ছোটগল্প: মহুয়া
লেখা: সাজ্জাদ আলম বিন সাইফুল ইসলাম
উৎসর্গ: মন মহুয়ার গল্প
.
.
(১)
বাঁশঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে ঝিঁঝিঁ পোকারা ডাকছে। চারদিকে নিস্তব্ধতার আগমন ঘটেছে। সদ্য মাঠ থেকে ফেরা মানুষেরা রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে। মাঝে মাঝে শিয়াল মামা জোরে জোরে ডাকছে। শিয়ালকে বড্ড ভয় পায় মেয়েটি। তবুও বাবার সদ্য কবরের পাশে বসে কেঁদেই চলছে অঝোর ধারায়। বাড়ির সামনে কাঁঠাল গাছটার নিচে যোগ হলো মরহুম গোলজার মিয়ার কবর। চিরনিদ্রায় শায়িত করে যে যার মতো বাড়ি ফিরে গেছে। সকলে ফিরে যাবার পর থেকে বাবার কবরের পাশে বসে আছে মহুয়া। বাবা ছাড়া তার ত্রিভুবনে কেউ ছিলো না, আজ বাবাও চলে গেল। এখন মহুয়া একা, বড্ড একা।
'মহুয়া, আর কত কাঁদবি বল? সবাই কি চিরদিন পৃথিবীতে বাইঁচা থাকে রে? না রে থাকে না। আমরা সবাই চইলা যামু,একদিন আগে আর পাছে।' রহিম মাঝির কথাগুলো শুনে মনোযোগ তার দিকে গেল। চোখের জল মুছে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে রহিম মাঝির দিকে। বুকের এক পাশটা খাঁ খাঁ করছে, শূন্যতা তৈরি হয়েছে ইতিমধ্যে। ঠোঁট দু'টো বাকিয়ে স্মিত হাসার চেষ্টা করে রহিম মাঝি।
'সারাদিনই তো কিছু খাস নাই, এখন ওঠ। ঘরে যাবি না?'
মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায় মহুয়া। ডুকরে কেঁদে উঠে, ' আমার যে আর কেউ রইলো না মাঝি। কেডায় আমারে দেখবো?'
মহুয়ার মাথায় হাত দিয়ে বোলাতে থাকে রহিম মাঝি। চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে, 'কেডায় কইছে তোর কেউ নাই? তোর তো আমি আছি রে মহুয়া। চাচাজান তোর আর আমার বিয়েটা দিতে পারলেন না। আপাতত বাদ সেসব কথা। চল এখন ঘরে যাবি। তোর নিজেরে বাঁচতি হবে।'
মায়া মায়া মুখে মহুয়া আবারো তাকিয়ে থাকিয়ে রহিম মাঝির দিকে। বেচারা কত ভালো মানুষ!
' কাজল, ওই কাজল? কই গেলি রে ছুটকি?' পিছনের দিকে তাকিয়ে জোরে জোরে ডাকতে থাকে রহিম। কাজল 'আইতাছি' বলে দৌড়ে আসে। হাতের উপর কিছু খাবার-পানি।
'কাজল শোন, তোর বুবুরে ভাত খাইয়ে দিয়ে ওর লগে রাইতে ঘুমাইস। ওর এমনিতে আবার খুব ডর। কাইল সকাল সকাল বাড়িতে গিয়া ইস্কুলে যাইস। মাঝরাইতে জাগনা পাইলে একবার দেইখা যামু নে। মহুয়া ভিতরে যা, আমি আছি তো তোর লগে।'
ভাইজানের কথায় সাঁয় দিয়ে ভাতের প্লেটটা এক হাতে রেখে অপর হাতে মহুয়ার হাতটা ধরে ঘরের দিকে হাঁটা দেয় কাজল। কাজল রহিম মাঝির একমাত্র বোন। বাবা-মা ছোটবেলায় মারা যাবার পর খেয়ে না খেয়ে কোনমতে বেঁচে আছে দু'ভাই-বোন। রহিম মাঝি মহুয়ার বাবার কবরটা জিয়ারত করে বাড়ির দিকে চিন্তামগ্ন অবস্থায় হাঁটা দেয়।
