#গল্পঃনিঃস্বার্থ_ভালোবাসা
#সাজ্জাদ_আলম_বিন_সাইফুল_ইসলাম
পর্ব:৩
.
.
আঁখিকে ডিভোর্স দেয়ার এক মাস হতে চললো। একটা দিনও মেসেজ বা ফোনও দেয় নি। আমি চাইও না সে আমার সাথে কোন যোগাযোগ রাখুক। সে যোগাযোগ করলে আমার কষ্ট বাড়বে বৈ কমবে না। সে তার মতন ভালো থাকুন। আমি না হয় ভালো থাকার অভিনয় করে যাবো, মন্দ কী!
.
শুনেছি আঁখির বাবা ওকে বাড়িতে ঢুকতে দেন নি। নয়ন সহ একটা ফ্লাটে ভাড়া থাকছে। কিছুদিন পর মাস ছয়েকের জন্য সিঙ্গাপুর যাবে, সেখান থেকে ফিরেই নাকি ওরা বিয়ে করবে। করুক না, মন্দ কী! এখন তো ও প্রাপ্ত বয়স্কা নারী। নিজের ডিসিশন নিজে নেয়ার ক্ষমতা ওর আছে।
.
এতদিন একলা থাকতে থাকতে ইদানীং আর ভালো লাগছে না। ইচ্ছে হচ্ছে কারো ভালোবাসার হৃদয়ে কিছুক্ষণের জন্য ঘুরে আসি। কিন্তু নারী জাতিকে এখন বড্ড অবিশ্বাস হয়। ছোট ছোট ভালো লাগা থেকে পাহাড়সম ভালোবাসার সৃষ্টি করে অবিশ্বাসের ঝড় দিয়ে আঁখি তো চলেই গেল। শুধু বুকের এক পাশটা চিনচিন ব্যাথা করে।
.
নিশি এখন ওর মায়ের জন্য কাঁদে না। বকুল আছে না? বকুলই তো ছোট থেকে আস্তে আস্তে বড় করে তুললো। মায়ের জন্য কাঁদে না! বিষয়টা আমাকে খুব ভাবায়। এতটুকুন একটা মেয়ে সেও কি তার মায়ের সম্পর্কে খারাপ ধারণা করা শিখে গেছে? নাকি কোন কালেই তার মায়ের জন্য তার ভালোবাসা ছিলো না।
.
সেদিন অফিস থেকে ফেরার পথে সরাসরি ফাইভ স্টার (কাল্পনীক নাম) হোস্টেলে গেলাম। আমাকে হোস্টেলের মালিক দেখেই আবেগে আপ্লুত হলেন। উনি আমাকে আগে থেকেই চিনেন, যার সুবাদে তার পাশে বসে এক কাপ চা খাওয়ার সুভাগ্য হলো। আমি তাকে একটি রাত এখানে থাকার অফার করলাম। তিনি অত্যন্ত খুশি হয়ে বললেন,
.
- ম্যানেজার বাবু হঠাৎ এখানে রাত কাটানোর শখ হলো যে?
আমি একটু বিব্রতভাব এনে বললাম,
- আপনার অসুবিধা হলে দরকার নাই।
তিনি দ্রুততার সাথে বললেন,
- কি যে বলেন বাবু, আজই একটা নতুন মেয়ে এসেছে। আপনি চাইলে ওখানে যেতে পারেন।
- ঠিক আছে, বুকিং করে দিন।
আমার পজিটিভ ইঙ্গিত পেয়ে হোটেল বয়কে ডেকে রুমটা দেখিয়ে দিয়ে দরজাটা খুলে দিলেন।
.
আমি কখনো এমন পরিস্থিতিতে আসি নি। কখনো আসার চিন্তাও করি নি। করবোই বা কেন! আমার সুখের সংসার ছিলো। কোনকিছুরই কমতি ছিলো না। আলোকিত আকাশে হঠাৎই মেঘের ঘনঘটা হয়ে অবশেষে ঝড় হওয়া বয়ে সবকিছু তছনছ করে দিলো। আমি আমার মেয়েকে নিয়ে হয়ে গেলাম নিঃস্ব।
.
