না দিলে বুঝতাম এখনো টের পায় নি।
তাই বারবার দিতেই থাকতাম।
উনি ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ করেই শার্ট পরেই স্কুলে চলে যেতেন। উনার বাড়ির সাথে স্কুল, সে হিসেবে খুব সুবিধা ছিলো। পতাকা ঝুলিয়ে বাকি কাজ শেষ করে সাড়ে দশটায় ফোন দিতেন রীতিমতো।
উনি যে খেয়েছেন সে কথা জানাতেন। জিজ্ঞেসও করতেন আমি খেয়েছি কিনা। সাড়ে দশটায় আমাদের টিফিন টাইম, তাই ফোন ধরাতে বাঁধা ছিলো না।
মাঝে মাঝে সবার আড়ালে কথা বলতে হতো, কারণ ছেলেপুলেরা দেখলেই মজা শুরু করে দিবে। হাসাহাসি করবে, সবসময় আমি নিজেকে একটু গোপন রাখতেই পছন্দ করি।
.
(৪৬)
কে যেন এসে কানে একটা খবর দিলো, খবরটা বিশ্বাস করতে একটু কষ্ট হচ্ছিলো, তবুও প্রথমে বিশ্বাস করি নি। মামুনের কথা বলেছিলাম তো!
মনে আছে তো?
আমার ছোট ভাই, যে আমার হৃদয়ের একপাশটা দখল করে নিয়েছিলো। এই প্রথম কোন সিদ্ধান্ত নিলো আমাকে না জানিয়ে, ও নাকি ক্লাস সেভেনে থাকতেই ক্লাস এইটের রেজিষ্ট্রেশন করে পরীক্ষা দিবে।
তখন এমন নিয়ম ছিলো। হয়তো ভয় পেয়ে আমাকে বলে নি। বিকেলবেলা আমি ওকে ডাকলাম, আসলো। এসেই মাথা নিচু করে সালাম দিলো। আমি উত্তর দিলাম,
- কি খবর! এত বড় সিদ্ধান্ত নিলে অথচ আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করলে না?
কথা না বলে মাথা নিচু করেই আছে। আমিও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম,
- তোমাকে এই বুদ্ধিটা কে দিছে?
- ক্লাসের সবাই মিলে নিছি। সবাই দিবে তাই আমিও দিবো।
আমি এর আগে কয়েকজন ছাত্রকে পরীক্ষা দেয়ার ব্যপারে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তারা নাকি দিবে না। এই প্রসঙ্গ আমি ওর কাছে ব্যক্ত করলাম।
- সবাই কি পরীক্ষা দিবে?
- না।
- তাহলে তোমাকে কেন দিতে হবে? সেভেনের অংক, ইংলিশ না বুঝলে এইটেরগুলো কিভাবে বুঝবে?
- প্রাইভেট পড়বো।
- বাহ! সেই সিদ্ধান্তও দেখি নিয়ে ফেলেছো। আমি শুধু একটা কথাই বলবো, তোমার পরীক্ষা দেয়া ঠিক হবে না।
- আমি পরীক্ষা দিবো।
- ঠিক আছে।
কথাটা বলেই ওর কাছ থেকে চলে গেলাম। মনে হয় বর্তমান ও ওর নিজের স্বাধীনতা চাইছে। আমার কয়েকটা গিফট ফেরত পাঠালো, আমিও পাঠালাম। তারপর থেকে অনেকদিন সে আমার সাথে কথা বলেনি। যদিও পরে সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছিলো।
সেই কবে দেখা হয়েছে, মাঝখানে একবার দেখা হয়েছিলো, আর হয়নি। সেদিন বুঝেছি আসলে ভালোবাসা জিনিষটা আমার জন্য নয়, সবাই মূল্য দিতে জানে না।
সন্ধ্যার পর সেদিন আরিফ ভাইয়ের সাথে দেখা হয়েছিলো। আমার সেদিন প্রচণ্ড মন খারাপ ছিলো।
- কি খবর তোমার মন খারাপ কেন?
উনাকে যবে থেকে কাছের কেউ ভাবতে থেকে শিখেছি তবে থেকে সব কথা শেয়ার করি।
- জানেন, আজকে আমার একটা হৃদপিন্ড ছিঁড়ে গেছে।
- মানে?