চাচাজান বেঁচে থাকলে হয়তো তার সাথে মহুয়ার বিয়েটা তাড়াতাড়ি হয়ে যেত। কিন্তু তিনি তো অভিমান করে চলে গেলেন। এখন শেষ ভরসা চেয়ারম্যানবাবু। গোলজার চাচা অবশ্য চেয়ারম্যানবাবুকে সবকথা বলতেন। তিনি যে রহিম মাঝিকে জামাই বানাতে চান সেটাও বলেছেন। মোটামুটিরকম ভালো সম্পর্ক ছিলো চেয়ারম্যানবাবুর সাথে। চেয়ারম্যানবাবু মানুষটা হিন্দু হলেও বেশ ভালো স্বভাবের মানুষ। বাড়ি যেতে যেতে রহিম মাঝি ভাবে, 'কয়েকদিন পরেই চেয়ারম্যানবাবুকে বলে মহুয়াকে বিয়ে করে ঘরে তুলবে। তাছাড়া একলা বাড়িতে তাকে রাখা ঠিক হবে না। যতদিন পর্যন্ত বিয়ের কাজটা শেষ না হচ্ছে ততদিন কাজল মহুয়ার সাথেই থাকবে।' এমনটা ভাবতে ভাবতে বাড়িতে গিয়ে পৌঁছায় রহিম মাঝি। দুটো চালার ঘর আর একটা ছোট বাংলা সংবলিত নীড়ে একমাত্র বোনকে নিয়ে আপাতত বেশ সুখেই আছে সে। কাজল ক্লাস নাইনে লেখাপড়া করছে। মাষ্টারসাহেব রহিমকে বলেছে, 'রহিম, তোর বোনের মেধা খুব ভালো রে। চেষ্টায় থাক আর তাকে ডাক্তার বানানোর আশা করে যা। দেখবি একদিন কাজল গ্রামের মানুষের মুখ উজ্বল করবে।'
মাষ্টার সাহেবের কথাটা মহুয়ার কানে পেড়েছিলো একদিন। মহুয়াও কাজলে ব্যাপারে সাঁয় দেয়, যে করেই হোক কাজলকে মানু্ষ করতেই হবে। কাজলও ভাইজানের মুখ উজ্বল করার জন্য মন দিয়ে লেখাপড়া করে।
.
(২)
মহুয়ার বাবার গোলজার মিয়ার জন্য দু'চারজন হাফেজকে বাড়ি এনে খাইয়ে দিয়ে দোয়া করিয়ে নেয় রহিম। মহুয়া আড় চোখে দেখে খুব খুশি হয়। কত ভাবে এই রহিম মাঝি!
সত্যি তার সাথে বিয়ে হতে পারলে ভালোবাসার চাদরে ভরিয়ে রাখবে হয়তো। সেজন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া ছাড়ে না মহুয়া। নামাযে সকলের জন্য দোয়া করে। বিশেষ করে বাবা ও রহিম মাঝির জন্য।
'মহুয়া শোন, আমি কাইল কাশিয়ার হাটে যামু। মহাজান সাব যাইতে কইছে। তাড়াতাড়ি বের হওন লাগবো। ফিরতে হয়তো সন্ধ্যা পার হইয়া যাইবো। কাইল আর দেখা হইবো না রে।'
মহুয়া আড়ালে বসে সব শুনছে। রহিম মাঝি কথাগুলো বলে গান গাইতে গাইতে বাড়ির দিকে রওয়ানা হয়।
মহুয়ার সাথে একান্তে দেখা হলে মাঝে মাঝে গান শোনায় মাঝি। মহুয়া রহিম মাঝির ঘাড়ে মাথা রেখে নিজের অস্তিত্বকে মাঝির মাঝে সমর্পণ করার চেষ্টা করে। মাঝে মাঝে মাঝি বলে উঠে,
'মহুয়া, একটু ভাল হইয়া বস। মাইনষে দেখলে তোর নামে কলঙ্ক রটবো।'
মহুয়া খিলখিল করে হেসে উঠে। মহুয়ার হাসির দেখে কিছুটা লজ্জা পায় মাঝি। স্মিত হাসির আড়ালে বলে উঠে, 'কিরে হাসতাছোস ক্যান?'
মাঝির গাল দুটো টেনে দিয়ে বলে, 'তোমার কথা হুইনা হাসতাছি মাঝি। কয়েকদিন বাদে তো তোমার লগে আমার বিয়া হইবো। কলঙ্ক রটলে রটবো। নাকি তুমি আমারে ভালোবাসো না মাঝি?'
