রম্যগল্প: বন্ধু বিভ্রাট
পর্ব:১
.
.
মাধ্যমিক পাশ করে যখন কলেজে ভর্তি হলাম তখন নিজেকে খুব বড় বড় মনে হচ্ছিলো। স্কুল থেকে কলেজে উঠার মজাই আলাদা। যেদিন এসএসসি পরীক্ষার পজেটিভ রেজাল্ট হাতে পেয়েছি সেদিনই ঝিংকু নাকুর ড্যান্স দিয়ে সারা গ্রামের মানুষকে গোল্লা খাওয়াইছি।
শেষপর্যন্ত নিজেরটুকু পেটে জুটেনি। আমার ভাগের গোল্লাটা যেই মুখে তুলবো তখনি এক ভিক্ষুকের আগমন,
'আম্মা, আল্লাহর ওয়াস্তে দুইটা ভিক্ষা দেন।'
নাহ! আমার আর গোল্লাটা খাওয়া হলো না। ভিক্ষুককে দিয়ে ১০টাকা হাতে ধরিয়ে দিলাম। খুশি হয়েই চলে গেল।
আজকে বুক উঁচিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে আমি স্কু্ল জীবনের গন্ডি পেরিয়েছি। একসময় লিখন স্যার কানটা মলে দিয়ে বলতেন, 'তুই কিছুই করতে পারবি না। না পারবি কামাই করতে, না পারবি বউ পুষতে।'
স্যার আমাদের সাথে ফ্রি ছিলেন বলে কোন কথা মনের ভিতর জিলাপির প্যাচের মতন গিঁট দিয়ে রাখতেন না।
তবে কলেজে লিখন স্যার তো নাই, তাই বেশ সুবিধেই হলো। এই লিখন স্যারের জন্য স্কুল জীবনে খুব বেশি লাফালাফি করতে পারি নাই।
সবসময় স্যার মাইরের উপর রাখতেন সবাইকে। উনি আদর করে বেতের নাম রেখেছিলেন জশমত খাঁ। জশমত খাঁয়ের ভয়ে কোনদিন স্কু্ল যাওয়া বাদ দিতাম না।
স্যারের বিভিন্ন রকমের শাস্তির ব্যবস্থা ছিলো, সেসব না হয় নাই বললাম।
যাইহোক স্কুল জীবনের মজাটা কলেজ জীবনেই সুদে-আসলে তুলে নেয়া যাবে।
রেজাল্টের দিন সবকিছু ভুলে লিখন স্যার সকল শিক্ষার্থীর মতন মুখ ব্যাকা করে সেলফি তুলে ফেসবুক আইডিতে আপলোড করে ক্যাপশন দিয়েছিলেন, 'বন্ধুরা কেমন লাগছে আমাদের?'
সেলফিতে বিভিন্নজনের বিভিন্ন মতামত দেখে না হেসে পারি নাই। আমাদের বন্ধুদের প্রত্যেকেরেই ফেইক আইডি ছিলো। লিখন স্যার যাচাই-বাচাই না করে সবাইকে এড করতো।
ফেইক আইডির কমেন্টগুলোর কথা নাই বা বললাম।
রংপুর সরকারি কলেজে ভর্তি হয়ে সরাসরি ম্যাচে উঠলাম। ঠিক ম্যাচ নয়, ফ্লাট। বাড়ি থেকে চলে যাবার সময় আবেগে আপ্লুত হয়ে কেঁদেছিলাম।
লিখন স্যারের সাথে দেখা করতে গিয়ে স্যার আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, 'আমি জানি তুই আমাকে কখনো ভুলবি না। তোর কান মলে দেয়া খুব মিস করবো রে।'
তখন মনে মনে ভেবেছিলাম, ভুলবো না তো কখনই কারণ যে মাইরগুলো পিঠে পড়েছে তারপরও কি কেউ তা ভুলতে পারে? আর সেই কান মলে কান লাল করে দেয়ার কথা! নাহ! এসব তো ভুললে চলবে না বাপু। অপেক্ষায় আছি স্যারের কবে আমার মতন একখান পোলা হবে। তার উপর অন্তত কিছুটা হলেও প্রতিশোধ তো নেয়া যাবে।
.