- মামুন মনে হয় স্বাধীনতা চায়। আমি তো ওকে বেঁধে রাখি নি, তবুও কেন চলে গেল। আসলে আমি বুঝতেই পারি নি কবে বড় হয়ে গেছে। আমার বাকি হৃদপিন্ডটা ছিঁড়ে গেলে হয়তো পাগল হয়ে যাবো।
কথাগুলো বলতে বলতে আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। উনি আমাকে বুকে টেনে নিয়ে মাথা হাত বুলিয়ে বললেন,
- যে চলে যেতে চায় তাকে চলে যেতে দিতে হয়। তুমি কেঁদো না।
মাদরাসায় ফিরছি আর ভাবছি এ কষ্টের শেষ কোথায়!
সবসময় কেন আমার সাথেই এমন হয়! আরিফ ভাইও কি আমাকে ঠকাবেন! নাকি ভালোবাসবেন!
(চলবে)
জীবনী: অশ্রু ভেজা ডায়েরী
((পর্ব:১৭))
(সত্য ঘটনা)
.
.
(৪৭)
দুষ্টু-মিষ্টি সম্পর্কটা এভাবেই চলছিলো কিছুদিন। নিয়মিত দেখা করা, কথা বলা, ঝগড়া সবই চলছিলো। প্রতিদিন দোকান বন্ধ করার আগে ফোন দেয়ার অভ্যাস ছিলো।
ততক্ষণে হয়তো ঘুমিয়ে যেতাম নতুবা তাহাজ্জুদ পড়তাম ছাদের উপর। ঠিক সময়েই ফোন করতো। কখনো ফোনে কথা বলতে বলতে বাড়িতে যেতেন।
মাঝে মাঝে ফোন ভাইব্রেশন করে কোমরে রেখে দিতাম। যাতে কারো ঘুম ভেঙে না যায় সেজন্য এই পন্থা।
আমার বার্ষিক পরীক্ষার কয়েকদিন আগে ফোনে বললেন,
- আমার সাথে শুধু সম্পর্ক রাখলে চলবে না, আমার পরিবারের সাথেও সম্পর্ক রাখতে হবে।
- আপনি তো আপনার বাড়ি নিয়েই যান না, কেমনে হবে?
- ঠিক আছে, মাঝে মধ্যে নিয়ে আসব।
দু'জনের সম্পর্কটা এবার পরিবার কেন্দ্রিক যাওয়ার হাতছানি। বার্ষিক পরীক্ষার সময় একদিন সময় বের করে আড্ডা দিচ্ছিলাম। হঠাৎ দু'জন পুলিশ আসলো।
দু'জনকেই উনি চিনতেন। আজ রাতে কোথায় যেন আসামী ধরতে যাবেন।
পরামর্শ শেষ করে পুলিশ দু'টোর সাথে আমারো মোটামুটি কথা হলো। আমার মাদরাসার পাশেই থাকতেন উনারা। প্রতিদিন উনাদের ক্যাম্পের সামনে দিয়েই যেত হতো।
প্রতিদিন দেখা হলেও আজকেই প্রথম কথা বললাম।
এভাবে মাঝে মাঝে ক্যাম্পে গেলে আমাকে ফোন দিতেন, ফ্রি থাকলে আসতাম।
তবে আমার লেখাপড়ার যাতে ক্ষতি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতেন। প্রায়ই রাতে আমার সাথে দেখা না করে দোকানে যেতেন না। মাঝে মাঝে অবাক হই।
কোন কারণে গেলে দোকানের সামনে ডাকতেন। ৪ থেকে ৫মিনিট কথা বলে বলতেন,
- আজ যাও, খুব ব্যস্ত আছি। রাতে ফোন দিবো।
- ব্যস্ত থাকলে দেয়ার দরকার নাই।
- রাতে খুব ব্যস্ত থাকি না। আজ ৩০মিনিট বরাদ্দ থাকলো।
উনার কথামতো আমি ওই সময় পর্যন্ত পড়তাম নতুবা ফোন ভাইব্রেশন করে শুয়ে পড়তাম।
মাঝে মাঝে টাইম পার হলে আমিই ফোন দিতাম। ফোন বন্ধ থাকা সত্ত্বেও রুমে আসার আগেই ফোন দিতেন। পরে বলতেন চার্জে ছিলো আর মনে ছিলো না।
মাঝে মাঝে মিসডকল হয়ে থাকতো। বেশ কয়েকবার এমন হয়েছে।
সেদিন রাতের দু'জন পুলিশের একজনকে হঠাৎ মসজিদে দেখলাম নামায পড়তে। নামায শেষে দোয়া করে বসে আছেন।
অন্যন্য ছাত্রদের মত আমিও মসজিদে বসে পড়ছিলাম। রাত ১০টার সময় নামায পড়া দেখে বেশ অবাক হয়েছিলাম। সালাম দিয়ে বললাম হঠাৎ মসজিদে কেন?