রুমে ঢুকেই আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। একটা বিশ, একুশ বছরের মেয়ে নামায পড়ছে। আমি কিছুটা আশ্চর্য হয়ে বাথরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। নামায শেষ হবার অপেক্ষা করতে লাগলাম। পতিতালয়ের মেয়েরাও নামায পড়ে! বিষয়টা ফের আশ্চর্য মনে হলো। আবার মনে পড়লো রিসিভশনের কথা, 'আজকেই একটা নতুন মেয়েকে আনিয়েছি।'
.
মেয়েটা নামায শেষ করে মুনাজাত করে আল্লাহর কাছে কি যেন ফরিয়াদ করছে। আমি চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ থাকার পর সরাসরি আমার পায়ে পড়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। আমি দ্রুত বিছানায় বসে বললাম,
- আরে আরে করছো কি!
- স্যার আমাকে একটু দয়া করুন, স্যার আমাকে একটু দয়া করুন।
- কেন?
- আমি আর শহরে থাকুম না, বিশ্বাস করেন আমি গ্যারামে ফিরা যামু। আর কখনো কাজে শহরে আসমু না।
.
মেয়েটার কথা শুনে মনে হলো ভুলিয়ে ভালিয়ে গ্রাম থেকে এনে হয়তো তাকে এখানে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। মেয়েটা বিছানার নিচে বসে কেঁদেই যাচ্ছে। আমি একটু শান্তির জন্য এসে নিজেই মহা বিপদে পড়লাম। মেয়েটা বললো,
- স্যার আমারে এখান থাইকা বাইর করেন দয়া করে।
- এখানে তোমাকে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে, তুমি জানো না?
বিক্রির কথা শুনে কান্নার গতি আরো বেড়ে গেল।
.
মেয়েটার কথা শুনে মনে হচ্ছে খুব বোকা সে। গ্রামের সহজ-সরল মেয়ে। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
- বাড়িতে কে কে আছে?
- কেউ নাই। চাচাজান আমারে শহরে এক বাড়িতে রাইখ্যা গেল। বাড়ির মালিক আমারে এই খানে রেখে গেল সকালে।
- তুমি জানো না, এটা পতিতালয়। তোমাকে এখানে পতিতাবৃত্তি করেই থাকতে হবে।
- স্যার গো, আমারে বাঁচান আপনি। আমার সর্বনাশ কইরেন না। আমি আপনার জন্য দোয়া করমু।
.
মেয়েটা মনে করেছে এখান থেকে বের হওয়া খুব সহজ। কিন্তু আমি যতদূর জানি এখানে যে একবার ঢুকে তার বের হবার রাস্তা থাকে না। চারদিকে কত সিকিউরিটি! আমি বললাম,
- তোমার নাম কী?
- মায়া।
- বাহ বেশ নাম তো তোমার। কিন্তু তোমাকে যে আজ রাত আমার সাথেই কাটাতে হবে। এই রুমটা আমি বুকিং দিয়েছি। সাথে তোমাকেও।
- স্যার গো, আপনা পায়ে পড়ি আমার কোন সর্বনাশ কইরেন না। আমারে এইখান থাইকা বাইর করেন।
.
মায়ার কথা শুনে বেশ অবাক হলাম আমি। একজন স্বামী, সন্তান থাকা সত্ত্বেও অন্য পুরুষ এনে নিজের সতীত্বকে বিলিয়ে দেয়, আর মায়া, নিজের সতীত্ব থেকে বাঁচানোর জন্য পায়ে পড়ে কাঁদছে। আল্লাহর কি নির্মম বিচার! আমি নিজেকে সংযত করে বললাম,
- ঠিক আছে, তুমি উপরে ঘুমাও।
একটা বালিশ আর চাদর নিয়ে নিচে বিছানা করলাম ঘুমানোর জন্য। মায়া তার মায়াময় চেহারা দিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছে।
.
হোস্টেল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিই অনেক দাম দিয়ে কিনেছে। কারণ এত সুন্দর সহজ-সরল মেয়ে! সত্যিই অদ্বিতীয়। মায়া বাতি অফ করে বিছানায় জড়সড়ভাবে শুয়ে পড়লো। ছোট্ট একটা ডিম লাইট জ্বলছে। আমি না ঘুমিয়ে ভাবতে লাগলাম, হায়রে মানুষের জীবন! কেউ থাকতেই হারায়, আবার কারো না পাওয়ার ব্যাথাটা দ্বিগুণ।
.