'কেডায় কইছে তোরে ভালোবাসি না? তোরে ছাড়া আমি বাঁচুম না রে মহুয়া। তুই তো আমার প্রাণের অস্তিত্ব।'
কথাটা শুনে কিছুটা আনমনা হয়ে যায় মহুয়া। টলমল চোখে বলে, 'তাইলে এত ডরাও ক্যান? কলঙ্ক রটলে আমার রটবো তুমি তো পার পাইয়া যাবা। তখন বুঝি তুমি আমারে ছাইড়া চইলা যাবা মাঝি?'
মহুয়ার কথা মাঝে মাঝে বোঝে না রহিম। ঠিক তেমনি এটা কথাও বোঝেনি। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে শিশু বাচ্চার মতো কেঁদে দেয় সে। সত্যি মহুয়া এখনো তাকে ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারলো না। হৃদয়টা যে তাকে পাবার আশায় খাঁ খাঁ করে তাও বুঝে না।
রহিম মাঝি ভাবনার জগতে অনেক কিছু বুনে। হয়তো সৃষ্টিকর্তা চাইলে সবটা পূর্ণ হবে, না হলে স্বপ্নই থেকে যাবে।
মহুয়ার সাথে কল্পনার জগতে ঘর বাঁধতে বাঁধতে রাতটা কাটিয়ে দেয় রহিম মাঝি। পাখির কিচিরমিচির শুনে তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে চুলা থেকে ছাই নিয়ে দাঁত মাজতে থাকে। তাড়াতাড়ি না গেলে মহাজন সাহেব বড্ড রাগ করবেন। কাশিয়ার হাটের পাশে মহাজান সাহেবের মেয়ের বাড়ি। মেয়ের বাড়ি থেকে ফেরার পথে হাটে প্রয়োজনীয় সদাই করে ফিরবেন। ভালো মালামালের জন্য কাশিয়ার হাট বেশ বিখ্যাত। দু'টো পান্তা মচিত দিয়ে ডলে খেয়ে নিয়ে বৈঠা নিয়ে ঘাটের দিকে দৌড়ানি দেয় মাঝি।
নাহ! মহাজন সাহেব এখনো ঘাটে আসেন নি। মহাজন সাহেব বেশ ভরসা করেন মাঝির প্রতি। সততা, ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধ থেকে নিজ মনে কাজগুলো করে দেয় সে। সেজন্যই হয়তো মহাজনের সব কাজেই ডাক পরে তার। মহাজন সাহেব একসময় সুদী কারবার করলেও এখন বেশ সৎ পথে আছে । এর পেছনে ছোট্ট একটা গল্প শোনা যায়। একদিন মহাজন সাহেব রাতে ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখে বেশ বিগড়ে গিয়েছিলেন। সারাদিন ভয়ে জল পর্যন্ত স্পর্শ করেন নি। পরে অবশ্য ইমাম সাহেব তার স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে দিয়েছিলেন। তখন থেকে তিনি মসজিদের সাথে নিজের আত্মাকে বেঁধে ফেলেন। মানুষের কাছে যত সুদী টাকা-পয়সা পান সবটাই মাফ করে দিয়েছিলেন। এখন তিনি নাকি ভালোই আছেন।
.
(৩)
গ্রামের আঁকা-বাঁকা পথ দিয়ে দৌঁড়াচ্ছে মহুয়া। তাড়া একটু বেশিই। কিছুক্ষণ দেরি করলে হয়তো প্রাণের অস্তিত্বকে আর পাবে না। পাশ থেকে মাতবর সাহেবের ডাক পরে। মাতবর সাহেব মানুষটা তেমন সুবিধার না। মানুষের কিভাবে অনিষ্ট করা যায় সে চিন্তা সবসময় মাথায় ঘুরপাক খায়। আর সুন্দরী মেয়ে পেলে তো কোন কথাই নেই। মহুয়া দাঁড়িয়ে পরে,
'কি রে মহুয়া এত সকাল সকাল কই উড়াল দিতেছিস?'
