রুপকথার গল্প: বুদ্ধিমতী লীলাবতী
পর্ব:৯
লেখা: সাজ্জাদ আলম বিন সাইফুল ইসলাম
.
.
সব পরিকল্পনার শেষ করে রাজকন্যা মায়াবতী ও রাজপুত্র বিজয়রাজকে সব বুঝিয়ে দিয়ে গাছের আড়ালে লুকিয়ে রইলো লীলাবতী। পাখি রাজপুত্র মীর খান গাছের ডালে লুকিয়ে লুকিয়ে ডাইনি রিকা আসা অবধি অপেক্ষা করতে লাগলো।
সবাই বেশ চিন্তায় মগ্ন। বাকি সময়টুকু কিভাবে পার হবে!
সবাই চিন্তায় থাকলেও লীলাবতী বেশ আছে। তার বিশ্বাস এ বারেও মানুষেরই জয় হবে। মায়াবতী ও বিজয়রাজ বেশ ঘামছে।
সবাই ডাইনিটা আসা অবধি অপেক্ষা করতে লাগলো। মায়াবতীর হঠাৎ রাজ মনিষীর একটা দোয়ার কথা মনে পড়ে গেল। যা পড়লে মানুষের ৯৯টি বিপদ কেটে যায়। যার মধ্যে সর্বশেষ বিপদ চিন্তা থেকে মুক্তি লাভ করা যায়।
মায়াবতী পড়তে লাগলো, 'লা হাওলা ওলা ক্বুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।'
কিছুক্ষণ পর ডাইনি রিকা চলে আসলো। তার মুখে হাসির ছাপ। মায়াবতী ও বিজয়রাজের খাতার সামনে এসে বললো, 'শয়তানের রাজা আসবে তোদের ভক্ষণ করতে। আমার আয়োজনও শেষপ্রান্তে। তোরা তোদের আল্লাহকে ডাকতে থাক।'
মায়াবতী রেগে ফুসফুস করতে লাগলো। মনে মনে ভাবতে লাগলো, 'তোদের সৃষ্টি করলো যেই আল্লাহ, তাকে আজ তোরা চিনতে পারছিস না! আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর, তাহলে বুঝবি।'
ডাইনিটা হাসতে হাসতে আগুনের কুণ্ডলীর সামনে গিয়ে ভরভর করে মন্ত্র পড়তে লাগলো। আগুন জ্বেলে নানান রকম উপকরণ সেখানে ছিটাতে লাগলো। খাঁচার ভিতর থেকে রাজকন্যা ও রাজপুত্র ডাইনিটার দিকে তাকিয়ে রইলো। পাখি রাজপুত্রও ডাইনির কার্যকলাপ লক্ষ্য করছে।
কিছুক্ষণ মন্ত্র পড়ার পর পিছনের ঘরটাতে গেল ডাইনি রিকা।
ঘরের ভিতরে গিয়েই সে আশ্চর্য হয়ে গেল। ভাবতে লাগলো, সে তো শয়তানের রাজার রাজ্যে যাবার আগে কফিনটা কি মাটির ভিতরে রেখে গিয়েছিলো? নাকি উপরে রেখে গিয়েছিলো।
ডাইনি ভাবতে লাগলো, সে তো যথাসম্ভব উপরেই রেখে গিয়েছিলো। তাহলে ভিতরে রাখলে কে? না তার মনের ভুল?