উনি বললেন, 'শবেবরাতের নামায পড়তে আসছেন।'
মনে মনে ভাবলাম সারাজীবনন নামায না পড়ে শবেবরাতে নামায পড়ে বুঝি পার পাওয়া যায়!
তার সাথে মসজিদে বসে অনেক্ষণ কথা হলো। তার সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছিলাম, উনিও আমাকে অনেক প্রশ্ন করেছিলেন, আমিও উত্তর দিয়েছিলাম।
শেষপর্যন্ত উনি ওখান থেকে চলে গিয়েছিলেন। রংপুরের মূল কেন্দ্রে আসার পর বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে।
ঈদের ছুটি পাননি বলে ঈদের পরেরদিন আমার বাড়িতেও এসেছিলেন।
লোকটা বড্ড ভালো, এখনো মাঝে মাঝে কথা হয়, দেখাও হয়। নতুন বিয়ে করেছেন কিছুদিন আগে, দোয়া করবেন যাতে নব দম্পতি সুখী হয়।
.
(৪৮)
সেবার বার্ষিক পরীক্ষায় তৃতীয় হয়েছিলাম। কথা ছিলো আমাকে বাড়িতে রেখে আসবে, কিন্তু বাড়িতে যাবার দু'দিন আগ থেকে দেখা হয়নি। ফোনে মাত্র কয়েকবার কথা হয়েছে। উনি বলেছিলেন শহরে থাকবেন। শহর থেকে বাড়িতে রেখে আসবে।
আমি শহরে গেলাম কিন্তু উনার দেখা পেলাম না। উনি চলে গেছেন। মাথাটা বিগড়ে গেল। আমাকে ফোনে এটা ওটা বোঝাতে লাগলো। আমি রাগ হয়ে ফোনটা কেটে দিয়ে বন্ধ করে রাখলাম।
বাড়িতে এসে লাইট অফ করে শুয়ে পড়লাম। রাতেও যথারীতি ফোন দিয়েছেন, আমি রিসিভ করি নি।
দু'দিন কথা না বলায় আমি একটু পাগলের মতো হয়ে গেছিলাম। যদিও ফোন দিলেও তখনো রিসিভ করতাম না।
রাতে একটা মেসেজ করলাম।
পরদিন রোযা অবস্থায় একটা পরিচিত ছেলেকে নিয়ে বাড়ির সামনে এলেন। আমাকে ফোন দিলেন, বাট রিসিভ করলাম না।
আজমির ভাই ফোন দিয়ে বললেন উনারা আমাদের মেইন রোডের পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
রাগ আর থাকলো না, চলে গেলাম। দেখি সত্যি সত্যি সেখানে। সালাম দিয়ে কিছুক্ষণ কথা হলো।
আজমির ভাই সামনে গেছে। আরিফ ভাই মেসেজের মূল উদ্দেশ্য জানতে চাইলো।
বাট আমি বললাম না। শুধু এতটুকু বললাম,
- বোঝার মতো ক্ষমতা নিশ্চই আছে আপনার। তারপরও কেন জিজ্ঞেস করছেন?