রুমে বসে পা দু'খানা মেলে দিয়ে নাট-বল্টু দেখছিলাম। দরজায় কড়া নড়লো। ভাবলাম ফ্লাটের মালিক এসেছে মনে হয়। দেখলাম ঠিকই, মালিকেই এসেছে। কিন্তু তার সাথে আরেকটা ছেলে। ছেলেটার চোখে চশমা, হাতে পোটলা-পুটলি।
মালিক বললেন, 'বাজান, নিরব তোমার রুমেই থাকবে।'
আমি মুচকি হাসি দিয়ে নিরবকে বরণ করে ঘরে নিয়ে গেলাম।
নিরব এতই চুপচাপ যে একই ঘরে থেকেও কথা বলতো না। মাঝে মাঝে ভাবতাম পাছায় গিয়ে কয়েকটা লাত্থি দেই।
নিরবও আমার মতন প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছে। আমাদের ফ্লাটের পাশের মাদরাসায়। সেক্ষেত্রে তার যাতায়ত খুবই সহজ।
ভ্যাবলাকান্তের মতন সারাদিন মোবাইলে গেমস খেলে সময় পার করে দেয়। আমি ফানি ভিডিও দেখে সময় কাটাই। ফানি ভিডিও সবসময়ই প্রিয় আমার। তবে এক্ষেত্রে আমার খারাপ অভ্যাস যে, হাসতে হাসতে বিছানায় গড়াগড়ি খাই।
একদিন এমনই হাসতে দেখে নিরব নিজের থেকে জিজ্ঞেস করলো, 'কি ভাই, সারাদিন কি দেখেন যে এত হাসতে হয়?'
আমি ভিডিও বন্ধ করে বললাম, 'হাসলে শরীর স্বাস্থ্য ভালো থাকে। মন সতেজ থাকে। সেজন্য ফানি ভিডিও দেখি।'
প্রথম দিন থেকে সপ্তাহখানেক নিরবকে যেমন হয়েছিলো পরে আস্তে আস্তে সেটা পরিবর্তন হতে থাকলো।
এক রুমে থাকি অথচ ভালোভাবে কথা না হওয়ার গন্ডি থেকে দু'জনে বেরিয়ে আসলাম।
সময় পেলেই ফানি ভিডিও দেখে ইচ্ছে করেই গড়াগড়ি খাই।
মাদরাসার ছাত্ররা নাকি একটু শয়তান টাইপের হয়, প্রথমে না বুঝলেও পরে আস্তে আস্তে তা নিরবের মধ্যে লক্ষ করেছি।
প্রথম বাইরে থাকার অভিজ্ঞতা বলে খাট নেই নি। ফ্লোরের উপরে তোষক, বালিশ নিয়েই থাকি। প্রথমে বর্ষে প্যারা না নিয়ে হাসি ঠাট্টাতেই মত্ত।
নিরবের সবথেকে ভালো অভ্যাস খাওয়া। খাওয়ার জিনিষ দেখলে না খেয়ে থাকতে পারে না। তাছাড়া ওর ট্রাংকে সবসময় খাবার জিনিষ থাকতোই।
আমার থেকে স্বচ্ছল পরিবারের ছেলে ও। তার উপর বাপের একটা ছেলেই। সেজন্য আদর খুব বেশিই পেয়েছে।
আমাদের সম্পর্কটা আস্তে আস্তে আপনি থেকে তুই তে চলে আসলো। ভাই থেকে দোস্ততে চলে আসলো।
অবশ্য এক্ষেত্রে আমারই অবদান খুব বেশি। একসাথে থাকি অথচ আপনি, ভাই শব্দগুলো ব্যবহার ভালো লাগতো না। কারণ দু'জনই আমরা বয়সেও সেম, একই ইয়ারে পড়িও।
একদিন খুব রেগে বলেছিলাম, 'নিরুব্বা শোন, এবার থেকে আপনি বলবি না, ভাইও বলবি না। দোস্ত বলবি,আর তুই শব্দ ব্যবহার করবি।'
প্রথমে একটু সংকোচ করলেও পরে ঠিক হয়ে গেছে। এটাই স্বাভাবিক, প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই হতে পারে। অপরিচিত, অজানা জায়গায় প্রথম প্রথম মানিয়ে নিতে কষ্ট হয়। কিচ্ছু ঠিক নেই বললেও পরে সবই ঠিক হয়ে যায়।
.
