জীবনী: অশ্রু ভেজা ডায়েরী
((পর্ব: ৪))
((সত্য ঘটনা অবলম্বনে))
.
.
(৯)
আপুর বিয়ে হবার বেশ কয়েকমাস আসে পৃথিবী একটি দিনের জন্য অতিথি হয়ে এসেছিলো আমার ছোট্ট বোনটি। আম্মার অবস্থা খুব খারাপ দেখে মেডিকেলে নেয়া হয়েছিলো। মেডিকেলে পৌঁছার পূর্বে আম্মা আল্লাহর কাছে দোয়া করে বলেছিলেন,
'হে আল্লাহ! তুমি ডাক্তারদের সামনে আমাকে বেইজ্জত করো না।'
আল্লাহ তার ডাক শুনেছিলেন, তাইতো মেডিকেলের বেডে শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর আলো দেখেছিলো আমার ছোট্ট বোনটি। অবস্থা একটু খারাপ বিধায় কাঁচের বোতলে রাখা হয়েছিলো। আম্মাও তাকে খুব বেশি দেখে নি।
মায়ের শাল দুধ খাওয়ানোর পর তাকে কাঁচের বোতলে রাখা হয়।
সেদিন রাত্রেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যায়। আমি নিজেও তাকে একটিবারের জন্যও দেখি নি। ছোট ছিলাম বলে আমাকে নিয়ে যায় নি।
গভীর রাত্রে ছোট্ট বোনটাকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছিলো। হালকা করে গোসল দিয়ে কবরের রেখে আসা হয় তাকে। সারারাত কেউ আমাকে ডাকে নি। আমি ঘুমেছিলাম।
সকালবেলা জানতে পারলাম, আমি ছোট্ট বোনটি পৃথিবীতে বেঁচে নেই। ভাইকে একটি বারও না দেখে চলে গেল।
আম্মার নতুন ময়না হবে জেনে খুশিতে আত্মহারা ছিলাম আমি। কিন্তু তাকে শেষঅবধি এক পলকও দেখার সুযোগে হয়নি। সকালে নতুন কবরটি দেখে চোখ থেকে আচমকাই পানি ঝরে পরেছিলো।
বড় আম্মুর কাছে জানতে পারলাম, ছোট্ট শিশুটি নাকি অনেক সুন্দর হয়েছিলো। আমার বড় আপুর থেকে নাকি বেশি সুন্দর। আম্মুও জানতো না আমাদের নতুন অতিথি রাতে মারা গেছে। পরে জানতে পেরেছিলেন তিনি।
তখন তিনি বলেছিলেন,
'দুষ্ট জ্বিন তাকে নাকি বলেছিলো, আমার পরে আর একজনকেও সে বাঁচতে দিবে না। আমিই নাকি ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছি।'
আম্মা খুব বেশি দুঃখ করে নি। শুধু মায়ের দাবি হিসেবে কেঁদেছিলো। আজ হয়তো সে বেঁচে থাকলে মাধ্যমিক পর্যায়ে লেখাপড়া করতো। আমার বোনের একদিন আগে গ্রাম্য এক ভাবীর মেয়ে হয়েছিলো। সেই মেয়ে আজ ক্লাস নাইনে পড়ে। মাঝে মাঝে ভাতিজিকে দেখলে মনে হয়, 'আজ যদি আমারো বোনটা বেঁচে থাকতো ঠিক এতটুকুই হতো।'
ছোট বোন ছিলো না বিধায় কখনো তার সাথে খুনসুটির আনন্দ লাভ করতে পারি নি। আমারো তো ইচ্ছে ছিলো ছোটবোনকে নিয়ে নাচানাচি করবো, হাসবো, খেলবো আরো কত কি!
আম্মা একবার ভীষণ অসুস্থ হয়েছিলো। ক্লিনিকে ভর্তি করানোর পর পেটের কি যেন অপারেশন করতে হয়েছিলো। সে অপারেশন করার সময় বাচ্চা ধারণের থলিটা কেটেছিলো ডাক্তার। ওটা না কাটলে নাকি সমস্যা আরো বাড়বে।
আম্মা-আব্বু ভেবেছিলেন, পাঁচটা বাচ্চার তিনটেকেই তো মেরে ফেললো। হুমকি দিয়েছে বাকিগুলোকেও মারার। তাই আর বাচ্চা নিয়ে কি হবে!
ডাক্তারকে অনুমতি দিয়েছিলেন থলিটা কেটে ফেলার।
তারপর থেকে ইচ্ছে হলেও আর নিতে পারতো না। আজ আমি একটা ছোট বোন বা ভাইয়ের অভাব টের পাই।
আপু স্বামীর বাড়িতে, আমি মাদরাসায় থাকি। বাড়িটা সম্পূর্ণ খালি থাকে। হাহাকার করতে থাকে চারদিক।
.