উনি মুচকি হাসলেন। বাড়িতে আসতে বললাম কিন্তু আসলেন না। রাগ ভাঙিয়ে চলে গেলেন। আবার ঠিকমতো কথা হতো। রমযান মাসের শেষের দিকে মাদরাসায় গেলাম। মাহবুব ভাইয়েরা বেশ কয়েকজন আছে সেখানে।
বাড়িতে ভালো লাগছিলো না, তাই উনাকে ফোন দিলাম।
উনি আসতে নিষেধ করে বললেন,
- এসময় আমার মাথা একটু গরম আছে। তুমি এসো না। মাথা গরম হলে তোমাকে মারতেও পারি। তখন তুমি ভুল বুঝে হয়তো চলে যাবে।
- আপনার কি মনে হয়, আপনার সাথে দেখা করার জন্যই আমি যাচ্ছি? আমার কি মাদরাসা নাই? আমার কি বন্ধুরা সেখানে নাই?
- তবুও তুমি এসো না। তুমি আসলে দেখা করতে ইচ্ছে করবে।
আমি বেশি কথা না বলে ফোন কেটে দিলাম। মাদরাসায় গেলাম, সন্ধ্যা পর্যন্ত ভালোই সময় কাটলো। সন্ধ্যার পর পাপড়, পিঁয়াজু খাওয়ার জন্য সবাই মিলে বের হলাম।
আমি দেখলাম উনি দোকানে বসে আছে।
তবুও কোন কথা বললাম না। চুপচাপ বন্ধুদের সাথে খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষ করে চলে আসলাম।
রাতে দু'বার ফোন দিছিলেন তিনি। আমি টের পাইনি। সাহরীর সময় ফোনে দেখলাম দু'টো মিসডকল।
ব্যাক করলাম,
- ফোন দিছিলেন নাকি?
- নাতো?
- রাত দেড়টার সময় আপনার ফোন থেকে যা এসেছে সেটা তাহলে কি?
- হাতের চাপে হয়তো গিয়েছে।
- হাতের চাপে একবার আসতে পারে , তাই বলে দু'বার?
বারবার অস্বীকার করলেন। আমি প্রচণ্ড রাগ হলাম। সত্যি কথা বললে কি আমি উনাকে মেরে ফেলব?
রাগ এমন পর্যায়ে উঠলো যে কথা বলতে বলতেই প্রাচীরে আছাড় দিয়ে কাঁদতে থাকলাম।
রুমে কেউ নেই, সবাই খাবার নিতে লজিং বাড়িতে গেছে। ভাগ্য ভালো কেউ দেখেনি, নতুবা আমাকে পাগল ভাবতো।
.
(৪৯)
সাহরী খেয়ে নামায আদায় করে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম থেকে উঠে ছাদে একলা বসে আছি। আকাশে মেঘের ঘনঘটা। মনে হচ্ছে বৃষ্টি আসবে। প্রকৃতিটা বেশ ভালো লাগছিলো।
অনেকেই এখনো ঘুমাচ্ছে।
ফোনটা বেজে উঠলো। দেখি আরিফ ভাইয়ের ফোন।
রিসিভ করলাম। আমাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে উনি বললেন, 'আমি অসুস্থ'......
ব্যস তাতেই ফোন কেটে দিলেন। এর মানে উনি ডাকছেন আমাকে। আমি পাঞ্জাবি গায়ে জড়িয়ে একটা ছাতা নিয়ে নেমে পরলাম। বৃষ্টি শুরু হয়েছে, প্রচণ্ড বৃষ্টি!
আমাকে যেতেই হবে! কখনো তিনি এভাবে অসুস্থ হয়ে ফোন করেন নি। রাস্তা ফাঁকা! মাঝে মাঝে দু'একটা অটো চললেও আমি একা, যে কিনা ছাতা নিয়ে কোথাও যাচ্ছে।
চারপাশে অনেক লোক আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
বাড়িতে ঢুকেই সালাম দিলাম। লুঙিটা বেশ ভিজে গেছে।
বড় আম্মাকে বললাম ভাই কোন ঘরে?
উনি দেখিয়ে দিলেন। আমি গিয়ে দেখি সত্যি সত্যি উনার জ্বর এসেছে।
আমাকে চোখ মেলে দেখে মেকি হাসলেন। আমি উনাকে মিনমিন করে জিজ্ঞেস করলাম কখন থেকে অসুস্থ?