মাঝে খুব ইচ্ছে করে নিরবের সাথে লাফালাফি করি, কিন্তু হয়ে ওঠে না। সেদিন বিছানায় বসে বই পড়ছিলাম তখনি নিরবের আগমন। কোন কিছু না বলে আমার গায়ের উপর দে লাফ। আমি 'মাগ্গো' বলে চেঁচিয়ে উঠে রাগে ফোঁপাতে লাগলাম।
আমার রাগী মুড দেখে জিহ্বা কামড়ে কানে ধরে বললো,
- সরি দোস্ত।
- সরির কিচ্ছু নাই। আগে বল, বিড়ালের মতন ঝাঁপ মারলি ক্যান?
- ভুল হইছে দোস্ত।
- ভুল টুল বুঝি না, সত্যি কথা ক। সত্যি না বললে দ্যাখ তোর অবস্থা কী করি।
- প্লিজ দোস্ত কিছু করিস না। রাতে তোকে হোটেলে কাচ্ছি খাওয়ামু নে।
কাচ্ছি বিরিয়ানির কথা শুনে কিছুটা ঠান্ডা হলাম। যতদূর মনে হয় যে কিপ্টা! তাতে অন্তত আজকে ভাঙানো যাবে।
আমি গলা খাকড় দিয়ে বললাম,
- শুধু কাচ্ছি খাওয়ালে চলবে না। সাথে চটপটিও চাই।
- আচ্ছা খাওয়ামু। তবুও এতো আনন্দিত হবার কারণ জানতে চাস না দোস্ত।
আমি আর কিছু না বলে পড়াতে মনোযোগ দিলাম। নিরবের মোটা শরীর যেভাবে গায়ে এসে পড়লো তাতে আরেকটুর জন্য চ্যাপ্টা হয়ে যাইনি। এমনিতেই আমি নাটের মতন চিকনা।
সেদিন রাতে অবশ্য ট্রিট দিয়েছিলো। একসাথে হোটেলে এই প্রথম খাওয়া।
অন্যদিক দিয়ে কৃপণ হলেও খাওয়ার ব্যাপারে ঝাক্কাস একটা মাল। মনে মনে ভাবলাম সবদিক দিয়ে এর সাথে মিল দিয়ে থাকতে হবে, তাতে ওর পাশাপাশি আমার পেটেও কিছু চালান হবে।
মাদরাসা থেকে আসার পর থেকে ফুরফুরে মেজাজেই নিরব। কি থেকে কি করছে কিছুই বুঝতে পারছি না।
হোটেলে ট্রিট দেয়ার পর পারফিউম, গন্ধ সাবার, স্নো, ফেসওয়াশ ইত্যাদি কিনলো।
মনে মনে ভাবলাম, হঠাৎ কি এমন হলো যে আমাকে ট্রিট দিলো, আবার এত কসমেটিক্স কিনছে!
ভেবে কুল না পেয়ে চারদিকে চোখ কান খোলা রেখে পড়াতেই মনোযোগ দিলাম।
রাতে ঘুমিয়েছি, প্রতি রাতের মাঝরাতে হিশু করার জন্য উঠতে হয় আমাকে। আমার অভ্যাসের পরিবর্তন হলো না। রীতিমতো ঘুম থেকে জেগে উঠে মোবাইলের টর্চ বের করে যেই বাথরুমের দিকে যাবো দেখি নিরব বিছানায় নেই।
আমি চোখ ভালো করে মুছে দেখি সত্যি সত্যি সে বিছানায় নেই।
হিশুর কাজ সমাপ্ত করে খুব আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে বেলকনির দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম।
ইমা! নিরব দোলনায় দোল খাচ্ছে আর হেসে হেসে কার সাথে যেন কথা বলছে।
মনে মনে ভাবলাম, হ্লার নিরুব্বা! তোর নাম যদি নিরব না হয়ে আমার নামটা হতো তাহলেই খুব ভালো হতো। বজ্জাত বলে সারাটাদিন জ্বালাতাম।
.