এসব ভাবতে লাগলো। কিছুক্ষণ ভেবে কফিনটা মাটির উপরে তুলে আগুনের কুণ্ডলীর কাছে নিয়ে আবারো মন্ত্র পড়তে লাগলো।
মন্ত্র পড়ার সময় কি যেন হচ্ছিলো ডাইনিটার। মন্ত্র পড়ার সময় ভুল হয়ে যাচ্ছিলো। কাজগুলো এলোমেলো হচ্ছিলো। এবার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে গেল ডাইনির। রাগে গজগজ করতে লাগলো। কোনমতে মন্ত্র পড়া শেষ হলে কফিনটার দিকে এগিয়ে গেল। কফিনের দিকে এগিয়ে যাবার সময় খাঁচার দিকে মুখ ঘুরিয়ে মুচকি হাসলো।
ডাইনির বিদঘুটে মুচকি হাসি দেখে রাজপুত্র বিজয়রাজ ও রাজকন্যা মায়াবতী দু'জনই হাসলো।
যতই কফিনের দিকে যাচ্ছে ততই মনের ভিতরটা কাঁপছে পাখি রাজপুত্রের। কারণ ভিতরে কি আছে সেই শুধু জানে আর জানে লীলাবতী। বাধ্যতা হিসেবে উপরে একজন বসে সবকিছুই দেখছেন।
ডাইনিটা হাসি মুখে কফিন খুলে খুব জোরে একটা চিৎকার দিলো। শান্ত হাসি মুখটা এক নিমিষেই কালো অশান্ত হয়ে গেল। রাগে জোরে গজগজ করতে লাগলো। ডাইনির এই রাগান্বিত চেহারা দেখে কিছুই বুঝতে পারলো না মায়াবতী ও বিজয়রাজ।
পাখি রাজপুত্র মীর খান ডাইনির এ অবস্থা দেখে প্রথমে ভয় পেলেও এখন মুচকি মুচকি হাসছে। গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে খুশি লীলাবতী।
লীলাবতী মনে মনে ভাবলো, 'কেবল তো শুরু ডাইনি রিকা। এরপর আরো কত কি হবে, তা এখনো বুঝতে পারছো না।'
ডাইনি রিকার চোখ মুখ রাগে লাল বর্ণ ধারণ করেছে।
চিৎকার দিয়ে বলতে লাগলো, 'কে করেছে এ কাজ? আমার চোখের সামনে এসো। আমার বোনকে কে টুকরো টুকরো করে রেখেছে? যার জন্য আমার এত সংগ্রাম তাকে এভাবে বিকৃত করেছে কে? কার এত বড় সাহস?'
লীলাবতীর ইশারায় পাখি রাজপুত্র এক ডাল থেকে অন্য ডালে উঁড়ে গেল। যাতে ডাইনিটা বুঝতে পারে সত্যিই কেউ আছে।
মনে মনে খুশি লীলাবতী, কারণ কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। পাখি রাজপুত্র কথা বলতে লাগলো, 'ঠিক হয়েছে, ঠিক হয়েছে শয়তান ডাইনি।'
ডাইনি রিকা চিৎকার দিয়ে বললো, 'তাহলে এসব তোর কারসাজি দুষ্টু পাখি?'
পাখি রাজপুত্র সাহস করে বললো, 'তাহলে বুঝতে পেরেছ শয়তান ডাইনি, তোর বোন আমার রাজ্য ধ্বংশ করে আমার পিতা-মাতাকে মেরে ফেলেছে। আমাকে করে রেখেছে পাখি।'
রাগান্বিত হয়ে ডাইনিটা বললো, 'দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা।'
একথা বলে পাখি রাজপুত্রকে ধাওয়া করতে লাগলো ডাইনিটা। পাখি রাজপুত্র পতপত করে সারা বন ঘুরতে লাগলো। পাখি রাজপুত্রকে ধরার জন্যও সারা বন ঘুরতে লাগলো ডাইনিটাও।
লীলাবতী আড়াল থেকে বের হয়ে খাঁচার কাছে গেল। খাঁচার সামনে যাওয়ার আগে বলি দেয়ার প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র নষ্ট করে দিলো সে। নষ্ট করার সময় সশব্দে বলতে লাগলো, 'শখ কত! মানুষদের সাথে টক্কর দেয়া। দাঁড়া ডাইনি তোর শ্রাদ্ধ শেষ করে তবেই ঘরে ফিরবো।'