((১০))
১১ বছর শেষে সবে ১২তে পা দিয়েছে আপু। ক্লাস ফোর সবে মাত্র শেষ, তখন দেখলাম বেশকিছু লোক নিয়মিত আসা-যাওয়া করে। ফিসফিস করে কথাবার্তা হয়।
(কিছু তথ্য আগেই জেনেছেন।)
ফুফুদেরকে মজা করে বলেছিলাম, 'আপুর তো বিয়ে একমাস পরে, এতদিন থাকতে হবে আমাদের বাড়িতে।'
ফুফুরা হেসেছিলেন তখন। হাসার অর্থ তখনি বুঝতে পারি নি, বুঝেছি মাঝ রাতে।
আমার বড় আব্বুর বড় মেয়ে আমাকে ঘুম থেকে ডেকে দিলো। বাড়িতে অনেক লোকের সমাগম।
তখনো বুঝি নি আমার বোনের বিয়ে হতে যাচ্ছে।
আপুকে দেখছি ঘরের এক কোণে কান্না করছে। হয়তো সে কান্না তখন না বুঝলেও এখন ঠিকই বুঝি।
সেই কান্নায় ছিলো বিয়ে না করার একটা প্রবণতা। সেই কান্নায় ছিলো লেখাপড়া করার চাহিদা। সে কান্নার মাঝে লুকায়িত ছিলো আর দশটা ছেলে-মেয়েদের মতো দুরন্তপনায় মেতে থাকা।
দুলাভাই নাকি কথা দিয়েছিলেন আপুকে এসএসসি পর্যন্ত পড়াবেন। ততদিন সে আমাদের বাড়িতেই থাকবে। তার বাবা অসুস্থ, আমার তাওয়াই মশাই চান মরার আগে তার এই ছেলের বউকে দেখে যেতে।
সেসব কথা থাক। আপু বিয়ের সময় কবুল বলছিলো না। কোনক্রমেই মুখ খুলছিলো না। আমার পীর নানুর বড় বউ আপুর পাশে বসে মাথায় বারবার হাত দিয়ে বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। আপু অশ্রুসিক্ত চোখে মামির মুখের দিকে তাকাচ্ছিলো। অনেকক্ষণ বাদে একবার কবুল বলেছিলো।
তাও আবার খুব আস্তে।
আমি আর ফাতেমা আপু (বড় আব্বুর মেয়ে) মিষ্টি না পেয়ে মিষ্টি বিস্কিট আর শরবত নিয়ে গেলাম।
আমি বিস্কিট খাওয়ালাম আর ফাতেমা আপু শরবত খাওয়ালো।
আমাকে একশ টাকা আর ফাতেমা আপুকে পঞ্চাশ টাকা দিয়েছিলো। সেদিন আমার পীর নানুও আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন।
আমার দুলাভাই নাকি তার নিকটতম আত্মীয়। পরে জেনেছি তার শ্যালক হোন। সেদিক দিয়ে তারাও এ বিয়েতে পজেটিভ মত দিয়েছেন। আব্বু বিয়ের আগে আমার ১০জন বড় আব্বুর মত নিয়েছিলেন, সবাই পজেটিভ জবাব দিয়েছিলো। ছেলে নাকি অনেক ভালো।
নিজের কাচামালের দোকান আছে, জায়গা জমি আছে, মায়ের ভাগ এখনো পাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। তাছাড়া অনেকটা পাশেই বাড়ি তো, সেজন্য আব্বুও ছেলেকে খুব ভালো করেই চিনতো।
ছেলের সবটুকু দেখতে গিয়ে সবাই আমার আপুর সুখটুকু বিসর্জন দিয়েছিলো। কেউই তার কান্নার ভাষা বুঝতে পারে নি। আম্মা বিয়ে দিতে চায় নি, কিন্তু তিনিও আব্বুর মারের ভয়ে কিছু বলতে পারে নি।
বিয়ের পরের দিন আম্মা আপুকে বললেন নাস্তা নিয়ে যেতে। আপু সেদিন অবাক করে বলেছিলেন,
'কি কও মা! এত বড় লোকের সামনে আমি যেতে পারবো না।'
তারপর আব্বুর রাগারাগিতে আসতে বাধ্য হয়েছিলো। আসলে দুলাভাই আমার মোটামুটি ভালোই। তবে মাঝে মাঝে এমন সব কার্যকলাপ করতেন তা আমাদের কাম্য ছিলো না। যেমন, ভালো মানুষ বাড়ি থেকে বের হয়ে বাজারে গেল, কে যেন কি আজেবাজে বললো, তারপর থেকে অভিমান। সেই অভিমানের খেসারত দিতে হতো আমার আম্মাকে। আব্বু কিছু শুনলেই আম্মাকে ধরে মারতো।
.