রাতে বেশ কয়েকবার ঘুম ভেঙেছিলো। দেখি মেয়েটা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আমি কোন শব্দ না করে ওর কান্না দেখতে লাগলাম। নিজ গ্রাম আছে আজ সে পতিতালয়ে বন্দি। শেষ রাতে একবার দেখলাম তাহাজ্জুদ পড়ছে। আমি চোখ খুলে দেখতেই আছি। কি সুন্দর করে নামায পড়ছে মেয়েটা!
.
আমি শুক্রবার ছাড়া নিয়মিত নামায আদায় করিই না। আব্বা অনেক তাগাদা দিলেও আল্লাহর প্রতি ভয়টা ছিলো সবসময়ই কম। সেজন্যই হয়তো আমার সোনার সংসারটা টেকে নি।
.
মসজিদে মসজিদে আযান হচ্ছে। আবারো ঘুম ভেঙে গেল। মায়া বাথরুম থেকে বের হয়ে ফজরের নামায আদায় করতে লাগলো। মনে মনে ভাবলাম, মেয়েটা অনেক ভালো। দেখতে সুন্দরী, পরহেজগার। এমন মেয়েকে অন্য পশুর হাতে তুলে দিলে হয়তো আল্লাহ আমাকে কখনোই ক্ষমা করবেন না।
.
সকাল সকাল বাড়ি ফিরতে হবে। না জানি নিশি কেমন আছে। আমাকে না পেয়ে হয়তো রীতিমতো কান্না জুড়ে দিয়েছে। আমি কোর্টটা পড়ে নিলাম। মায়া আমাকে জিজ্ঞেস করলো,
- আপনি কোথায় যাচ্ছেন?
- আমার বাসা।
- দয়া করে আমাকে একলা রাইখ্যা যাইবেন না। আমাকে এইখান থাইকা বাইর করেন। আল্লাহর দোহাই লাগে।
মায়া আমার পা ধরে কাঁদতে লাগলো। আমি দ্রুত তা সরিয়ে বললাম,
- আরে ছাড়ো ছাড়ো, এ কি করছ!
- আমারে আপনার সাথে নেন সাহেব।
.
আমি কি করবো ভেবে পাচ্ছি না। মেয়েটাকে ছেড়ে গেলে হয়তো অন্য পশু এসে খুবলে খুবলে খাবে। সবাই হয়তো আমার মতন হবে না। আমি মায়াকে বললাম,
- ঠিক আছে, তোমার কোন ক্ষতি হবে না। আমি সন্ধ্যার পর আবার আসবো।
- আমি এতক্ষণ এইখানে কি করমু? আমারে বাইর করেন গো সাহেব।
- আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে, সন্ধ্যা আবার আসব। খেয়ে নিও ঠিকমতো।
.
মায়া আমার দিকে কাঁদো কাঁদো দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমার কোন উপায় নেই। আমি অযথা মায়ায় মায়াকে না জড়িয়ে রুম থেকে বের হয়ে আসলাম। রিসিভশনের সামনে আসতেই রিংকু মিয়া আমাকে দেখে মুচকি হাসলো। আমি তার এ হাসির কারণ বুঝতে পারলাম। তবুও মনে মনে ভাবলাম, আপনি যে জন্য হাসলেন তার পুরোটাই মিথ্যা।
.
রিংকু মিয়া আমাকে সালাম দিলো। মুচকি হেসে বললো,
- স্যারের কোন অযত্ন হয়েছে? হলেও ক্ষমা করুন, নতুনই এসেছে তো।
- এত কথা বলার সময় নেই, আমি আবার রাত্রে আসবো। এ অবধি যেন ওকে কেউ স্পর্শ না করে।
- স্যারের কথাই যথার্থ।
.
আমি আসল রেটের চেয়ে আরো কিছু বকশিশ দিয়ে গাড়ি ড্রাইভ করে বাসায় আসলাম। বাড়িতে এসেই দেখি বকুল নিশিকে খাওয়াচ্ছে। আমাকে দেখেই দৌঁড়ে এসে কোলোয় উঠলো।
- বাব্বা তুমি রাতে কোথায় ছিলে?
নিশির প্রশ্ন শুনে মাথাটা মোচড় দিয়ে উঠলো। কি বলবো তাকে? মিথ্যা বলবো? নাকি সত্যিই বলবো যে ওর বাবা পতিতালয়ে রাত কাটাতে গিয়েছিলো?
(চলবে)
.