উনি আমাকে উত্তর দিলেন, সাহরীর পর থেকে।
আমি উনাকে চোখ বন্ধ রাখতে বললাম। আস্তে আস্তে মাথা টিপতে শুরু করলাম।
যদিও উনি বাঁধা দিয়েছেন তবুও আমি শুনিনি।
ঘন্টা দেড়েক উনার পাশে থাকার পর মাদরাসায় চলে আসি।
এখন আর বৃষ্টি নেই। তাই ছাতা খুলতে হয়নি। উনাকে বলে এসেছি আজকে দোকান না যেতে।
কিন্তু কে শোনে কার কথা! যোহরের পর আমাকে ফোন দিলো,
- কি খবর?
- এখন একটু সুস্থ আমি। শহর যাচ্ছি, তুমি বাড়ি যাবার সময় দেখা করিও।
- এই আপনাকে না বললাম অসুস্থ শরীর নিয়ে কোথাও না যেতে?
- কিন্তু চারদিন পর ঈদ, এখন না গেলে দোকানে মাল চড়বে না। তাছাড়া দোকানে এমন কেউ নেই যে মাল করে আনতে পারবে। আমি শুধু মাল করে দিয়েই চলে আসবো। দোকানে আজ বসবো না। হলো তো এবার?
- আপনার যা খুশি করেন, আমি কিছু জানি না।
বলেই ফুস করে কেটে দিলাম। সবসময় অন্যের জন্য চিন্তা! নিজের কথা একটিবারও ভাববে না। কতবার বললাম আজকে বের হবার কোন দরকার নেই, কে শোনে কার কথা!
রংপুরে অটো থেকে নেমে দেখলাম দুই অটো মাল বোঝাই করেছে। আমি একটু দূরে দাঁড়ালাম। উনি আমাকে দেখে খানিকটা হাসলো।
মাল তোলা শেষ হলে আমার কাছে এসে দাঁড়ালো,
- কি খবর?
- আপনাকে বললাম আজকে বিশ্রাম নিতে? কথা শোনেন না কেন?
- আজকে মাল না করলে দোকান খালি হয়ে যাবে। কাষ্টমার ফেরত যাবে। তুমি রাগ করো না। ইফতারের সময় বেশি নেই, আমার সাথে ইফতারি করবে নাকি বাসায় যাবে?
- আমি চলে যাবো।
- ঠিক আছে যাও, আমিও তাহলে চলে যাই। রাতে ফোন দিবো।
আমি বাড়িতে চলে আসলাম। রমযান মাসের প্রতিটা দিন রাতে দু'বার করে ফোন দিতো। একবার ঠিক ১২টায়, আরেকবার সাহরীর জন্য তুলে দিতো।
লোকটা পাগল! বড্ড পাগল! লোকেরা সবাই ঠিক কথাই বলে।
(চলবে)
জীবনী: অশ্রু ভেজা ডায়েরী
((পর্ব:১৮))
(সত্য ঘটনা))
.
.
(৪৯)
ঈদের পর বাড়িতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় না করে মাদরাসায় চলে গেলাম। কারণ আর এক মাস পরেই টেষ্ট পরীক্ষা শুরু হবে। মাদরাসার পাশে প্রাইভেটটা সুবিধার মনে হচ্ছিলো না, তাই আমার বাড়ির পাশে ভালো একজন স্যার ঠিক করেছিলাম।
দু'জন মিলে পড়তাম। সপ্তাহে তিনদিন বাড়ি আসতে হতো। মাদরাসার ক্লাস ১২.৩০ মিনিটে শেষ করে অটোতে বাড়ি চলে আসতাম। বাড়িতে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে প্রাইভেটে যেতাম। প্রাইভেট থেকে বাড়িতে এসে আবারো মাদরাসার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়তাম।
এভাবেই চলেছে পরীক্ষার শেষ ছয় মাস। এভাবে দৌঁড়ানি ভালো লাগছিলো না। খুব টায়ার্ড লাগতো। কিন্তু কিছুই করার ছিলো না, সাইন্স নিয়েছি সাহস করে কষ্ট তো করতেই হবে।
একদিন বাড়িতে এসে দেখি আপু কাঁদতেছে। পরে জানতে পারলাম দুলাভাই আগের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক বাড়ি করে চায়। যেহেতু তাদের সম্পত্তি এখন ভাগ হয়ে গেছে।
আব্বু কোন কূল কিনারা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। আপুকে বাড়ি করে দিতে হলে যেটুকু জমি আছে সবটুকু বন্ধক রাখতে হবে।