পরেরদিন ছুটির দিন......
নিরব সকাল সকাল গোছল করে ভালো একটা পোশাক গায়ে জড়িয়ে স্নো, পাউডার, পারফিউম মাখতে শুরু করলো। আটা-ময়দা মাখছে আর 'লা লা লা' শব্দ উচ্চারণ করে গুনগুন করে গান গাইছে। আমি ঢের বুঝতে পারছি কিছু একটা হতে চলেছে।
আমি চোখ দু'টো বড় বড় করে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
- কি রে এভাবে ক্যারে দেখতেছিস?
- এখানে আর কেডা কেডা আছে?
আমার কথা শুনে একটু ভাব নিলো। মনে হলো যেন এ নতুন এক নিরবে দেখছি। আমি মাথায় একটা বারি দিয়ে বললাম,
- শোন, ভাব কম নে। তাড়াতাড়ি বল কই যাচ্ছিস?
- কাজ আছে, পরে বলমু নে
- হ্লা নিরুব্বা, অহনি ক।
আমার কথার উত্তর না দিয়ে মুখ দিয়ে বাঁশি বাজিয়ে ফুড়ুৎ করে বাবুই পাখির মতন উঁড়ে গেল। আমি হ্যাবলার মতন দাঁড়িয়ে রইলাম।
মনে মনে ভাবলাম হ্লা নিরুব্বা খালি আয়, তোর খবর আমি রাতেই করমু নে। আমি জানতাম মাদরাসার ছেলেগুলো অনেক ভালো টাইপের হয়, কিন্তু নিরবকে দেখে তার উল্টো মনে হয়।
বই পড়া আমার শখ। দুপুরের পর বই পড়ছিলাম। দেখলাম নিরব ফ্লাটে ফিরে এসেছে। এসেই সানগ্লাসটা টেবিলের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে কাপড় পালটাতে শুরু করলো।
আমি চুপচাপ মুখটা চাপা কণ্ঠে বললাম,
- রান্নাঘরে খাবার আছে, খেয়ে নিস।
- তরকারি কি রাঁধছে?
আজকো নিরুবের বাজার করার দায়িত্ব ছিলো। সে তো আজ মহা ব্যস্ত। তাই আলু ভর্তা পেটে চালান করে দিয়েছি। সেজন্য আরো বেশি রেগে আছি। রাগী মুডে বললাম,
- আজ বাজারের দায়িত্ব ছিলো কার?
আমার কথা শুনে জিহ্বা কামড় দিয়ে বললো,
- সরি দোস্ত, একদম মনে ছিলো না।
- হ্লার নিরুব্বা, আজ ছুটির দিন তোর জন্য মাছ,মাংস খাইতে পারি নাই। হ্লা তোর বাচ্চা হইবো না থুক্কু তোর বউয়ের বাচ্চা হইবো না।
- দোস্ত এমন দোয়া করিস না, আমি তো দু'টো কিউট কিউট বাচ্চার স্বপ্ন দেখি।
- তুই স্বপ্ন দেখতে থাক।
- দোস্ত তুই রাগ করিস না, আমি অহনি বাজার করে আনতাছি।
ব্যাচারা সাধারণ পোশাক পড়েই বাজারের দিকে হাঁটা দিলো। আমি শিউর এই দুপুরবেলায় ভালো কিছু পাবে না।
ঠিক তাই হলো, বাজার থেকে ফিরে আসলো কাচা তরকারি নিয়া। মাছ, মাংস কিছুই পায়নি।
রাগে পাছায় একটা জোরে লাত্থি দিলাম। নিরব মাগো বলে চুপচাপ সহ্য করে নিলো, যেহেতু দোষটা তারই।
(চলবে)
.
লেখা: সাজ্জাদ আলম বিন সাইফুল ইসলাম
রম্যগল্প: বন্ধু বিভ্রাট
পর্ব:২
.
.