#গল্পঃনিঃস্বার্থ_ভালোবাসা
#সাজ্জাদ_আলম_বিন_সাইফুল_ইসলাম
পর্ব:৪
.
.
নিশিকে মিথ্যা কথা বলে পাশ কাটলাম। পিছন ফিরে জিজ্ঞেস করলাম,
- মামনি তোমার স্কুল নেই আজ?
নিশি, বকুল দু'জনই হাসতে লাগলো। আমি ওদের হাসার কারণ খুঁজে ব্যর্থ হলাম। কিছুক্ষণ পর নিশি বললো,
- বাব্বা আজ শুক্রবার।
আমার খেয়াল হতেই মুচকি হেসে দিলাম।
.
যাক আজকাল তারিখ, দিনটাও মনে থাকছে না। মাথাটা মনে হয় গেছে। নিশি বকুলের সাথে খেলছে। আমি বিছানায় বসে চিন্তা করতে লাগলাম। মায়াবী একটি মেয়ের চিন্তা। মায়া মাখানে টানা টানা দু'টো চোখ, কেশ কালো চুল, উজ্বল ফর্সা! সবকিছুতেই পরিপূর্ণ মেয়েটি। আমি ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়িছি টেরই পাই নি।
.
আমার ঘুম ভাঙলো বকুলের গলার আওয়াজে। বকুল ডাকছে,
- ভাইজান, ভাইজান,
অর্ধচোখ খোলা অবস্থায় বললাম,
- কি হয়েছে, ডাকছো কেন?
- ভাইজান আযান দিছে, নামাযে যাবেন না? আজ তো জুমার নামায।
- ওহ
শেষ কথাটা উচ্চারণ করে বিছানা থেকে উঠে পড়লাম। ঘড়িতে দেখি নামাযের এখনো আধা ঘণ্টা বাকি। আমি এরই মধ্যে গোসল করে মসজিদে গেলাম। ইমাম সাহেব কত সুন্দর করে বয়ান পেশ করছেন! সত্যিই আমি মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি।
.
এমনি দিন খুৎবায় মনোযোগ থাকতো না। আজ কিছুক্ষণ খুৎবা শুনে মনে নাড়া দিয়ে উঠলো। মনে মনে ভাবলাম, আর কখনো এত চমকপ্রদ বক্তব্য মিস করবো না। নামায শেষ করে বাড়ি ফিরে হালকা খেয়ে বেড়িয়ে পড়লাম।
.
আজ সরাসরি সোহেলের বাড়ি গেলাম। সোহেল আমাকে দেখে খুবই খুশি হলো। সোহেলের দু'টো বাচ্চা, একটা ছেলে আর একটা মেয়ে। ওদের সংসারের আনন্দ দেখে আমার খুব হিংসা হতে লাগলো। সবাই কত সুখে আছে, অথচ আমারই কত দুঃখ! আঁখিকে সম্পূর্ণরূপে এখনো ভুলতে পারি নি।
.
এত ভালোবাসা কি এত সহজেই ভোলা যায়! সোহেলের জোরাজুরিতে ওর বাসায় খেলাম। গাড়ি ড্রাইভ করে হোস্টেলে আসলাম। মেয়েটা যে কি করছে, কে জানে! আমি চাবি নিয়ে ঢুকে দেখলাম মায়া ঘুমাচ্ছে। আমি একটু এগিয়ে গিয়ে ওর পাশে বসলাম।
.
ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষের নাকি মানুষের আসল সৌন্দর্য বোঝা যায়। আমি কিছুক্ষণ ওকে দেখতেই ধরাৎ করে বিছানার উপর উঠে বসে পড়লো,
- এ কি তুমি ভয় পাচ্ছো যে?
ভয়ার্ত কণ্ঠে জবাব দিলো,
- ও আপনি? আমি ভাবলাম.......!
- ওত ভাবাভাবির দরকার নাই।
- আপনি ওভাবে কি দেখছিলেন?
.
আমি কোন উত্তর না দিয়ে জানালার কাছে গেলাম। বাইরে খানিকটা শীত পড়েছে। তবুও সন্ধ্যার পরের শহরটাকে কত বিচিত্র মনে হচ্ছে। আমি বাইরের দিকে তাকিয়ে আছি। মায়া আমার পিছনে এসে দাঁড়ালো,
- আমারে বাইর করবেন না?