মাথা নিচু করে কাচুমাচু করতে থাকে মহুয়া, 'না মানে একটু ঘাটে যামু।'
বিকৃতি হাসি দিয়ে উঠে মাতবর, 'ঘাটে ক্যান? আমার লগে চল, তোরে আদরে ভইরা দিমু।'
মাতবরের কথা শুনে খানিকটা আশ্চর্য হয় মহুয়া। যে লোকটা কয়েকদিন আগেও তো মা মা বলে মুখের ফ্যানা তুলতো সে কি না আজ!
' কি কথা কন চাচা মিয়া! আমি না আপনের ভাতিজী। এসব কথা কইতে আপনার বিবেকে বাঁধলো না?'
' বিবেকে বাঁধলে কি কইতাম রে মহুয়া সুন্দরী! বউডা কবেই মইরা ভূত। রাতে ঘুমাইলে এ কাইত ও কাইত করতে করতে রাইত কাটে। টাকা-পয়সা তো আর কম নাই আমার। তাই কইতাছি আমার লগে বিয়ার পিঁড়িতে বস। তোরে ম্যালা সুখে রাখমু।'
এবার সত্যি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় মহুয়ার, 'চাচা মিয়া, আমি আপনার মাইয়ার মতন। তাছাড়া এই বুড়া বয়সে ভীমরতি ধরলো নাকি আপনের।'
চোখ দুটো বড় বড় করে মাতবর বলে, 'সবাই যদি বইন আর ভাতিজী হয় তাইলে বউ হইবো কেডায়? বাজে কথা রাখ, তোমারে আমি বিয়া করবার চাই।'
কথাটা শুনেই পাশ কেটে ঘাটের দিকে দৌড় দিলো মহুয়া। মাতবার পিছন থেকে জোরে জোরে বলতে লাগলো, 'এশার পর তোর ঘরে আসমু নে। সাজগোছ কইরা থাকিস রে মহুয়া সুন্দরী।'
এক দলা থুথু ফেলে আবারো দৌড়াতে থাকে মহুয়া। কলাগাছের পাশ থেকে মহুয়া দেখে রহিম মহাজন সাহেবকে বসার জন্য টুল দিচ্ছে। অনেক হাপাতে হাপাতে ডাক দেয়, 'মাঝি একটু শুনবা?'
মহুয়ার গলার আওয়াজ শুনে পিছনে ফিরে তাকায় রহিম। স্মিত হেসে মহাজন সাহেবের দিকে তাকায়। মহাজন সাহেব বলেন, 'তাড়াতাড়ি শুইনা আয়, বেশি দেরি করিস না।'
মহাজনের কথায় খুশি হয়ে মহুয়ার সামনে দাঁড়ায়। মহুয়ার চোখে পানি ছলছল করছে। রহিম আশ্চর্য হয়ে বলে, 'কি রে মহুয়া কান্দোস ক্যান? কিছু হইছে তোর?'
মহুয়া মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে উত্তর দেয়। মাতবরের সাথে ঘটে যাওয়া কথাগুলোও বলে দেয়। রহিম মাঝি রাগে গজগজ করতে থাকে।
'হেয় কইছে রাইতে আমার ঘরে আইবো। মাঝি,আমার ভীষণ ডর করতাছে।'
রহিম কিছুটা সাহস যোগানোর জন্য বলে উঠে, 'কাজলরে তোর ঘরে আইনা রাখিস, খবরদার ওরে এইসব কথা বলিস না। আমি তাড়াতাড়ি ফিরা আসমু। অহন বাড়ি যা।'
কথাটা বলেই পিছনের পথ ধরলো রহিম মাঝি। মহুয়া ফের ডাকে, 'মাঝি এক মিনিট খাড়াও।'
আবার পিছনে ফিরে মহুয়ার দিকে তাকায় রহিম। মহুয়া রুমালে মোড়ানো কিছু জিনিষ রহিমের দিকে বাড়িয়ে দেয়।
রহিম বলে উঠে, 'কি এগুলো মহুয়া?'
মহুয়া লজ্জানতভাবে উত্তর দেয়, 'ভোরে ঘুম থাইকা উঠে তোমার লাইগা কয়ডা পিঠা বানাইছি। দূরে যাইতাছো, মাঝ নদীতে খিদা লাগলে খাইও।'
কথাটা বলেই বাড়ি দিকে দৌড়াতে লাগলো মহুয়া। মুচকি হেসে নৌকায় উঠে রহিম। মহাজন সাহেব বলে উঠে, 'বুঝলি রে রহিম মাইয়াডা তোরে বড্ড ভালোবাসে। তা কবে ঘরে তুলবি ওরে?'