নিরব সাইজে একটু মোটা। সেজন্য হয়তো লাত্থি খেয়েও পরে যায় নি। আমি রাগী মুডে আছি, নিরব ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছে আমার দিকে।
- শোন, এই ড্যাবড্যাব চোখে একদম তাকাবি না বলে দিচ্ছি। শুধু ভাত আর আলু ভর্তা কখনো পেটে চালান করা যায়? এটা কি সকাল পাইছিস? রাতে যে ভালো খাবো সেটাও বন্ধ।
- দোস্ত, রাগ করিস না। আমি ডিম কিনে আনবো। এমন ভুল আর হবে না। তুই ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিস তাই না রে?
আমি মুখটা কালো করে অন্যদিকে ঘুরিয়ে চুপ করে ভাবতে লাগলাম, 'হ্লা নিরুব্বা, তোরে আইজ আমি মজা দেখামু।'
মজা দেখানোর জন্য অপেক্ষা করছি। সেজন্য আর কিছু বললাম না।
এরই মধ্যে টুপ করে বাজার থেকে পেটে কিছু চালান করে দিয়ে আসলাম। নিরবকে সাথে নিলে ডাবল টাকা খরচ হতো সেজন্য ওকেও কিছু বললাম না।
আসার সময় গুড়ের জিলাপি আর সিঙারা ব্যাগের মধ্যে ভালো করে প্যাকেট করে আনলাম।
প্যাকেট টেবিলের উপর রেখে নিরবের দিকে তাকালাম। কারো সাথে মনে হয় চ্যাটিং করছে। আমি বললাম,
- চ্যাটিং রাখ, আবারো লাত্থি খাইতে না চাইলে তাড়াতাড়ি ডিম নিয়ে আয়। না হলে রাতে তোর কপালে ভাত জুটবে না।
- যাচ্ছি দোস্ত, আর পাঁচ মিনিট।
কিছুক্ষণ পর ফোন চার্জে দিয়ে বললো,
- দোস্ত, ফোন আসলে ধরিস না। চার্জ নাই তাই চার্জে দিলাম।
- ওই হ্লা, তোর ফোনকল রিসিভ করার জন্য কি আমি উন্মুখ হয়ে বসে আছি?
- সরি দোস্ত, আমি এভাবে বলি নি। বুঝিস তো, কে না কে ফোন করে!
কথাটা বলেই বাজারে গেল। আমি জোরে জোরে 'ফাইট্টা যায় বুকটা ফাইট্টা' গানটা জোরে জোরে গাইতে লাগলাম।
তাড়াতাড়ি সিঙারা আর জিলাপিতে বিশেষ কিছু মিশিয়ে টেবিলের উপর রেখে দিলাম, যাতে খুব সহজেই দেখা যায়।
আমি নিরবের মোবাইলটা হাতে নিয়ে ব্যালান্স চেক করে রীতিমতো ড্যান্স দেয়া শুরু করলাম।
বেলকনিতে বসে অনেক পুরোনো বন্ধুর সাথেও কথা বললাম। ফাও মাল! দরিয়া মে ঢাল।
অনেকক্ষণ কথা বলার পর আপনা আপনিই ফোন কেটে গেল। ব্যালান্স চেক করার পর বুঝলাম শূণ্য!
মোবাইলটা ঠিকঠাক মতো চার্জে লাগিয়ে বেলকনিতে ভালো সেজে বই পড়তে থাকলাম। যেন কিছুই করি নি আমি। আহা! কি ভালো পোলা গো আমি।
দুপুরে ভালো কিছু না খাবার অপরাধে দণ্ডিত করেছি নিরবকে। নিজে তো মনে হয় গার্লফ্রেন্ডের সাথে মজা করে বড় কোন হোটেলে পেট তাজা করেছে।
বারবার একটা দৃশ্যই চোখে ভাসছে, 'আমি শুকনো ভাত আর আলু ভর্তা খাচ্ছি। অপরদিকে মটু নিরুব্বা গার্লফ্রেন্ডকে আদর করে খাইয়ে দিচ্ছে।'
.