মায়ার কথায় চমকে উঠলাম। আমার চমকে উঠা দেখে ও খানিকটা ভয় পেল। আমি হিহি করে হেসে উঠলাম। মায়া লজ্জা পেয়ে বিছানায় গিয়ে বসলো। আমি জানালার পর্দাটা ভালোভাবে টেনে দিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসলাম।
.
আমার নিশ্চুপভাবে কাঁদছে। আমি ঢের বুঝতে পারছি। আমি ওর মনটাকে হালকা করার জন্য বললাম,
- দুপুরে কী খেতে দিয়েছে?
- ভাত আর মাছ।
- যা দিবে তাই গপাগপ খেয়ে নিবে। না হলে শরীর নষ্ট হয়ে যাবে।
- মরে গেলেই বুঝি বেশি ভালো হতো।
- পরজগতের জন্য কতটুকুই বা পাথেয় অর্জন করেছি।
.
মায়া আমার কথায় আর উত্তর না দিয়ে বসেই থাকলো। আজকে আর এখানে থাকার ইচ্ছে নেই।
- আমি চলে গেলাম।
- আজ থাকবেন না?
- নাহ।
- আমার ডর করবে।
- কালকে একবার এসে না হয় দেখে যাবো।
.
মায়া আমাকে আর বাঁধা দিলো না। আমি বের হয়ে আসলাম। বের হয়ে রিংকু সাহেবের সাথে দেখা করে অগ্রিম কিছু টাকা দিয়ে বাড়ি চলে আসলাম। নিশি এখনো ঘুমায় নি। টেলিভিশনে বকুলের সাথে বসে কার্টুন দেখছে। আমাকে দেখেই বাব্বা বলে চিৎকার দিয়ে কোলোয় উঠলো।
.
আমি ওর কপালে একটা চুমু দিয়ে বললাম,
- মামনি, তুমি এখনো ঘুমাও নি?
- বাব্বা, তোমার জন্য বসে ছিলাম। তোমার সাথেই ঘুমাবো।
- তাই বুঝি?
- হুম।
- ঠিক আছে চলো।
বকুলকে জিজ্ঞেস করলাম নিশির খাওয়া হয়েছে কি না! বকুল বললো 'হ্যাঁ'। আমি কিছু খেয়ে নিশিকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুরের ঘোরে আজ একটা কথাই বারবার ভেসে আসছিলো, 'আমারে বাইর করেন স্যার।'
.
বেশ কিছুদিন এভাবে মায়ার কাছে যাতায়াত করলাম। হোস্টেলের মালিককে সুবিধার মনে হচ্ছিলো না। ভয় দেখিয়ে যদি অন্য কাউকে দিয়ে মায়ার সতীত্ব নষ্ট করে তাহলে হয়তো আল্লাহও আমাকে ক্ষমা করবেন না। অনেক চিন্তা বারবার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। যখনি মায়ার কাছে যাই তখনি শুধু বারবার একটি কথাই শুনি, 'আমারে বাইর করবেন কবে?' আমি ওর কথায় কিছু বলতে পারি না, চুপ হয়ে পাশ কেটে যাই।
.
সেদিন রিসিভশন গিয়ে রিংকু মিয়ার পাশে বসে পড়লাম। উনি আমাকে নিতান্তই ভদ্র মানুষের ন্যয় সালাম দিয়ে চায়ের অর্ডার করলেন। আমার দিকে মুচকি হেসে বললো,
- স্যারের কোন অযত্ন হচ্ছে?
- মায়াকে আপনি কত টাকা দিয়ে কিনেছেন?
অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
- কেন স্যার?
- বলুন না?
- হাজার পঞ্চাশ।
রিংকু সাহেবের কথা শুনে মনে মনে মেকি হাসলাম। মানুষের দাম বুঝি এতই কম! আমি তাকে বললাম,
- মায়াকে আমি কিনতে চাই।
- না না স্যার, আমাদের নতুন মাল। আগে রমরমাট ব্যবসা করি তারপর।
- যদি আপনার ক্রয়কৃত টাকার ডাবল দেই তাহলে?
.
আমার অফার শুনে রিংকু মিয়া কিছুক্ষণ মাথা চুলকাতে লাগলো। কি যেন ভেবে বললো,
- আরো হাজার বিশেক টাকা লাগবে।
- ডান, আগামীকাল পেয়ে যাবেন। আমি কালকেই ওকে নিয়ে যাবো।
কথাগুলো বলেই চলে আসলাম।
.