মহাজন সাহেবের কথা লজ্জায় লাল হয়ে যায় রহিম মাঝি, 'এই চাচাজান, কয়টা দিন বাদেই তুলমু। গোলজার চাচা বাইঁচা থাকলে এতদিনে হইয়া যাইতো।'
রহিমকে এবার থামিয়ে দিয়ে মহাজন সাহেব বলে উঠেন, 'বিয়ার খরচাপাতির জন্যি কিছু টাকা নিয়া যাইস। অহন নাও ছাড়,ম্যালা দেরি হইতাছে।'
মহাজনের কথায় কিছুটা আশা পায় রহিম। ঘাট থেকে নৌকা ছেড়ে দেয় কাশিয়ার হাটের দিকে।
.
(৪)
সন্ধ্যা যত কাছে আসছে রহিমের হৃদপিন্ডের পাশে ততই ধুকধুক করছে। কারণ মাতবরের মত খারাপ লোক হয়তো এই জেলেপাড়ায় নেই। তাছাড়া ঠিক সময়মত পৌঁছতে না পারলে কি হবে সেটা হয়তো আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। এদিকে কাজলের পরীক্ষা চলছে, হয়তো সেও পড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। এরকম হাজারটা প্রশ্ন ফ্যানের চাকার মতো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। অন্যমনস্ক দেখে মহাজন তো জিজ্ঞেস করলেন, 'কি রে বাজান? তুই এমন করতাছোস ক্যান? কিছু হইছে?'
মেকি হাসি দিয়ে রহিম বলে উঠে, 'না চাচাজান, এমনি ভালো লাগতেছে না। আইচ্ছা চাচাজান এশার আগে বাড়ি ফিরতে পারমু তো?'
'ঠিকমতো নাও চালাও। পারতেও পারো বৈকি।'
আকাশে সূর্যটা ডুবে গেছে। সূর্য ডোবার স্থানটা রক্তিম বর্ণ ধারণ করছে। না জানি মহুয়া কি করছে। সে কি ভয় পাচ্ছে?
ভয় পাবারি তো কথা, মাতবরের চোখ বলে কথা! চোখ তো নয় যেন শকুনের চোখ।
আপাতত সব বাদ দিয়ে জোরে জোরে বৈঠা বাইতে থাকে রহিম। বুকের একপাশটা কাঁপছে।
মুয়াজ্জিন সাহেব সুরেলা কণ্ঠে আযান দিয়ে মানুষকে মসজিদের দিকে ডাকছেন। রহিম মাঝি নৌকাটা ঘাটে বেঁধে বাড়ির দিকে দৌড়াতে থাকে। মহাজন সাহেবের কিছুই বুঝে আসে না। তিনিও ফরজ কাজ আদায় করার জন্য আগে মসজিদের পানে এক'পা দু'পা করে হাঁটতে থাকেন।
বাড়িতে বৈঠা রেখে কাজল বলে চিৎকার দেয় রহিম। কাজল ঘর থেকে বের হয়ে আসে, 'ভাইজান কিছু কবা?'
'তোর মহুয়া বুবু আসছিলো?'
কাজল মাথা নেড়ে উত্তর দেয়, 'হ ভাইজান আসছিলো। আমার কাইল অংক পরীক্ষা, আমি হেরে কইছি আজ ম্যালা পড়া তাই যামু না।'
কাজলকে ঘরে যেতে বলে মনে মনে ভাবে যা ভাবছি সেটাই ঠিক হলো। সবার আগে মহুয়ার খবর নেয়া দরকার। না জানি মেয়েটা কতইনা ভয়ে আছে।
দ্রুততার সাথে মহুয়ার বাড়ির পথ ধরে রহিম। ছোট বাঁশঝাড়ের পাশেই মহুয়ার ঘর। আশেপাশে তেমন ঘরবাড়ি নেই বললেই চলে।
আঙ্গিনায় পা রাখতেই চমকে উঠে রহিম। ঘরের ভিতর থেকে কিসের যেন আওয়াজ আসছে। পা টিপে টিপে জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা মাত্রই চমকে উঠে। হায়রে! এই সময় যার মসজিদে থাকার কথা সে কিনা মেয়ে বয়সী মেয়ের সাথে!