লীলাবতীকে দেখে বিজয়রাজ বললো, 'লীলাবতী, কি এমন করেছ যার ফলে এত রেগে আছে ডাইনিটা।'
লীলাবতীর উত্তর, 'তোমার মতন কি আমার বুদ্ধি আছে নাকি? আমার সামান্য বুদ্ধিতেই কুপোকাত ডাইনি রিকা।'
মায়াবতী লীলাবতীর উত্তর শুনে কিছুই বুঝতে পারলো না। তাই তো সে প্রশ্ন করে বসলো, 'লীলাবতী, সোজাসুজি উত্তর দাও দয়া করে।'
'আরে ওর বোনটাকে কেটে টুকরো টুকবো করে ফেলেছি। যাতে আর জোরা লাগাতে না পারে।'
লীলাবতীর কথা শুনে রাজপুত্র বিজয়রাজ ও রাজকন্যা মায়াবতী দু'জনেই হাসতে লাগলো।
ডাইনি আসছে দেখে ঘরের ভিতরেই লুকিয়ে পড়লো সে। বলি দেয়ার স্থানে এসে সব এলোমেলো ও সব নষ্ট দেখে মাথা চড়ে গেল। আবারো হংকার দিয়ে উঠলো, 'কে এসব নষ্ট করে দিলো? আমি নিশ্চিত এখানে আরো কেউ আছে। কে আছিস, বের হ। সাহস থাকলে আমার সাথে লড়।'
পাখি রাজপুত্র আবারো ডালে বসে বলতে লাগলো, 'ডাইনিটা ক্ষেপেছে, ক্ষেপেছে তো হেরেছে, হেরে গিয়ে কাঁদছে।'
পাখি রাজপুত্রের ছড়া কাটতে দেখে আগের থেকে আরো বেশি গজগজ করতে থাকে। ডাইনিটার রাগান্বিত অবস্থায় সারা তাতাকুয়া জঙ্গল কাঁপতে লাগলো।
আশেপাশের গ্রামগুলোর মানু্ষেরা বলাবলি করছে, 'আজ হঠাৎ এত ক্ষেপলো কেন ডাইনিটা? আবার কোন কাণ্ড বাঁধাবে নাতো?'
গ্রামের মানুষেরা বলাবলির মধ্যেও ভয় শব্দটা উচ্চারিত হচ্ছে।
লীলাবতী ভাবলো এখন সামনে যাওয়া যাবে না। গেলে বিপদ হতে পারে। লীলাবতী সামনে আসছে না দেখে চিৎকার দিয়ে বললো, 'আসবি নাতো, দাঁড়া, আমি রাজপুত্র আর রাজকন্যাকে শেষ করে দেই।'
লীলাবতী আড়াল থেকে ভাবছে, 'আগে তো স্পর্শ কর, তারপর না হয় মারবি।'
ডাইনিটা খাঁচার দিকে গিয়ে খাঁচা থেকে মুক্তি দিয়ে যেই ধরতে যাবে তখনি ঘটলো আসল ঘটনা। কোন মায়া, যাদু খাটছে না।
মায়া, যাদু তার দিকে ফেরত এসে আস্তে আস্তে শক্তি কমে যেতে লাগলো। বুঝতে বাকি রইলো না কবচ দু'টো তারা কোনক্রমেই পরে নিয়েছে। যার ফলে কোনকিছুই খাটছে না।
পাখি রাজপুত্র মনের মধ্যে আনন্দ নিয়ে তার ছড়া কাটতেই থাকলো।
হাতের মধ্যে কবচ দু'টো বের করে ডাইনিটাকে দেখালো রাজকন্যা মায়াবতী ও রাজপুত্র বিজয়রাজ।
কবচ দু'টো দেখে চোখ ছানাবড়া ডাইনি রিকার। বারবার যাদু পাঠালেও কোনই কাজ হচ্ছে না।
শয়তানের রাজা সবকিছু দেখে অবস্থা খারাপ ভেবে আগেই কেটে পড়লো।
সময় এসেছে, তাই লালাবতী এবার হাসতে হাসতে বের হয়ে রাজপুত্র ও রাজকন্যার পাশে দাঁড়ালো। ডাইনিটাকে শেষ না করতেই বিজয়ের হাসি হাসলো চারজনই।
ক্ষিপ্তভাবে আবারো মায়া, যাদু ছাড়ার চেষ্টা করলো। এবারো সে ব্যর্থ হলো। আগের থেকে অনেকগুন ক্ষমতা কমে গেছে ডাইনির। ডাইনিটা বুঝতে পারলো তার দিনশেষ।