(১১)
শুরু হলো আমার আর আপুর সংগ্রাম।
মাঝে মাঝে আম্মাকেও তার খেসারত দিতে হতো মারের মাধ্যমে। দুলাভাইয়ের সাথে স্বাভাবিক হতে বেশ সময় লেগেছিলো। বিয়ের পর আমার তাওয়াই মশাই আমার আপুকে দেখার জন্য এসেছিলেন।
তিনি আমাদের বংশকে খুব ভালো করেই চিনতেন। তিনি অসুস্থ ছিলেন তবুও শখ হয়েছিলো তার।
আম্মা আপুকে পাখা দিয়ে বলেছিলো, 'যা মা, তোর শ্বশুরকে একটু বাতাস কর। তিনি খুশি হয়ে তোকে দোয়া দিবেন।'
আপু পাখা নিয়ে এসেছিলেন ঠিকই, কিন্তু ঘটনা ঘটেছিলো ঠিক উল্টো। বেশখানিকটা সময় পর আম্মা এসে দেখলো, আপু ঘুমিয়ে গেছে তার শ্বশুরের পাশে। তাওয়াই মশাই নিজেই আপুকে বাতাস করছিলেন।
আম্মা এ দৃশ্য দেখার পর হতভম্ব হয়ে আপুকে ডাক দিলেন। তাওয়াই মশাই তখন বলেছিলেন, 'থাক না বিয়াইন, ছোট মানুষ।'
আমার তাওয়াই মশাই যতটা ভালো মানুষ ছিলেন, তার থেকে একটু কঠোর ছিলেন আমার মাওয়াই মা।
তার কথা না হয় পরের পর্বে লিখবো। আপুর বিয়ে হবার সময় আমার বয়স ছিলো ৭ বছর।
রুটিন মাফিক প্রত্যেকদিন দুপুরে দোকানে দুলাভাইকে ভাত দিয়ে আসতে হতো। ঝড় হলেও মাফ ছিলো না আমার।
একদিন যেতে চাইনি বিধায় আব্বুর মাইর কপালে জুটেছিলো। তারপর থেকে আর কোনদিন না বলি নি।
আপু্ও যদি তার শ্বশুরবাড়িতে থাকতো তখনো তার বাসায় গিয়ে ভাত দিয়ে আসতে হতো।
আমি ছোটমানু্ষ! অনেকেই অনেক কথা বলতো। আমি কথা না বলে আমার পথ চলতাম। ভাত দিয়ে আসার সময় দু্লাভাই আমাকে দু'টাকা করে দিতেন।
তাতেই যেন মহাখুশি আমি। হাটের দিন করে আব্বু দু'টাকা আর দু্লাভাই দু'টাকা মোট চারটাকা নিয়ে বাড়ি চলে আসতাম। বর্তমান আমি যে ঘরটায় থাকি সে ঘরটাতে আপু ও দুলাভাই থাকতো।
বাড়ির গাছ কেটে খাট, ডেসিন টেবিল, আলমারি সব বানিয়ে দিয়েছিলো আব্বু। আপু ভালো ছাত্রী ছিলো বিধায় স্কুলের স্যারেরা তাকে ফাইভ না পড়িয়ে সিক্সে ভর্তি হতে বলে। এমনটা হওয়াতে বেশ খুশি হয়েছিলো সবাই। (বাকিটুকু পরের পর্বে লিখবো।)
আমি তখন ক্লাস টু'তে পড়ি। অন্যসব ছেলেদের মতো আমিও খেলছিলাম। পাশেই দেখলাম বাঁশঝাড়ের পাশে কদম গাছ কাটছে। কদম ফুল নেবার জন্য আমি একাই ছুটে গেলাম। আমার দূর সম্পর্কের এক ভাই আমাকে বললেন, 'কি রে দু'টাকা নিবি? আর ক্যাসেটের ডিক্স?'
ক্যাসেটের ডিক্সের তারগুলা ঝলমল করলে বেশ ভালো লাগে আমার। আমি হ্যাঁ বলে উত্তর দিয়েছিলাম।
তারপর সে আমার হাত ধরে বাঁশঝাড়ে নিয়ে সমকামীতায় লিপ্ত হয়। আমি তখনো এই বিষয়ের সাথে নতুন ছিলাম।
ভাইকে বললাম, 'কি করছিস ভাই?'
সে শুধু আমার মুখ চেপে ধরেছিলো। প্রথমবারের মতন কারো কাছে ধর্ষিত হলাম। বাড়িতে মারের ভয়ে বলতে পারি নি।
((চলবে))
জীবনী: অশ্রু ভেজা ডায়েরী
((পর্ব:৫))
((সত্য ঘটনা অবলম্বনে।))
.
.