আব্বু আমাকে ফোন করে সব বললেন, আমি জমি তাকে বন্ধক রাখার জন্য বললাম। শেষপর্যন্ত সবটুকু জমি বন্ধক রেখে আপুকে ৩টা রুম পাকা করে দেয়া হলো।
আম্মুও ব্যক্তিগতভাবে ধার কর্জ করে ৬০হাজার টাকার মতো দিয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে আজো বন্ধক জমির অর্ধেক ছাড়াতে পারি নি।
আম্মু তার ধার শোধ কিভাবে করবেন ভেবে সেলাই মিশিন চালানো শুরু করেন। শুরু হয় নতুন এক যুদ্ধ। আপু প্রায় প্রতিদিন এসে কাঁদতো। দুলাভাই যে বিভিন্ন কথার মাধ্যমে তাকে অত্যাচার করতো, তার কথা।
কখনো সরাসরি ভাবে বলে নি, কিন্তু আকার ইঙ্গিতে বুঝাতেন। আপুর মুখের জন্য আমার আব্বু সব করতে পারেন। তাইতো আমার অনুমতি নিয়ে জমিগুলো বন্ধক রেখে বাড়ি করে দিয়েছে।
আমার দুলাভাই ভালো, তবে কখনো জেদ উঠলে আর সেটা না পেলে অভিমান করে সবকিছু ছাড়েন। আপু এখন নতুন বাড়িতে ভালো আছে, বেশ সুখে আছে। নেই কোন ঝগড়া কিংবা কোন্দল।
এসব চিন্তায় শরীর খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। সারাদিন পড়ার চাপ, আবার চিন্তা। পড়তে বসলে দুঃখের স্মৃতিগুচ্ছ মনে পরে যায়। পড়া আর হয়না।
মাঝে মাঝে গভীর রাতে ছাদে বসে কাঁদি। হয়তো তখন আমার অবলম্বন আরিফ ভাই পাশে থেকেছে বলে সবটা খুব গভীরভাবে বুঝতে পারি নি।
টেষ্ট পরীক্ষায় সবার থেকে বেশি পয়েন্ট পেলাম, রেজাল্ট খারাপ ছিলো না ৪.৭৫.....
শিক্ষকরা আমার লেখার ধরণ দেখে অবাক হয়ে যেত। সত্যি কথা বলতে আমি গতানুগতিক একটানা বর্ণনা দিতে পছন্দ করি না।
এমন কিছু লিখবো যাতে শিক্ষক নাম্বার দিতে বাধ্য হন। টেষ্টে এমনো হয়েছে কোন সাবজেক্টে কেউ প্লাস না পেলেও আমি পেয়েছিলাম। তবে সাইন্সের সাবজেক্টস ছিলো আমার সব থেকে বড় প্রতিবন্ধকতা।
আমি আগে থেকে বুঝতাম, যদি আমার প্লাস মিস হয় তাহলে এর জন্যই হবে। তবুও এক বই বারবার রিভিশন করতাম। এক পর্যায়ে জীববিজ্ঞান বই পুরো মুখস্ত হয়ে গিয়েছিলো।
তখনো পদার্থ আর রসায়নে একটু দুর্বল ছিলাম। তখন বুঝতাম, সাইন্স আমাদের ক্বওমী মাদরাসার ছাত্রদের জন্য নয়।
.
(৫০)
কি কারণে যেন মাদরাসা কয়েকদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। এবারের নিয়ম ছিলো বন্ধের সময় কেউ মাদরাসায় থাকতে পারবে না। আমিও বাড়ি চলে গিয়েছিলাম।
কিন্তু আরিফ ভাইকে না দেখে থাকা যেন একটু কঠিনই হয়ে গিয়েছিলো। উনি দেখা করার জন্য আসতে বললেন।
আমি মাদরাসার পাশে গিয়ে ফোন দিলাম।
সন্ধ্যার সময় স্কুল ঘরে বসে গল্প করছিলাম। উনি বলেছেন আজ সারারাত গল্প করবো। আমিও ভেবেছিলাম, একদিন তো থাকাই যায়।
হঠাৎ তার মোবাইলে ফোন আসলো। তাকে নাকি শহরে যেতে হবে। কিন্তু আমাকে মিথ্যা কথা বললেন যে, উনি পাশেই যাবেন ছোট্ট একটা কাজে।
সন্ধ্যায় ঘরের ভিতর তালা লাগিয়ে কাজে বের হলো। আমি উনার বিস্কিটের ঘরে বসে রইলাম। ফোনেও বেশি চার্জ ছিলো না। আধা ঘন্টার কথা বলে উনি সাড়ে তিনঘণ্টা বাইরে থেকে চিৎকার দিতে দিতে আসলেন,
- আমার ভাইটা কোথায় রে?