হাটু গেরে ডাইনি রিকা রাজকন্যা, রাজপুত্রদ্বয় ও লীলাবতীর কাছে ক্ষমা চাইতে লাগলো।
পাখি রাজপুত্র বললো, 'তোকে ক্ষমা করে যেতে দিলে আমি পাখি হয়েই রবো। তোকে শেষ করলে তাতাকুয়া জঙ্গলের মায়াময় এই অংশটুকু ধ্বংশ হয়ে যাবে, সাথে তোমরা দু'বোনও। আর আমি ফিরে পাবো আমার চেহারা।'
পাখি রাজপুত্রের কথা শুনে কাঁদতে লাগলো ডাইনি রিকা। এখন আর কোন কৌশলই খাটছে না।
এবার পাখি রাজপুত্র আওয়াজ করে বললো, 'সময় হয়ে এসেছে লীলাবতী। আমাদের এত বছর কষ্টে রাখার বদলা গ্রহণ করো।'
পাখি রাজপুত্রের কথা শুনে পুটলি থেকে পবিত্র পানি পড়া বের করে বিসমিল্লাহ্ বলে ডাইনিটার গায়ে ছিটাতে লাগলো।
লীলাবতী মায়ের কাছে শিখেছে, বিসমিল্লাহ বলে কোন কাজ শুরু করলে তাতে আল্লাহর রহমত থাকে, সেখানে বরকত থাকে।
পানি পড়া গায়ে পড়তেই বিকটভাবে চিৎকার করতে লাগলো ডাইনিটা।
এতদিন মানুষকে কষ্ট দেয়ার প্রতিফল সে হারে হারে টের পাচ্ছে। আস্তে আস্তে ছোট থেকে আরো ছোট হতে লাগলো ডাইনি রিকা।
লীলাবতী এবার কফিনটার দিকে এগিয়ে যায়, লাশটাকে কেন্দ্র করেও কিছু পানি ছিটাতে থাকে।
লাশটা আস্তে আস্তে অদৃশ্য হতে লাগলো। ডাইনি রিকাও ছোট হতে হতে মাটির নিচে মিশে গেল।
নাহ! আর কোন অস্তিত্ব রইলো না। পাখি রাজপুত্র ছোট পাখি থেকে বড় পাখিতে রুপান্তরিত হয়ে আগের রুপে ফিরে আসলো।
নিজেকে স্বরুপে ফিরে পেয়ে আনন্দে বিজয়রাজকে বন্ধু বলে জড়িয়ে ধরলো।
মায়াবতীও খুব খুশি, লীলাবতী ভাবছে 'কি সুন্দর মিলন!'
নিমিষেই জঙ্গলের মায়াময় অংশটা, ভেঙে গেল। এখন স্বাভাবিক জঙ্গলের মতই লাগছে পরিবেশটাকে।
(অন্তিম পর্বের জন্য অপেক্ষা)
রুপকথার গল্প: বুদ্ধিমতী লীলাবতী
লেখা: সাজ্জাদ আলম বিন সাইফুল ইসলাম
পর্ব: ১০ (শেষ পর্ব)
.
.
দারুন একটা মিলন শেষে পাখি রাজপুত্র লীলাবতীকে লক্ষ্য করে বললো, 'ধন্যবাদ লীলাবতী, তোমার সাহায্য আর বুদ্ধির জোরে আজ আমরা বেঁচে গেলাম।'
লীলাবতী হাস্যজ্বল মুখে বললো, 'কি যে বল রাজপুত্র মীর। আমি তো রাজকন্যা মায়াবতী ও রাজপুত্র বিজয়রাজকে ডাইনির কবল থেকে রক্ষা করার জন্যই বের হয়েছি। তাছাড়া আমি ও আমার বুদ্ধি এখানে ওসিলা মাত্র। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বাঁচিয়েছেন।'
লীলাবতীর কথা শুনে সবাই শান্ত মনে সমর্থন জানালো। সকলের মুখে তৃপ্তির হাসি। সকলের মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে তারা কত খুশি।
রাজপুত্র মীর বললো, 'আমাদের আরেকজন সাহায্য করেছেন। তার কাছে দোয়া ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য যাওয়া উচিত।'
মায়াবতী ও বিজয়রাজ এক সাথে বলে উঠলো, 'কে সে রাজপুত্র মীর?'