(১২)
ক্লাস সেভেনে পড়ে আপু। আমি তখন ক্লাস থ্রীতে।
আপু প্রেগন্যান্ট হয়ে গেল। তখন ওর বয়স ১৫ বছর। দুলাভাইয়ের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এসএসসি পর্যন্ত পড়ানোর কথা থাকলেও ক্লাস সেভেনেই থেমে যায় আপুর পড়াশোনা।
দুলাভাই বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন কথা শুনতো, যার প্রভাব ফেলতো আমাদের উপরে। সেটা বিভিন্নভাবেই হয়েছিলো।
শেষপর্যন্ত আব্বু আপুর পড়ালেখা বন্ধ করে তাকে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দেন।
আপু শ্বশুরবাড়ি যাওয়াতে যৌতুকের জন্য চাপ আসে আমাদের পরিবারে। আমরা কেউ ভাবতে পারি নি তিনি যৌতুক দাবি করবেন। আপু আমাদের বাঁশঝাড় জমিসহ বিক্রি করে মোট ৩০ হাজার টাকা নিয়ে আপুর শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিলো। বিনিময়ে অপমান স্বরুপ ফিরে আসতে হয়েছিলো আব্বুসহ তার সাথে যাওয়া লোকদের।
তখন সাল ছিলো ২০০৬..... সে হিসেবে ৩০হাজার টাকাই ঠিক ছিলো। আব্বু তখন আপুর সুখের জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো, দুলাভাইদের জমি ভাগ হবার পর বাড়ি বানিয়ে দিবেন।
দুলাভাই আপুকে ভালোবাসলেও কটু চোখে দেখতো আমার মাওয়াই মা। নানানভাবে কষ্ট দিতো প্রকাশ্য, অপ্রকাশ্যভাবে। তার কিছুদিন আগে আমার তাওয়াই মারা গিয়েছিলেন।
আস্তে আস্তে বৃদ্ধা পর্যায়ে আমার মাওয়াই মা। তাইতো এখন আমার আপু ছাড়া তার চলেই না।
সারাদিনে আপুকে দেখতে না পেলে চিল্লানি দিতে থাকেন। আপুকে আব্বু আদেশ করেছেন যাতে কোনক্রমেই তার অযত্ন না হয়। সবসময় খেয়াল রাখতে হবে।
গুরুজনদের সেবা করলে মনে শান্তি আসে। গুরুজনরা দোয়াও করেন।
একসময় আপুর কোল আলো করে ফুটফুটে একটা কন্যা সন্তান এলো। আপুর প্রথম বাচ্চা আমাদের বাড়িতেই হলো।
আমার এখনো খুব ভালো করেই মনে আছে, খুব কষ্ট হয়েছিলো আপু। আপুর কষ্ট দেখে সারা গ্রামের মানুষ কেঁদেছিলো।
ছোট্ট একটি মেয়ে, তার কোলে আবার তারই সন্তান।
মেয়ের নাম রাখলাম আমি নিজেই। মামা হতে পেরে আনন্দে বাগবাগ হয়ে গিয়েছিলাম।
মামা হলাম ঠিকই, কিন্তু আগের থেকে কাজ বাড়লো আমার। আপু শ্বশুরবাড়ি থাকাকালীন প্রতিদিনই একবেলা করে যেতে হতো।
একদিন পর একদিন বাচ্চাকে নিয়ে আসতে হতো। আবার কোন কিছুর দরকার হলে আবার যেতে হতো।
পায়ে প্রচণ্ড ব্যাথা হলেও কাউকে বলতে পারি নি। সকালে নিয়ে আসতাম আবার সন্ধ্যায় রেখে আসতাম।
এটাই ছিলো আমার রুটিন। ঝড়-বৃষ্টি হলে আমাকে ভাতের ভাড় সাজিয়ে ভিজে ভিজে যেতে হতো।
কোন মাফ নেই, না বললে মাইর জুটতো কপালে। আমার এত যাওয়া-আসা করতে দেখে রাস্তার পাশাপাশি মানুষেরা চিল্লানি দিতো নানান কথা বলে। আমি সেদিকে কর্ণপাত করতাম না। কারণ আমি জানতাম সেদিকে কর্ণপাত করে কোন লাভ নেই। বড়জোর আমার জন্য দুঃখ প্রকাশ করবে, আর কিছু না!
দুলাভাই অন্যদিক দিয়ে একটু অন্যরকম হলেও আমাকে সবসময় পোশাক কিনে দিতেন। হয়তো ছোটবেলায় আব্বুর চেয়ে দুলাভাই আমাকে বেশি পোশাক কিনে দিতো। শার্ট, প্যান্ট, গেঞ্জি, চামড়ার জুতো ইত্যাদি।
পঞ্চম শ্রেণীতে উঠলাম। খুব মজা করেছিলাম সেই ক্লাসটা। প্রথম ঘটকের অভিনয় করে চার-পাঁচটা গ্রামের মধ্যে নাম কুড়িয়েছিলাম। সেকেন্ড হয়েছিলাম অভিনয়ে।
.
(১৩)
২০০৮ সালের রমযান মাস অতিক্রম হবার পর একদিন মামা আমাদের বাড়িতে এলেন। ফর্ম পূরণ করলাম। মামা কিছু পড়া দেখাই দিয়ে গেলেন। ভর্তি পরীক্ষার আগের দিন মামা আমাদের বাড়িতে এলেন। আমি যেই মাদরাসায় ফর্ম তুলেছি সেই মাদরাসায় মামা লেখাপড়া করতো।
রাতে আমাকে ধরে বসলেন। অনেক পড়ালেন। বেশিরভাগগুলোই আরবী। আমি স্কুলের ছাত্র, আরবী দ্রুত হতে চায় না। আরবী দ্রুত না হলে মামা পিটন শুরু করলেন
। বিভিন্ন উক্তি দিতে থাকলেন উনি। যেমন,
আমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না, আমি ভর্তি পরীক্ষায় পাশ করতে পারবো না ইত্যাদি।
পরদিন আমার সাথে বড় ভাই গেলেন, মামা তো সাথেই আছে। পরীক্ষার হলে ঢুকতেই বুকটা ধুকধুক করে উঠলো। প্রথম বেঞ্চে সিট ছিলো বিধায় ভয়টা আরো বেশিই ছিলো কারণ সব স্যার হুজুররা আমার খাতা উল্টিয়ে দেখতো। মামা ওই মাদরাসার বড় ছাত্র হওয়ায় সবার কাছে এক্সট্রা কেয়ার পেয়েছি।
প্রশ্ন পেয়ে দেখলাম, সব মোটামুটি কমন। গবগব করে সবার আগেই লিখে ফেললাম। ইংলিশে বাংলা থেকে ইংলিশ করতে বলেছিলো ৩টা বাক্য। দু'টো পেরেছিলাম। ৩ নং'টা ছিলো এমন, আকাশ নীল।
আমার কাছে নীল এর ইংলিশটা মনে ছিলো না। তাই বাধ্য হয়ে লিখেছিলাম, The sky is nill.....
পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে একথা শোনার পর মামা হেসেছিলেন। ভাইবা দেয়ার জন্য ডাকলেন, আমি গেলাম।
আমাকে নানান প্রশ্ন করলেন। কয়েকজন হুজুরের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়াছিলেন মামা। হয়তো সেজন্য আরো বেশি প্রশ্ন করেছিলেন।
যা প্রশ্ন করেছিলেন সব ঠিকঠাক উত্তর দিয়াছিলাম। তবে মামা বলেছিলেন , 'যদি উত্তর দিতে না পারো তবে বলবা আমাকে অন্য প্রশ্ন করুন এটা পারবো না আমি।'
আমিও একটা প্রশ্নে এমন উত্তর দিয়ে মাদরাসায় নাম করেছিলাম। সবাই বলত, ভাগিনার কত সাহস!
ভাইয়ার সাথে বাড়িতে চলে আসলাম। বাড়িতে এসেই রান্না করা সুন্দর সুন্দর খানা খেলাম।
সন্ধ্যায় রেজাল্ট জানার জন্য মামাকে ফোন দিলাম। মামা তখনি রেজাল্ট পেল, মাত্রই বলতে পারেন। আনন্দে গদগদ হয়ে বললেন, 'বাবা তুমি আমার মান রেখেছো। ফার্ষ্ট হইছো তুমি।'
আম্মাকে বললাম আমি ফার্ষ্ট হইছি। বাড়ির সবাই খুব খুশি। আমার সবথেকে আনন্দ হচ্ছে আমি মাদরাসায় ভর্তি হচ্ছি। আমি তখনো বেশ ছোট, হাফ প্যান্ট পরে ঘুরে বেড়াই।
আমার মাদরাসায় ভর্তির ডেট চলে আসলো। মামা আমার অনুপস্থিতিতেই ভর্তি করালেন।
ক্লাস রুটিন দিয়ে গেলেন। আব্বু আমার জন্য তোষক, লেপ,বালিশ সব বানিয়ে আনলেন। মামা বাজার থেকে একটা ছোট ট্রাংক কিনে রেখেছিলেন। আব্বু সেদিন বাসায় ছোটখাটো অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। গ্রামের মান্যগণ্য কিছু মানুষকে ভোজ করিয়েছিলেন। আমি এমন সময় আম্মাকে বলেছিলাম, 'আম্মু আমি গেলে আপনার কষ্ট হবে না?'
উনি মুখ লুকিয়ে উত্তর দিয়েছিলেন, 'না।'
আমি স্পষ্ট তার চোখের কোণে জল অনুভব করেছিলাম।
.
(১৪)
রিকশা ডাকা হয়েছে। কাপড় চোপর সব ব্যাগে ভরা হয়েছে। খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ।
বাড়িতে অনেক লোক। হঠাৎ কেউ আসলে বুঝবে এটা বিয়ের বাড়ি। আমি একে একে সব বড় আব্বু ও বড় আম্মুদের বাড়িতে বিদায় নিলাম। তখনো চোখে জল টলমল করে নি। রিকশায় উঠার সময় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো যেন কেউ মারা গেছে।
সেদিনের কথা আজো মনে পরে খুব। সেদিন সকলেন চোখেই পানি ছিলো। সেই সময়টায় এমন মনে হয়েছিলো যেন সবাই আমাকে পর করে দিচ্ছে।
পিছনে আম্মু হাউমাউ করে কাঁদছে। আপুও নিরবে জল ফেলছে। হয়তো ভাবছে আজ থেকে তার বাড়ি যাওয়ার লোকটা হারিয়ে গেল। সন্ধ্যা হলে কেউ দরজায় গিয়ে কড়া নাড়িয়ে বলবে না , ' আপু, তোর জন্য এই তরকারিটুকু আম্মু পাঠালো।'
দাদিমাও থেমে থাকতে পারে নি। আমার দুধমা তিনিও কাঁদছেন।
বাড়িটা শূন্যতায় পূর্ণ করে রিকশায় উঠলাম। চোখে তখনো পানি বৃষ্টির ফোটার মত ঝরঝর করে ঝরছে। রাস্তার পাশে ফাঁকা জমিতে আমার সব বন্ধুরা খেলছে। আমি তাদের দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলছি আর মনে মনে বলছি, 'তোরা সবাই ভালো থাকিস। আমি চললাম আমার গন্তব্যে।'
খেলা ছেড়ে সবাই তখন আমার যাওয়া দেখছে। যতদূর চোখ যায় আমি তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তাদের মধ্যে একজন ছিলো সবচেয়ে কাছের।
সবসময় আমার পাশে পাশে থাকতো।
একটা সিঙ্গারা খেলেও তাকে না দিয়ে খেতাম না। ওর চোখে সেদিন হৃদয় ভাঙা ঢেউ দেখেছি। যদিও আমরা তখনো ছোট মানুষ ছিলাম কিন্তু ভালোবাসার এতটুকুও কমতি ছিলো না।
আমি বেডপত্র নিয়ে রিকশায়, মামা পিছনে সাইকেলে। হয়তো বাকি বছরগুলো মামার আয়ত্ত্বে থাকতে হবে। মামার রাগ ছিলো অত্যন্ত।