মায়া আস্তে আস্তে ওর গ্রাম্য ভাষা পরিবর্তন করছে। তবে পুরোপুরি পরিবর্তন করতে পারে নি। লেখাপড়াও জানে না, আমি অক্ষরজ্ঞান শিখিয়েছি এ ক'দিন। পরদিন মায়ার কাছে গিয়ে বললাম,
- সবকিছু গুছিয়ে নাও।
গুছিয়ে নেয়ার কথা শুনে চমকে উঠে বললো,
- আমারে বের করবেন?
আমি ওর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বললাম,
- হ্যাঁ।
মায়ার খুশি আর ধরে না। লাফাতে লাফাতে সব কাপড় গুছিয়ে আমার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়ালো। মায়াকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে বাইরে বের হবার আনন্দটা ওর মধ্যে কতখানি!
.
আমি ওর মুখের দিকে কতক্ষণ তাকিয়ে থেকে ভাবলাম, 'হয়তো পতিতালয়ের অনেক মেয়েরাই স্বাধীনতালাভ করতে চায়, মন খুলে পৃথিবীটাকে আপন করতে চায়।' আমি মায়াকে বললাম,
- বের হয়ে কোথায় যাবে?
মায়া কিছুক্ষণ মাথা চুলকিয়ে বললো,
- আমারে গাড়িতে উঠিয়ে দিয়েন, আমি গ্রামে চলে যামু।
- ঠিক কথা বলছো তো?
মায়া আর কোন কথা বললো না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলো। আমি বললাম,
- বাচ্চাকাচ্চা তোমার পছন্দ?
বাচ্চাকাচ্চার কথা শুনে মায়া বললো,
- খুউব।
- আমার একটা ছোট মেয়ে আছে, ওর নাম নিশি।
- আপনি বিয়ে করেছেন?
- আমাকে বিবাহিত মনে হয় না?
.
মায়া আর কোন কথা বললো না। আমি ওর সরলতার দিকে তাকিয়ে থাকলাম, অতঃপর বললাম,
- চলো।
রিংকু মিয়ার সব টাকা চুকিয়ে গাড়ি করে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি। মেয়েটা আমাকে বিশ্বাস করছে তো? নাকি ওর মালিকের মতন আমাকেও অবিশ্বাস করছে।
.
নিরবতা ভেঙে বললাম,
- রাতের আকাশটা খুব সুন্দর না?
- এর চাইতে আমাদের গ্রাম অনেক ভালো। চারদিক ক্ষেত আর ক্ষেত, সবুজ গাছপালা, কত ফুল!
সত্যিই মেয়েটা খুব সরল, না হলে রোমান্টিক মুহূর্তে এমন গ্রামর বর্ণনা টেনে আনবে কেন!
.
মায়াকে নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকলাম। নিশি প্রতিদিনের মতন কার্টুন দেখছে। আমাকে দেখেই দৌঁড়ে আসলো,
- বাব্বা তুমি এসেছ?
- হুম মামনি।
- এই আপুটা কে?
- ছি ছি মামনি, আন্টি বলে ডাকো।
- ঠিক আছে, এই আন্টিটা কে?
- তোমার আন্টিকেই জিজ্ঞেস করো।
.
কোল থেকে নিশিকে নামিয়ে বাথরুমে গেলাম ফ্রেশ হতে। নিশি মায়ার কোলে একটার পর একটা প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। আমি আসতেই নিশির অভিযোগ,
- বাব্বা, এই আন্টিটা কেমন করে যেন কথা বলে।
- তুমি তোমার আন্টিকে ভালো করে কথা বলা শিখিয়ে দিয়ো মামনি।
- আচ্ছা।
- মামনি তুমি ঘুমাতে যাও, আন্টির সাথে কাল কথা বলো।
.
নিশি ঘরে গেল। বকুলকে বললাম গেষ্ট রুমটা মায়াকে দেখিয়ে দিতে। যাবার সময় মায়া বললো,
- আপনি খুব ভালো মানুষ। আর আপনার মেয়েটাও খুব মিষ্টি।
আমি মুচকি হেসে মায়ার পথ পানে চেয়ে থাকলাম। রুমে যাওয়ার আগে সে আমার দিকে ফিরে তাকিয়েছে।
āĻোāύ āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āύেāĻ:
āĻāĻāĻি āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āĻĒোāϏ্āĻ āĻāϰুāύ