লীলাবতী বললো, 'দরবেশ বাবা। যিনি আমাকে এই বিশেষ পানি দিয়েছিলেন।'
বিজয়রাজ লীলাবতীর কথা শুনে সাথে সাথে বললো, 'তাহলে তো সেখানেই আগে যেতে হবে।'
মায়াবতীও তার ভাইজানের কথায় সমর্থন করে বললো, 'আমাদের এখানে আর থাকা উচিত হবে না। তাড়াতাড়ি যেতে হবে।'
লীলাবতী বললো, 'হুম দ্রুত চল। আমার মা খুব চিন্তায় আছে। মাকে মিথ্যা কথা বলে এখানে এসেছি। বাড়ি গেলে খুব বকুনি খেতে হবে।'
'কিন্তু আমরা কিভাবে যাব? অনেকটা পথ তো।' বিজয়রাজ প্রশ্ন করে উঠলো।
লীলাবতী বললো, 'চিন্তা নেই। দরবেশ বাবা আমাদের আসার সময় একটা পক্ষীরাজ ঘোড়া দিয়েছেন। পক্ষীরাজ ঘোড়ায় আমি প্রথমে দরবেশ বাবা তারপর রাজ্যে ফিরবো।'
কথাগুলো বলে গাছের আড়াল থেকে ছোট্ট ঘোড়াটার মাথায় স্পর্শ করার সাথে সাথে বড় ঘোড়ায় রুপান্তরিত হয়ে পাখা গজালো।
দুই রাজপুত্র, মায়াবতী ও লীলাবতী পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চেপে দরবেশ বাবার গুহার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো।
কিছুক্ষণের মধ্যে পক্ষীরাজ ঘোড়া হতে গুহায় চারজনই নেমে পড়লো। দরবেশ বাবা তখন আল্লাহের জিকিরে মশগুল ছিলেন।
কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে দরবেশ বাবা চোখ খুললেন। সকলেই তাকে সালাম দিলো।
দরবেশ বাবার মুখে শান্তির হাসি। তিনিও খুশি হয়েছে। সালামের জবাব দিয়ে বললেন, 'আমি জানতাম বাছারা, ডাইনি বা শয়তান মানুষের সাথে কখনোই জিততে পারবে না। যুগে যুগে তাই ঘটেছে, সামনেও তাই ঘটবে।'
রাজপুত্র মীর বললো, 'বাবা, আপনার উপকার কখনোই ভুলতে পারবো না।'
দরবেশ বাবা মুচকি হেসে বললেন, 'মানুষের উপকার করাই তো বড় ধর্ম বাবা। তবে সবসময় মনে রাখবা, শত্রু যেন কখনোই খারাপ কাজে তোমার উপর জয়ী হতে না পারে। সেক্ষেত্রে আল্লাহকে সবসময় স্বরন করবে। তার কাছে সর্বদা গুনাহ মাফ চাইবে। তার ইবাদাতে কিছু সময় হলেও কাটাবে।'
লীলাবতী বললো, 'শুকরিয়া দরবেশ বাবা। আপনাকে সারাজীবন মনে রাখবো।'
দরবেশ বাবা বললেন, 'হাহা, মানুষ মানুষকে ভুলে যায়। তোমরাও আমাকে ভুলে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। তোমাদের কৃতজ্ঞতাবোধ আমাকে মোহিত করেছে। তোমাদের জন্য আমার পক্ষ থেকে দোয়া থাকলো। আমার পক্ষীরাজ ঘোড়া তোমাদের রাজ্যে পৌঁছে দিয়ে চলে আসবে।'
রাজপুত্র মীর মন খারাপ করে বিজয়রাজকে বুকে চেপে বললো, 'বন্ধু তোমরা চলে যাও। তোমাদের রাজ্য আছে, আব্বিজান-আম্মিজান আছে। আমার তো কোন কিছুই নেই।'
কান্নাজনিত কণ্ঠে বিজয়রাজ বললো, 'তাহলে তুমি কোথায় যাবে বন্ধু?'