তবুও ভাবতাম, ভাগনার প্রতি হয়তো দরদ দেখাবে। প্রাথমিক পর্যায়ের এ ধারণাটুকু ভুল প্রমানীত হয়েছিলো।
রিকশায় বসে চোখেরর জল অনবরত ঝরছিলো। আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে, মাদরাসায় পৌঁছা পর্যন্ত আমি কেঁদেছি। কিন্তু সবসময় আমি মাদরাসা পড়ার আগ্রহ দেখাতাম। তবুও কেন জানি সেদিন হৃদয়টা খাঁ খাঁ করে উঠেছিলো।
মনে হয়েছিলো কিছু একটা হারিয়ে ফেলেছি আমি। নতুন পায়জামা, নতুন পাঞ্জাবি, নতুন টুপি পরে তখন সত্যি সত্যি আমাকে ছোট হুজুর মনে হচ্ছিলো। যদিও কোনরকম কোর'আন পড়া ছাড়া আরবির অন্য জ্ঞানে ছিলাম শূন্য। ((চলবে))
জীবনী: অশ্রু ভেজা ডায়েরী
((পর্ব:৬))
((সত্য ঘটনা অবলম্বনে।))
.
.
(১৬)
মাদরাসায় যখন পৌঁছলাম তখন মাগরিবের সময়। মাগরিবের সলাত আদায় করে বিছানা গোছাতে শুরু করলেন মামা। একটু পরপর বিভিন্ন ছেলেরা আমাকে দেখতে আসতে লাগলো। তখন মনে হলো আমি চিড়িয়াখানার কোনে নব্য আগমনকৃত প্রাণী। মামাকে যেহেতু সব ছাত্ররা ভাই বলে ডাকতো সেই সুবাদে সবাই আমার মামা। বিছানা গোছানো হলে বিছানার উপর বসে থাকলাম। চারদিকে নতুন মানুষ, আমার খারাপ লাগা শুরু হলো।
পরদিন ফোনে বাড়ির লোকদের সাথে কথা বললাম। আব্বু , আম্মু, দুধমা, বড় আম্মু, দাদিমা সবার সাথে।
সবাই বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়াছিলো। দাদি এমনই হয়ে গেছিলেন যে আব্বুকে ডেকে বলেছিলেন, ' কি রে বাপ, এত ছোট একটা বাচ্চাকে মাদরাসাত ভর্তি করে তুই আছিস কেমন করে? আমি নিজেই তো সহ্য করবার পাইছি না।'
আব্বু দাদিমার সাথে বেশি কথা বলেনি। মাদরাসায় মামা তার ক্লাস ফ্রেন্ডের আরেক ভাগিনার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ওর নাম ফাহমিদুল, ডাক নাম ছিলো অয়ন। আমরা সবাই অয়ন বলেই ডাকতাম। অয়নও খুব মেধাবী ছিলো। ভর্তি পরীক্ষায় আমি প্রথম অয়ন দ্বিতীয় হয়েছিলো।
অয়নই আমার প্রথম বন্ধু।
তারপর আমার পরীক্ষার সিটমেট আতিকের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম। আতিক আমার দ্বিতীয় বন্ধু। এভাবে আস্তে আস্তে পরিসংখ্যানটা বাড়তে থাকে। তবে সবচেয়ে কাছের ছিলো অয়ন। একদিন অয়নকে বলেছিলাম, 'শোন, আমরা বন্ধু নই, আজ থেকে আমরা দু'জন ভাই।'
আমরা দুই মামার দুই ভাগিনা। যেখানে যেতাম দুই'জন একসাথে যেতাম, খেতাম এক সাথে, পড়তামও এক সাথে। অয়নের বাড়ি থেকে প্রায়ই তরকারি আসতো। অয়ন আমাকে না দিয়ে খেত না।
আমার সব টাকা-পয়সা মামার কাছে থাকতো। যখন যা প্রয়োজন হতো, মামাকে বললেই তা এনে দিতো। টাকা-পয়সার চিন্তা আমার মধ্যে ছিলো না। আমার শুধু একটাই টার্গেট ছিলো ভালো করে পড়াশোনা।
দু'দিন মামার রুমে থাকার পর আমাকে আমার সহপাঠীদদের সাথে রাখার ব্যবস্থা করলেন হুজুর। তখন আমার সৌভাগ্য হলো দু'জন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রের পাশে। ওহ! বলাই হয়নি , স্কুলে পঞ্চম শ্রেনীর সমাপনীর ফাইনাল পরীক্ষা না দিয়ে মাদরাসায় ভর্তি হয়েছিলাম।
মামা পড়ালেখার সুবিধার্থে চতুর্থ শ্রেনীতে ভর্তি করালেন। আমার ডানপাশে থাকতো ইউসুফ মামা, বামপাশে থাকতো নাজির মামা। ইউসুফ মামা খুব পড়ালেখা করলেও নাজির মামার কাছে বারবার হেরে যেত। কারণ ইউসুফ মামার হাতের লেখা ভালো ছিলো না।
ইউসুফ মামার বাড়ি সিরাজগঞ্জে। সবথেকে আনন্দের খবর হলো কয়েকদিন আগে শুনলাম ইউসুফ মামা মদীনা ইউনিভার্সিটিতে স্কলারশিপ পেয়েছে। অপরদিকে চশমা পরিহিত নাজির মামা গুন বলে শেষ করার যাবে না। তার বাড়ি বগুড়ার ঝুমারবাড়ীতে।