বুকটা ছাড়কার হয়ে যায় রহিমের। নাহ, শেষ রক্ষা করতে পারলো না। বারবার মহুয়ার চেহারা ভেসে উঠতে লাগলো, 'মাঝি তুই আমার ইজ্জত বাঁচাইতে পারলি নারে। আমি এখন ধর্ষিতা।'
সারা শরীর ঘেমে টপটপ করে পানি পরছে রহিমের। রান্নাঘর থেকে বটি নিয়ে মহুয়ার ঘরে ঢুকে পরে। মহুয়ার শরীরের উপর লেপ্টে থাকা পাষণ্ডটার পিছনে কয়েক কোপ বসিয়ে দেয় রহিম। পুরো বিছানা রক্তের রক্তাক্ত হয়ে উঠে। মহুয়া আশ্চর্য হয়ে উঠে। মুখের উপর আঁচনো দাগ দেখে বুক ফেঁটে পানি চলে আসে রহিমের। মহুয়া বলে উঠে, 'মাঝি তুই খুন করলি!' টুপ করে রহিমের হাত থেকে বটিটা কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করে মহুয়া। রহিম বটিটা দেয় না।, 'নারে মহুয়া, আমি তোকে রক্ষা করতে পারলাম না। তুই আমাকে ক্ষমা কর।'
পরদিন সকাল,
মাতবরের লাশের চারপাশে জেলেপাড়ার মানুষজন। মহুয়া দরজার নিচে বসে নিশ্চুপ। চোখ থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে। পুলিশের গাড়ি এসে লাশটাকে গাড়িতে তোলে। রহিম মাঝির হাতে হ্যান্ডকাপ পড়িয়ে গাড়ির দিকে এগুতে থাকে। মহুয়া দৌড়ে গিয়ে রহিমের হাত ধরে, 'মাঝি কিছু বললি না আমায়?'
রহিম অশ্রুঝরা চোখে বলে উঠে, 'আমার ছুটকিরে দেখিস মহুয়া।'
মহুয়া চেয়ে থাকে রহিমের দিকে। একটা রাত তার পুরো জীবন পাল্টে দিলো। আচমকা হাহাহা করে হেসে উঠে মহুয়া।
.
(৫)
আজ দীর্ঘ বারো বছর পর জেল থেকে বের হয়েছে রহিম। জেলের বাইরের বাতাস আর জেলের ভিতরের বাতাসের মধ্যে অনেক তফাৎ। পঁচিশ বছরের যুবকের আজ যৌবন চলে যাবার অভিমুখে মুখ থুবড়েছে। না জানি মহুয়া কয়টা সন্তানের জননী। বোনটারো অনেকদিন কোনো খোঁজ পায়নি। হয়তো অভিমান করেছে, তাই আড়ি দিয়েছে। নিজ গ্রামে ঢুকেই আশ্চর্য হয়ে যায় রহিম। গ্রাম যেন আর গ্রাম নেই, কত কিছুই পাল্টে গেছে। সেই আমগাছ, জামগাছ, কলাগাছের চারা অবধি নেই। কত পাকা পাকা বাড়ি উঠেছে, তার ইয়ত্তা নেই। গ্রামে ঢুকেই পরিচিত কাউকে চোখে পড়লো না। হঠাৎ পিছন থেকে ডাক পড়লো,
'রহিম মাঝি না! কি মিয়া কবে ছাড়া পাইলা?' একমাত্র ছেলেকে সাইকেলে নিয়ে বাড়ি যাবার পথে জিজ্ঞেস করে মিন্টু। মিন্টু রহিমের সমবয়সী। হাসি মুখে রহিম উত্তর দেয়, 'এই তো গতকাইল। তোর ছেলে বুঝি এটা?'
মিন্টু হেসে উত্তর দেয়, 'হ্যাঁ রে। থাক,পরে কথা হইবো।'
সাইকেল জোরে টান দিয়ে মিন্টু তার গন্তব্যে চলে যায়। সঠিক সময়ে মহুয়ার সাথে বিয়ে হলে হয়তো তারো এমন সন্তান থাকলো।
মাথা নেড়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে যায় রহিম। টিনে চালায় আজ বড় ঘর উঠেছে। বাড়ির অবস্থা দেখে কিছুটা অবাক হয় রহিম। রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া উঠা দেখে সেদিকে আস্তে আস্তে হাঁটতে থাকে। রান্নাঘর উঁকি দেয়।
স্বশব্দে ডাক দেয়, 'কেডা?'