আনমোনা হয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকলো রাজপুত্র মীর। চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি ঝরছে। মুখ দিয়ে কোন কথাই বের হচ্ছে না। তবুও বুকের মধ্যে কষ্ট চেপে বললো, 'যাযাবর হয়েই বেঁচে থাকতে হবে।'
বিজয়রাজ বললো, 'আমি থাকতে তুমি যাযাবর হয়ে রবে কেন? আমার রাজ্য বিশাল, তুমি সেখানে চলো।'
মায়াবতী মুখের মধ্যে হাসি টেনে বললো, 'চলুন না রাজপুত্র মীর।'
লীলাবতীও সকলের সাথে একমত জ্ঞাপন করলো। দরবেশ বাবা বললেন, 'রাজপুত্র মীর, যাও। তোমাদের বন্ধুত্ব সারাজীবন টিকে থাকবে।'
দরবেশ বাবার সমর্থন পেয়ে আনন্দে আবারো বিজয়রাজকে বুকে টেনে নিলো। মায়াবতী ও লীলাবতী এ শান্তিময় মিলন দেখে অভিভূত।
'চলুন এখন যাওয়া যাক।' লীলাবতীর কথা শুনে চোখ থেকে অশ্রুকণা মুছে দরবেশ বাবাকে সালাম দিয়ে পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চেপে রাজবাড়ির দিকে রওয়ানা হলো।
.
রাজামশাই রাণী ঝুমরীর পাশে বসে আছেন। এমন সময় একজন দাসী ছুটে এসে বললো, 'রাজামশাই খালেকরাজের জন্য সুসংবাদ, রাজকন্যা মায়াবতী ফিরে এসেছেন।'
একথা শোনা মাত্র খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলেন রাজামশাই। রাণীকে সাথে নিয়ে বাগানবাড়িতে উপস্থিত হলেন। মায়াবতীর মুখে চমৎকার হাসি।
আব্বিজান ও এতদিন পর আম্মিজানকে দেখে দৌঁড়ে ছুটে বুকের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে মায়াবতী। আনন্দে বলে উঠেন, 'আব্বিজান, ডাইনি রিকাকে হত্যা করা হয়েছে। সেই সাথে তার মৃত বোন রাকাকেও। সব থেকে বড় আনন্দের কথা হচ্ছে আমার ভাইজানকেও নিয়ে এসেছি।'
ভাইজান বলে ডাক দিলো মায়াবতী। বিজয়রাজ এতদিন পর সেই রাজবাড়ি দেখে কি যেন খোঁজার চেষ্টা করছিলো। চারদিকে শূন্যতায় ভরপুর।
এতদিন পর নিজের ছেলেকে কাছে পেয়ে রাণী ঝুমরতী এগিয়ে গিয়ে কেঁদে তাকে বুকে টেনে নিলেন। কি অপরুপ মিলন!
রাজামশাইও বিজয়রাজকে কাছে টেনে আদর করে কপালে চুমু খেলেন। খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে লীলাবতী ও রাজপুত্র মীর খান।
বিজয়রাজ চোখের পানি মুছে পিছনে ঘুরে তাকালেন, 'বন্ধু মীর, লীলাবতী এদিকে আসো। আব্বিজান এই দুই বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য অসম্ভবও সম্ভব হয়েছে।'
লীলাবতী শব্দটা শুনে কিছুটা অবাক হলো রাজামশাই, 'লীলাবতী! তোমার নাম লীলাবতী?'
সামনে এগিয়ে এসে হাসি মুখে লীলাবতী বললো, 'জ্বী, ঠিক ধরেছেন। আপনার বোন রাজিয়ার মেয়ে লীলাবতী।'
রাজিয়ার মেয়ের কথা শুনে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন রাজামশাই। কিছুক্ষণ আবেগপ্রবণ হয়ে থাকার পর দৃষ্টি গেল আরেকটা ছেলের দিকে। রাজামশাই বললেন, 'ও কে বিজয়রাজ?'