তার হাতের লেখা দেখে দেখে শিখতাম আমি। নাজির মামা হাফেজ ছিলেন, কণ্ঠ ছিলো অতুলনীয়, আর্টের কাজে পারদর্শী, কোন কাপড়ে অসাধারণ নকশা ইত্যাদি। পাশাপাশি দু'জন মামার কাছেই অনেক ভালোবাসা পেয়েছি। হয়তো আমার মামা সেখানকার বড় ছাত্র হওয়ায় কাজটা সহজ হয়ে গেছিলো।
ইউসুফ মামা দু'বছর পর চলে গেলেও নাজির মামার সাথে সম্পর্কটা আজ অব্দি চলমান। নাহ! আমার সাথে শুধু নয়, আমার পরিবারের সাথেও। সময় পেলে আসেন, থাকেন, চলে যান।
.
(১৭)
মামা থাকতেন দু'তলায়, আমি থাকতাম তিন তলায়। আমি পড়ছি নাকি দুষ্টুমি করছি সবটা মামা পর্যবেক্ষণ করতেন। চুপ করে আড়াল থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতেন।
যদি পড়ি তাহলে বেঁচে যাই, আর দুষ্টুমি করলে আর আস্ত রাখতেন না। লাথি, থাপ্পড় অনবরত চলতো আমার উপর।
প্রতিদিন মাগরিবের পর তার কাছে গিয়ে পড়তে হবে এটাই নিয়ম ছিলো। প্রতিদিন যেতাম, কিন্তু আমার মনে পড়ে না কোনদিন মারে নাই তিনি। প্রতিদিনই চোখে পানি নিয়ে বেডে ফিরে আসতাম। অত্যাচার বেড়ে গেলে চারতলারর কোণায় গিয়ে কাঁদতাম। চারতলা ফাঁকা থাকতো সবসময়, খুব কম ছাত্রই যেত।
ওখানে বেশ কয়েকটা ইট ছিলো। ইটের উপর বসে শব্দহীন কান্না করে মনটাকে হালকা করতাম।
সবসময় ভয়ে থাকতাম কখন কি দোষ করি, কারণ একটাই, ভুল করলে মামা আর আস্ত রাখবে না।
আমার এখনো মনে পড়ে একদিন একজন ছাত্রকে কটু নামে ডাকার জন্য মামার কাছে বিচার দিয়েছিলো সে। খুব অনুরোধ করে ক্ষমা চেয়েছিলাম যাতে মামাকে বিচার না দেয়। আসলে সত্যিকথা বলতে মুখ ফসকে বের হয়ে গিয়েছিলো। তবুও সে মামাকে বলে দিয়েছিলো। সন্ধ্যার পর ডাক পড়লো মামার কাছে, ভয়ে ভয়ে তার কাছে গেলাম। ব্যস্ত থাকায় রাতের খাবারের পর ডাকলেন।
সেদিন রাতে বোর্ডিং এ আলু ভর্তা দিয়েছিলো, আমার ভালো করেই মনে আছে।
ভাত পেট দিয়ে নামছিলো না, কারণ আমি জানি আমার আজ খুব পিটন হবে।
তবুও কিছু খেয়ে পানি খেলাম। মামার বেডে গিয়ে বসলাম। মামা স্বাভাবিকভাবে কিছু প্রশ্ন করতে লাগলেন। তখন মনে মনে ভাবতে লাগলাম হয়তো বেঁচে যাব এ যাত্রায়।
কিন্তু আমার ধারণাকে ভুল প্রমানীত করে একটা সরু বেত বের করলেন।
এতজোরে একটা ঘা বসালেন যে, মিনিট দু'য়েক আমার কোন হুস ছিলো না। হাতটা ভীষণ ঝমঝম করে উঠেছিলো। সত্যি কথা বলতে আমি আমার আব্বুর অনেক পিটন খেয়েছি তবুও এমন একটি ঘা কখনো খাই নি। অনেক কষ্টে নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
নাজির মামা আমার অবস্থা দেখে বুঝতে পারলেন গুরুতর কিছু হয়েছে।
আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কিছু বললাম না। কাঁদতেই থাকলাম। কেন জানি নিজেকে খুব একা মনে হতো তখন। যদিও সব বন্ধুদের সাথে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিলাম। নাজির মামা হঠাৎ করেই আমার বা হাতে মারের দাগটা দেখে আঁতকে উঠেছিলেন।
কাছে টেনে মলম লাগিয়ে দিচ্ছিলেন। শান্ত স্বভাবের লোকটির কাছে নিজের মামার থেকেও বেশি ভালোবাসা পেয়েছিলাম। উনি আমাকে অনেক বুঝতো, জানি না কেন? তবে আমি তার কাছে সবকিছু শেয়ার না করলেও কিভাবে যেন জেনে যেতেন।
ছোট মানুষ তখনো আমি। অনেকসময় পড়তে পড়তে তার উরুর উপর মাথা রেখে ঘুমাতাম। উনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন সযত্নে।
.