আমি রাগ হয়ে কয়েকটা ঝারি দিলাম। তখন রাত এগারোটা ছুঁইছুঁই। উনার প্রতি রাগ হয়ে বললাম,
- আমি থাকবো না, আমাকে বাড়িতে রেখে আসেন।
উনি খুব মন খারাপ করলেন। কিন্তু মিথ্যা কথা বলা আমি পছন্দ করি না। পরে রাত ১২.৩০ মিনিটে উনি বাড়ির সামনে নামিয়ে দিলেন। বাড়িতে আসার জন্য খুব জোর করলাম কিন্তু উনি আসলেন না।
সারা রাস্তায় আমার সাথে একটা কথাও বলে নি। বাড়িতে ঢুকেই দেখি আম্মু-আব্বু জেগে আছে। আমি হারিয়ে গেছি এ জন্য কাঁদছেনও। ফোন বন্ধ ছিলো চার্জ ছিলো না বলে।
বাড়িতে এসে খাবার না খেয়ে অনেকগুলো গালি হজম করতে হলো।
দু'দিন আমার সাথে ভালে করে কথা বললেন না আরিফ ভাই। আমারও ভীষণ খারাপ লাগছিলো। কারণ উনাকে আমি এখন খুব ভালোবাসি। এতটাই ভালোবাসি
যে উনাকে ভুলে যাব একথা ভাবতে পারি না।
জানি না একেমন বাঁধনে আমি বাঁধা পরেছি। আরিফ ভাইয়ের বাড়ির লোকের সাথেও আমি ভালে সম্পর্ক করেছি। কারণ উনিই করতে বলেছেন, যাতে আমাদের সম্পর্কটা সারাজীবন টিকে থাকে। প্রতিদিন না গেলে সপ্তাহে দু'টো দিন গিয়ে দেখা করে আসতে হতো উনার বাড়ি থেকে।
ভালোই ছিলাম আমি, আবার ঝগড়া হল মনকষাকষি। কথা হতো না।
আমি রাগ করলে উনি বলে উঠতো,
- হায় হায় আকাশে আজ অনেক মেঘ। কখন যে ঝড় আসবে, কে জানে।
উনি যে কথাটা আমাকেই বলছে তা আমি ভালো করেই বুঝতে পারি। উনার এই কথায় হেসে ফেলতাম আমি। রাগ পানি হয়ে যেত।
উনি রাগ হলে সরি বলে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরতাম। কখনো কখনো এতেও রাগ ভাঙতো না। সেজন্য ঘুমের ওষুধ খেয়ে মেসেজ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম।
তখন অনর্গল ফোন দিলেও রিসিভ করতাম না। কিংবা কারো কাছে ফোন থাকলে বলতো আমি ঘুমিয়ে গেছি।
পরেরদিন যখন আবার ফোন দিতো, তখন কিছু গালি বা রাগ হজম করতে হতো।
মাঝে মাঝে হালকা চড়ও বসিয়ে দিতো গালে।
.
(৫১)
ফাইনাল পরীক্ষার কিছুদিন আগে রাতে কথা বলার সময় কে যেন মামাকে বলে দিয়েছিলো আমি রাতে কথা বলি।
আমি ছাদে কথা বলছিলাম, হঠাৎ মামা আমার সামনে এসে হাজির ,
- তুমি এত রাতে ছাদে কি করো?
- বসে আছি, ঘুম আসছিলো না।
- ঘুমাইছিলা কখন?