বিজয়রাজ হেসে বললেন, 'আমার ১৫ বছরের বন্ধু। সবসময় আমার পাশে ছিলো। ডাইনি রাকা ওদের রাজ্য ধ্বংশ করে ওর পিতা-মাতাকে হত্যা করেছে। রাজপুত্র মীরকে করেছে পাখি।'
'পাখি!' রাজামশাইয়ের এমন আশ্চর্যবোধক হওয়া দেখে রাজপুত্র মীর সামনে এগিয়ে এসে বললো, 'মনে পড়ে রাজামশাই, একদিন একটি অদ্ভুত রকমের পাখি আপনার দরবারে সতর্কবার্তা পেশ করেছিলো?'
রাজামশাই ভালোভাবে মনে করে দেখলো ঠিক তাই। তাই জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ, পাখিটা সতর্কবাণী দিয়ে চলে গিয়েছিলো।'
রাজপুত্র মীর বললো, 'সেই পাখিটি ছিলাম আমি।'
রাজামশাই দেখলো সত্যি সত্যি লীলাবতী ও পাখি রাজপুত্র মীরের ওসিলা ও আল্লাহর রহমতের কারণে তিনি তার হারানো মানিক দু'টোকে খুঁজে পেয়েছেন। সবশেষে সবাইকে একবার বুকে টেনে আদর করে মন্ত্রী মশাইকে বললেন, 'আগামীকাল রাজ্যে খুশির দিন ঘোষণা করে দিন। আমি প্রজাদের সম্মুখে অতীব আনন্দের কথা ঘোষণা করবো।'
'জ্বী আচ্ছা রাজামশাই।'
'মন্ত্রীমশাই কাউকে আমার রাজ্যের উত্তরদিকে পাঠিয়ে দিন। সেখানে নদীর পাশের বটগাছের নিচে ছোট্ট একটা কুঁড়ে ঘর আছে। সেখানে একজন মহিলা থাকেন। তাকে আজকেই আনতে পাঠান।'
লীলাবতী বুঝতে পারলো তার মায়ের কথা বলা হচ্ছে। তারপরও লীলাবতী বললো, 'রাজামশাই আমি বাড়ি ফিরতে চাই। আমার ফেরার ব্যবস্থা করুন।'
লীলাবতীর কথায় দ্বিমত পোষণ করে বললেন, 'তোমার মাকে আনতে পাঠালাম। তোমাকে আমি আর ছাড়ছি না আমার মা বুদ্ধিমতী লীলাবতী। তোমার মায়ের উপর অত্যাচার করেছি, তা শোধরানোর সময় এসেছে।'
রাজামশাইয়ের কথা শুনে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলো লীলাবতী। কিছুক্ষণ পর মায়াবতী, বিজয়রাজ, মীর ও লীলাবতী পক্ষীরাজ ঘোড়াটার কাছে গিয়ে একটু আদর করে বললো, 'বন্ধু, তুমিও আমাদের সফরের সাথী ছিলে। তোমাকেও আমরা ভুলতে পারবো না। তুমি চলে যাও এবং ভালো থেক।'
পক্ষীরাজ ঘোড়াটাও বিদায়ের বেলা কাঁদছে। তবুও তাকে দরবেশ বাবার গুহায় ফিরে যেতে হবে। চোখে অশ্রু নিয়ে পক্ষীরাজ ঘোড়া উঁড়াল দিলো।
সবাই তাকিয়ে আছে ঘোড়াটার দিকে।
.