আড়চোখে দেখলাম নিরব রুমে এসেছে। বেলকনি থেকে চিৎকার দিলাম,
- রান্নাঘরে রেখে আয়।
- দোস্ত খালা এখনো আসে নি?
- জানি না, আমি পড়তেছি।
বেলকনির জানালা দিয়ে দেখছি নিরব আমার সিঙারা, গুড়ের জিলাপী ঠিকই সাবাড় করছে। আমি মনে মনে হাসছি আর ভাবছি, 'খাও চান্দু, খুব ভালো করে খাও। তোমার মজা তো শুরু হবে আর কিছুক্ষণ!'
আমি খুব আগ্রহ নিয়ে নিরবের দৌঁড়ানি দেখার জন্য অপেক্ষা করছি। কিছুক্ষণ কাটলো, নাহ! কাজ তো হচ্ছে না।
মনের মধ্যে খটকা লাগলো। এতক্ষণে তো এ্যাকশন শুরু হবার কথা। ভাবতে ভাবতে নিজেকে বোকা মনে হতে লাগলো। নিজেকে ধিক্কার দিয়ে বললাম, 'বজ্জাত গো, ফাও ফাও টাকা নষ্ট করলি। কাজ তো হচ্ছে না।'
ভাবতেই চোখ-মুখ আনন্দে ভেসে উঠলো। প্রথমবার বাথরুমে দৌঁড় দিছে।
হাত মুট করে একবার ইয়েস বলে জানালা দিয়ে দেখতেই থাকলাম। আহারে বেচারা!
বারবার বাথরুমে দৌঁড়ানি দিচ্ছে। বেশ কয়েকবার দৌঁড়ানি দিয়ে বেশ ক্লান্ত। বিছানায় সটান করে শুয়ে আমাকে ডাকতে শুরু করলো,
- দোস্ত, ও দোস্ত।
- কি রে কী হলো আবার? তুই তো দেখছি মরার মতন পরে আছিস? ঘটনা কী?
- দোস্ত আমি মনে হয় আর বাঁচুম না রে।
- হ দোস্ত, বেঁচে আর কি করবি ক? মরতে তো হইবোই দু'দিন আইজ আর কাইল। তারচেয়ে তোর বাপের টাকাগুলান বাঁচাই দে।
- দোস্ত, তুই মজা করতেছিস?
- কি হয়েছে বলবি তো?
আমাকে বলতে যাবে ওমনি আবারো বাথরুমে দৌঁড়। আমি হাহা করে হাসছি। বাথরুমের দরজা খুলতে না খুলতে আবারো দরজা বন্ধ করে দিলো।
আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে খিটখিট করে হাসছি। প্লানটা খুব ভালো কাজে দিয়েছে।
'হ্লা নিরুব্বা হোটেলে চিকেন খাও, ফুচকা খাও। আমি খাই সাদা ভাত আর আলু ভর্তা! বুঝ এবার কেমন লাগে।'
নিরব এবার বাথরুমের দরজা খু্লে বের হতে ধরেছে,
- তোর হইছে কি সেটা বলতো? বারবার বাথরুমে ছুটছিস ক্যান?
- দোস্ত, আমার বালিশ আর কম্বল বাথরুমেই দে। আমি আইজ বাথরুমেই ঘুমামু।
- কি সব আজেবাজে বকিস? সত্যি বলতো কি হয়েছে?
- আর বলিস না, তোর সিঙারা আর জিলাপী খেয়েছিলাম। তারপর থেকেই বাথরুমে ছুটছি আর ছুটছি।
- বারে বা! তুই আমার সিঙারা আর গুড়ের জিলাপী খেয়েছিস! হ্লা চুরির শাস্তি দেখছিস, আল্লাহ সয় না বুঝলি!
- চুরি কেন বলছিস দোস্ত। আমি মনে করেছি এসব আমার জন্যিই রেখেছিস।
- যা ভুল করেছিস তো করেছিস। না বলাতে আর খাইস না।
এক হাত জিহ্বা বের করে নিশ্বাস ছাড়ছে বেচারা। খুব জব্দ হয়েছে। আমি মুচকি মুচকি হাসছি আর নিরবকে দেখছি।
.