- এইতো কিছুক্ষণ আগে।
- যাও ঘুমিয়ে পড়ো। সামনে পরীক্ষা, রাত জেগে কথা না বলাই ভালো।
মামার এ কথা শুনে বুঝতে পারলাম কে যেন বলে দিয়েছে। তাছাড়া আরিফ ভাইয়ের সাথে সম্পর্কটা আমার ক্লাসের ছেলেরা ভালো চোখে দেখতো না।
তারা যেটা ভাবতো সেটা ভুল, তিনি আমার ভাই, অনেক ভালো বন্ধু। সুখের-দুঃখের সাথী।
পরদিন প্রাইভেট পড়ার জন্য বাড়িতে আসলাম। বাড়িতে এসে দেখি এখানেও সমস্যা। আব্বু লম্বা বক্তৃতা দিয়ে উনার সাথে কথা বলা আর দেখা করতে নিষেধ করলেন।
আমি সেদিন অনেক কেঁদে বলেছিলাম,
- আমি উনাকে ভুলতে পারবো না। উনি তো আমার কোন ক্ষতি করেন নি। তাছাড়া আপনারাই তো উনার হাতে আমাকে তুলে দিয়েছেন। তাহলে এখন কেন মানুষের কথায় এমন বলছেন? নাকি আমার রেজাল্ট খারাপ পেয়েছেন।
- তুমি যা ইচ্ছে করো, তবে লেখাপড়া যেন ভালো ভাবে করতে পারো সেটা মাথায় রেখ।
অনেক রাগ করে ঘরে এসে লম্বা একটা চিঠি লিখলাম। আপুর ফোনটা কিছুদিনের জন্য ধার নিলাম। যথারীতি প্রাইভেট পড়ে মাদরাসায় গেলাম। মাদরাসা যাবার আগে
আরিফ ভাইয়ের বাড়িতে ঢুকে উনাে সবকিছু ফেরত দিয়ে
মাদরাসায় চলে আসলাম।
যখন উনার বাড়ি থেকে চলে এসেছি তখন ঘুমাচ্ছিলেন। মাদরাসায় এসে খুব আমার অন্য ফোন দেখে কয়েকজন জিজ্ঞেস করলেন।
আমি খুব জোরে কাঁদছিলাম। সবাই হতভম্ব হয়ে গেছে।
আমার হৃদয় থেকে দু'টো হৃদপিন্ডই ছিঁড়ে গেছে।
চিঠির শেষ কথাটা ছিলো, ""আজ থেকে তোমাকে মুক্তি দিলাম।"""
মাঝখানে উনি উনাকে তুমি বলার অধিকার দিয়েছিলো। এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, 'আমরা তো একটাই আত্মা, দু'টো দেহ।'
মাঝে মাঝে গান শোনাতেন আমাকে। উনার ফেভারিট গানটা হলো,
"এতোটা দিন এতো বছর ধরে, যে স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে আছি।
তুমি কেমন করে সে স্বপ্নগুলো ভেঙে দিলে।"
হাজারো স্মৃতি তাড়া করে বেড়াচ্ছিলো আমাকে। আমি ভিতরটা হাহাকার হয়ে যাচ্ছিলো। সবাই আমাকে সান্তনা দিলো।
লজিং বাড়ি যাবার সময় উনাকে দেখলাম, মুখোমুখি, তবুও কথা বলি নি। উনি মুচকি হেসেছেন।
রাতে খুব দ্রুত ঘুমিয়ে গেলাম। সকালে উঠে দেখি রাত দেড়টার সময় দুটো ফোন। সবকিছু মুছে ফেলে পড়ায় মনোযোগ দিলাম। মাদরাসা বন্ধ ছিলো বলে অন্য ক্লাসের ছাত্ররা এসব জানতো না।
যোহরের আগে গোসল করে এসে দেখলাম আবার ফোন!
ব্যাক করলাম না, কি দরকার!
সকালে আজমির ভাই ফোন দিয়ে আধা ঘন্টারো বেশি সময় কথা বলেছেন। উনিও জানেন হয়তো আমাদের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া সম্পর্কে।
উনি উল্টিয়ে পাল্টিয়ে বুঝাতে চাইছেন, রাতে আরিফ ভাই অনেক কেঁদেছে যখন আমি ফোন রিসিভ করি নি।
((চলবে))
āĻোāύ āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āύেāĻ:
āĻāĻāĻি āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āĻĒোāϏ্āĻ āĻāϰুāύ