পরদিন,
রাজ্যে আজ সবাই খুশি। সবদিকে আনন্দ বিরাজ করছে। রাজামশাই সকল প্রজাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তার মুখেও আনন্দের ছাপ। রাণীমা অনেকদিন পর প্রজাদের সামনে এসেছেন। সকলের সাথে কথাও বলছেন।
গতরাতে রাজিয়া আসেনি। তিনি যখন শুনলেন লীলাবতীর বুদ্ধিমত্তা রাজপুত্র ও রাজকন্যাকে বাঁচাতে সাহায্য করেছে তখন তিনি সৃষ্টিকর্তার দরবারে শুকিয়া সলাত আদায় করেছেন। তবে একটু রেগে আছেন লীলাবতীর প্রতি।
মেয়েটা এত পাকনা! তাকে না বলেই রাজপুত্র ও রাজকন্যাকে বাঁচাতে চলে এসেছে।
রাজিয়া বেগম আজ সারা শরীরে চাদর জড়িয়ে প্রজাদের মাঝ দিয়ে রাজামশাইয়ের সামনে এসে দাঁড়িয়ে তাকে সালাম দিলেন।
লীলাবতীর দিকে একটু আড় চোখে তাকালেন। ৩৫বছর পর চিরচেনা সেই রাজবাড়িতে পা রাখলেন রাজিয়া।
এতদিন পর বোনকে রাজবাড়িতে পেয়ে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন। সকলের মুখে আনন্দের হাসি।
রাজামশাই এবার প্রজাদের উদ্দেশ্যে বলতে লাগলেন, 'আমার প্রিয় প্রজাগণ সালাম গ্রহণ করুন। আপনারা জানেন আজ আমাদের আনন্দের দিন। কারণটা বলার অবকাশ রাখে না। আমি আজ থেকে আগামী সাতদিন আনন্দের দিন ঘোষণা করছি। এই সাতদিন রাজবাড়িতে খাওয়া দাওয়ার অনুষ্ঠান বরাদ্দ থাকবে, যে কেউ আসতে পারবেন। সেই সাথে রাজপুত্র বিজয়রাজের রাজ অভিষেক ঘোষণা করছি। আগামী সপ্তম দিনে আমি নিজ হাতে তাকে মুকুট পরিয়ে সিংহাসনে বসিয়ে দিবো। সেই সাথে আগামী কাল রাজপুত্র বিজয়রাজের সাথে আমার বোন রাজিয়ার মেয়ে বুদ্ধিমতী লীলাবতীর শাদীর দিন ঘোষণা করছি।'
শেষের বাক্যাটা শুনে সবাই যতটা খুশি হয়ে ততটা অবাক হয়েছে লীলাবতী ও রাজিয়া। বিজয়রাজও মনে মনে লীলাবতীকে ভালোবেসেছে।
রাজামশাই রাজিয়াকে বললেন, 'রাজিয়া তোমার কোন আপত্তি নেই তো?'
অশ্রুসিক্ত নয়নে রাজিয়া না বলে উত্তর দিলো।
রাজামশাই এবার বলতে লাগলেন, 'আলহামদুলিল্লাহ, এবার দ্বিতীয় চমক, রাজকন্যা মায়াবতীর সাথে পাখি রাজপুত্র মীর খানের শাদীর কথা ঘোষণা করছি। এক আসরে দুইটি শাদী অনুষ্ঠিত হবে।'
রাজামশাই কথাটা বলে সশব্দে রাজপুত্র মীরকে বললেন, 'তোমার কোন আপত্তি নেই তো রাজপুত্র?'
রাজ্য হারিয়ে পাখিময় জীবন নিয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটিয়েছে সে। আজ রাজামশাই তাকে সবকিছু ফিরিয়ে দিলেন। মাথা নিচু করে না বোধক শব্দ উচ্চারণ করে রাজামশাইকে জড়িয়ে ধরলো রাজপুত্র মীর খান।
আজ সবাই খুশি।
কতদিন পর রাজ্যে আনন্দ ফিরে এলো! খুশি হয়েছে রাজা, রাণী, রাজিয়া। সংসারের দায়িত্ব থেকে মুক্তি নিয়ে আজ তারা ব্যস্ত আল্লাহর রাহে নিজেকে উৎসর্গ করে।
মায়াবতীও পাখি রাজপুত্রকে কাছে পেয়ে ভালোবাসার চাদরে ভরে গেছে। সেই সাথে বিজয়রাজ খুশি বুদ্ধিমতী লীলাবতীকে পত্নী হিসেবে কাছে পেয়ে।
চলতে থাকলো নতুন এক রুপকথার গল্পের। যেখানে সবাই সুখে শান্তিতে বসবাস করছে।
(শেষ)
āĻোāύ āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āύেāĻ:
āĻāĻāĻি āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āĻĒোāϏ্āĻ āĻāϰুāύ