(১৮)
প্রতি সপ্তাহে মামা আমাকে বাড়ি নিয়ে আসতেন। মাদরাসা থেকে বাড়ির দুরত্ব সাইকেলে ৪৫ মিনিট। আমি পিছনে বসতাম, মামা চালাতেন।
তখনো সাইকেল চালাতে পারতাম না, নিচে চালাতে পারতাম। আমাকে প্রায় সপ্তাহে বাড়ি নিয়ে আসার জন্য মামার পক্ষ থেকে পেতাম সুন্দর সুন্দর গালি। মাঝে মাঝে মনে হতো আমাকে মেরেই ফেলবেন।
আমি শুধু চুপ করে শব্দহীনে পানি ঝরাতাম। বৃহস্পতিবার বাড়িতে আসতাম, শুক্রবার বিকালে চলে যেতাম। নাজির মামার ফোন থাকার সুবাধে আব্বু উনার ফোনে ফোন করতেন। মামা বেশিরভাগ সময় কোথায় থাকতেন সেটা জানতাম না।
নাজির মামার সাথে হুট করেই একদিন আম্মু কথা বলে অল্প কিছু। ব্যস, আম্মু মামার মাধ্যমে তাকে বাসায় আসতে বলে। তবে নাজির মামার সাথে আমার মামার সম্পর্ক ভালো ছিলো। মাঝে মধ্যেই নাজির মামা নিয়ে আসতো বাড়িতে।
নাজির মামাকে সময় পেলে আমাদের বাড়িতে আসার
আমন্ত্রন দেয় আব্বু।
এমন একজন ছেলেকে যে কেউ রিফিউজ করতে পারবে না। নাজির মামাও সবসময় নিজের মনে করতো। খুব গাঢ় সম্পর্ক এখনো আমাদের। মাঝে মাঝে মনকে বলি, কেন তুমি আমার রক্তের মামা হলে না? আবার পরক্ষণে ভাবি, যে সম্পর্ক আছে তাই বা রক্তের চেয়ে কম কিসে!
একবার খুব অসুস্থ হয়ে বাড়িতে আসলাম। মাথায় পানি দেবার প্রয়োজন হয়েছিলো। বড় মামি সেদিন আমাদের বাড়িতেই ছিলো, উনিই পানি দিয়ে দিচ্ছিলেন।
হঠাৎ করেই আমার বা হাতের উপরে কালো একটা দাগ দেখে জিজ্ঞেস করলেন, 'বাবা তোমার হাতে এটা কিসের দাগ?'
আমি সত্যিকথাটা বলে দিয়েছিলাম। মামি আমাকে খুব ভালোবাসতেন। ইভেন, আমি খাওয়ার পর তার আঁচল দিয়ে এখনো মুখ মুছি। এমন মামি পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।
মামি আম্মাকে দেখালেন, আম্মা আব্বুকে দেখালেন। কিছুদিন পর মামা আমাদের বাড়িতে আসলেন, আব্বু তাকে শুধু একটা কথাই বলেছিলেন, 'নয়ন শোন, আমার শুধু এই একটাই। আর কেউ নাই। অনেক কষ্টে তাকে পেয়েছি। সেটাও তোর অজানা নয়।'
মামা কথাটার অর্থ বুঝেছিলো। বুঝলেও কোন ফায়দা ছিলো না আমার জন্য। তিনি যেমন তেমনি রয়ে গেলেন।
একজন অপরিচিত লোককে আমাদের নাম্বার দেয়ার কারণে তিনি আমাকে ছাদে নিয়ে বেশ কয়েকটা লাথি দিয়েছিলেন।
একদিন বাবুর্চিকে ডিম ভেজে দেয়ার জন্য ডিম দিয়েছিলাম। উনি সেদিন ভেজে দেন নি। মন খারাপ কেন করলাম, সেজন্য লাথি মেরে সিঁড়ি থেকে ফেলে দিয়েছিলেন। আমার বাটি হাত থেকে পড়ে গিয়ে ভেঙে গিয়েছিলো। তখনো বুঝতে পারি নি, আরো কঠিন বিপদ আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
যখন মাদরাসার সব ছাত্ররা কঠিন ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে যেত, তখন আমি বিছানায় শুয়ে কাঁদতাম কিংবা ক্লাসরুমে গিয়ে রাতের আকাশ দেখতাম আর চোখের জল ফেলতাম।
কেউ জানতো না আমার এসব কথা। এতদিন গেঁথে রেখেছি।
((চলবে))
āĻোāύ āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āύেāĻ:
āĻāĻāĻি āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āĻĒোāϏ্āĻ āĻāϰুāύ