বাথরুমে ছোটাছুটির পর অনেকটা ক্লান্ত মনে হচ্ছে নিরবকে। আজ আর আমার সাথে শয়তানী বা ফাজলামো করছে না। কি শান্ত ছেলে রে বাবা!
রাতের খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ লাইট অফ করে শুয়ে পড়লাম। নিরব ফোন নিয়ে গেমস খেলছে। আমি ঢের বুঝতে পারছি বেচারা গার্লফ্রেন্ডকে ফোন দেবার জন্য অপেক্ষা করছে।
আমি মজা দেখবার জন্য চোখ বন্ধ করে আছি। কিছুক্ষণ পর ফোন দিলো, আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম ফোনের অপর প্রান্তে এক মহিলা কণ্ঠ, 'কল করার জন্য আপনার পর্যাপ্ত ব্যালান্স নেই। দয়া করে রিচার্জ করুন।'
নারী কণ্ঠ শুনে আমি মুচকি মুচকি হাসছি। বেচারা নিরব 'ওহ শীট' বলে বিছানার উপর হাত দিয়ে আঘাত করলো। তৎক্ষনাৎ আমাকে ডাকতে থাকলো,
- দোস্ত, ওই লিমু।
আমি মনে মনে ভাবলাম, 'এই রে ধরা মনে হয় খাই। নাহ! কথা বলেই তো সব নাম্বার ডিলেট করে দিয়েছি। তাহলে এভাবে ভ্যা ভ্যা করে চিল্লানি দিচ্ছে কেন?'
আবার ডাকতে থাকলো। আমি রাগ হয়ে বললাম,
- ওই হ্লা এভাবে চিৎকার দিচ্ছিস ক্যান? ঘুমাতেও দিবি না নাকি?
- দোস্ত বিপদে পরেছি।
- কি বিপদ।
- তোর বিকাশে টাকা আছে? থাকলে দে দোস্ত।
- না টাকা নাই। যা তো ঘুমাতে দে।
- প্লিজ দোস্ত, আমাকে জরুরী ফোন দিতে হবে। না হলে........! প্লিজ দোস্ত, বাইরের দোকানও হয়তো খোলা নেই।
মনে মনে ভাবলাম, ছেলেটা আজ ভীষণ জব্দ হয়েছে। থাক, গার্লফ্রেন্ডের সাথে কথা তবুও বলুক।
- নাহ, তোর জ্বালায় আর বাঁচি না বাপু।
- দে দোস্ত।
- তোর নাম্বার বল।
নাম্বার তুলতে না তুলতেই ফোন। মনে হয় গার্লফ্রেন্ডের ফোন আসছে। আমার কাছ থেকে বেলকনির দিকে দৌঁড়ালো। জোরে জোরে বলছে,
- প্লিজ জান, বিশ্বাস করো আমি ফোন দিতে গিয়ে দেখি টাকা উধাও। অথচ ২৯টাকা লোড দিয়েছি।
- ..........................!
- বিশ্বাস করো সোনা। রাগ করো না প্লিজ।
- ............................!
- আচ্ছা স্বীকার করছি ভুলটা আমারই হইছে। তবুও ক্ষমা করে দাও প্লিজ।
- ...........................!
- আর এরকম হবে না বিশ্বাস করো। যে সময় দিবে সেসময়ই ফোন দিব। এই দেখ কানে ধরছি।
- ...........................!
- আচ্ছা আচ্ছা, কয়বার করতে হবে বলো?
- ..........................!
বিছানা থেকে উঠে দেখলাম বেলকনিতে এক হাতে মোবাইল আর এক হাতে কান ধরে উঠা-বসা করছে। গুনছে, ৪৪,৪৫,৪৬,৪৭,৪৮,৪৯,৫০.....
মনে মনে ভাবলাম আজ একশতবার পূর্ণ করবে। হায়রে প্রেম!
(চলবে)
.
লেখা: সাজ্জাদ আলম বিন সাইফুল ইসলাম
āĻোāύ āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āύেāĻ:
āĻāĻāĻি āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āĻĒোāϏ্āĻ āĻāϰুāύ