ঘোমটা টেনে মহিলা পিছনে তাকায়। খানিকটা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পরে। ঘোমটা সরিয়ে ছলছল চোখে বলে, 'মাঝি তুমি! কবে ছাড়া পাইছো?'
মহুয়াকে এই অবস্থায় দেখে একটু বেশিই অবাক হয় রহিম। মহুয়া রান্নাঘর থেকে বাইরে বের হয়ে আসে।
'গতকাইল ছাড়া পাইছি। তোমার স্বামীরে নিয়া বুঝি আমার বাড়িতে থাকো?'
মহুয়ার কাঁদো কাঁদো স্বরে উত্তর দেয়, 'যাওনের সময় তো কিছু কইয়া যাও নাই। আমি তোমারি অপেক্ষায় আজো আছি রে মাঝি।'
মহুয়ার কথা শুনে দু'চোখ বেয়ে পানি ঝরঝর করে ঝরতে লাগলো। এত ভালোবাসে মহুয়া তাকে! হঠাৎ চোখ যায় পারিবারিক কবরস্থানের দিকে, একটা অতিরিক্ত কবর।
আঙ্গু্ল উঁচিয়ে রহিম বলে, 'মহুয়া ওই কবরটা কার?'
মহুয়া কেঁদে কেঁদে বলে, 'মাঝি আমি তোমার কথা রাখতে পারি নি। কাজলরে আমি বাঁচাতে পারি নি। তুমি চলে যাবার পর চিন্তায় মেয়েটার শরীর খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। ডাক্তার কইছিলো বড় রোগ, ম্যালা টেকা লাগবো। তবুও বাঁচবো নাকি থাকবো তারা কইতে পারে না। বাজানের জমিটুকু মহাজন চাচার কাছে বেইঁচা চিকিৎসা করাইলাম কিন্তু তাও আমাগো ফাঁকি দিলো।'
কথাগুলো বলতে বলতে হউমাউ করে কাঁদতে লাগলো মহুয়া। রহিম মাঝি নিথর হয়ে গেছে।
আস্তে আস্তে কবরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই স্মৃতিগুলো বারবার মনে পড়ছে, পুরোনো হাজারো স্মৃতি। ছুটকির সেই দুষ্টুমি আর মাঝে মাঝে 'ভাইজান' বলে ডাকটা। কবরের পাশে মহুয়া রহিম দু'জনেই দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ রহিম শুনতে পেল ভাইজান ডাকটা। পাগলের মতো চারদিকে খুঁজতে লাগলো। নাহ! কোথাও নেই। কবরের পাশে শিমুলগাছ কাজল লাগিয়েছিল। আজ সেটা বেশ বড় হয়েছে, ফুলও ফুটেছে। ডজনখানেক পাখি কিচিরমিচির ডাকে কবরস্থান মুখরিত করে তুলেছে।
(সমাপ্ত)
āĻāϞ্āĻĒ āϏংāĻ্āϰāĻš āĻāϰা āĻāĻŽাāϰ āύেāĻļা। āϰোāĻŽাāύ্āĻিāĻ, āĻৌāϤিāĻ, āϰāĻŽ্āϝ, āĻৌāϤুāĻ āϏāĻš āĻšাāĻাāϰো āĻāϞ্āĻĒ āĻāĻে āĻāĻŽাāϰ āϏংāĻ্āϰāĻšে।
āĻŽāĻ্āĻāϞāĻŦাāϰ, ⧍ā§Ļ āĻĢেāĻŦ্āϰুāϝ়াāϰি, ⧍ā§Ļā§§ā§Ž
4419
āĻāϰ āĻĻ্āĻŦাāϰা āĻĒোāϏ্āĻ āĻāϰা
Rahathossain1010100@gmail.com
āĻāĻ āϏāĻŽā§ে
ā§Ž:ā§Ēā§ AM
āĻāϤে āϏāĻĻāϏ্āϝāϤা:
āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝāĻুāϞি āĻĒোāϏ্āĻ āĻāϰুāύ (Atom)
āĻোāύ āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āύেāĻ:
āĻāĻāĻি āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āĻĒোāϏ্āĻ āĻāϰুāύ