গল্প: ভালোবাসা ভালোবাসা
পর্ব:১
.
.
বড়লোক বাবার একমাত্র সন্তান হবার কারণে লেখাপড়ার ইতিটা বিদেশেই টেনেছি। বিদেশি কালচার দেখে শেষপর্যন্ত বিরক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসলাম। নাড়িরটান বলে কথা! হাজার হোক আমি বাঙালী। বাংলা ভাষা আমার হৃদয়ের প্রতিটা শিরা-উপশিরায় গেঁথে আছে। বিদেশের মাটিতে বসে সবসময় দেশের কথা মনে পড়তো, পরিবারের কথা মনে পড়তো, বন্ধুবান্ধবদের কথা মনে পড়তো।
তাইতো বাবার চাপে লেখাপড়া শেষ করেই দেশে ফিরে এসেছি। আমি দেশেই থাকতে চেয়েছিলাম, বড়লোক বাবার ছেলে বলে নিজের ইচ্ছেটাকে কবর দিয়ে বিদেশেই পড়ে থাকতে হয়েছে।
মাকে ছোটবেলায় হারিয়েছি। মাকে খুব ভালোবাসতেন বলে দ্বিতীয়বারের মতন কবুল বলার মন মানসিকতা বাবার তৈরি হয়নি। তখন খুব বেশি না বুঝলেও এতটুকু বুঝেছি বাবা মায়ের শেষ স্মৃতিটুকু নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়।
দাদুভাই, বড় আব্বু, জেঠাইমা কত করে বুঝালো বাবাকে, কিন্তু বাবা রাজি হলেন না।
আস্তে আস্তে যখন বড় হতে থাকলাম তখন মাঝে মাঝে বাবাকে একটা অন্ধকার ঘরে ঢুকতে দেখতাম। অবশ্য সেই ঘরে কেউই ঢুকতো না। বাবার বারণ ছিলো। শুনেছি মায়ের গানের গলা ভারী মিষ্টি ছিলো। মাঝে মাঝে মা গাইতেন আর বাবা তার সাথে সুর মেলাতেন।
তখন যদি দু'জনকে দেখতে পেতাম তাহলে হয়তো আমার জীবনটা অন্যরকম হতে পারতো। বাবা আজও মিনমিন করে গান গায়,
"ভালোবাসা যত বড়, জীবন তত বড় নয়,
তোমায় নিয়ে হাজার বছর বাঁচতে বড় ইচ্ছে হয়।"
সত্যি তো বাবা মায়ের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন। বাবা প্রায়ই মায়ের কবরের পাশে বসে কি যেন বকেন। সবাই তাকে পাগল বললেও আমি কিছুটা বুঝি।
সত্যিকথা বলতে বাবা মাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। তাদের প্রথম ভালোবাসার ফসল আমি। তবে মাকে আমি কাছে পেয়েছিলাম মাত্র ৩ বছর।
হাস্যকর হলেও সত্যি যে মা টাকার জন্যই মারা গিয়েছিলেন। তখন বাবা ছোটখাট কোম্পানিতে জব করে সংসার চালাতো। ছোট্ট ঘরে কোন কিছুরই কমতি ছিলো না। কিন্তু শেষপর্যন্ত টাকার কাছে বাবা হেরে গেলেন।
এরপর জেদের বশে বাবা টাকা কামাতে লাগলেন। টাকার উৎস কোথায় আমি জানতাম না।
তবে বাবা খুব কম সময়ে খুব বড়লোক হয়ে গেলেন। টাকার দুঃখ ঘুচলো বটে কিন্তু সংসারে সুখ ফিরলো না। আমাকে নিয়ে শুরু হলো বাবার নতুন যুদ্ধ। আমাকে মানুষের মতন মানুষ করার যুদ্ধ।
তাইতো আমাকে বিদেশ পাঠিয়ে তিনি নিশ্চিতে অফিস করতেন। বিদেশি সংস্কৃতি দেখে বরাবরই আমার খারাপ লাগতো। বাবাকে বিদেশে না থাকার কথা বললে তিনি ভীষণ রাগ করেন। তারপর থেকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও পড়ে থাকতে হয়েছে।
.
এখন আমার লেখাপড়া শেষ। নিজেদের এত বড় ব্যবসা থাকলে জব করার প্রশ্নই ওঠে না। খুব দ্রুত বাবা সবকিছু আমার হাতে তুলে দিয়ে শান্ত হতে চাইলেন। কিন্তু নিজের কাছে আমাকে নিতান্তই ছোট মানুষ মনে হয় তাই সবটা নিলাম না। বাবার সাথে অফিসের কাজ ভাগাভাগি করে নিলাম।
বাবা সারাদিন অফিসে কাটালেও কাজ শেষ করে আমিই আগে চলে আসি। বাড়িতে ফিরেই রান্না করি। রান্না করার জন্য কাজের লোকের তো অভাব নেই তবুও অন্যের রান্না করা খাবার ঠিক আমার মুখে মুখরোচক হয় না। বাবা হয়তো চাপে পড়ে এতদিন খেয়েছে কিন্তু আমি খেতে পারবো না।
বিদেশেও সময় পেলেই রান্না করে খেতাম, বাঙালী রান্না। আমার রান্না করা দেখে বাবা মুচকি হাসেন। হাসলেই বা কি!
রান্না তো খারাপ হয় না। তবে বাবার এমন হাসার অর্থ কিছুটা হলেও আমি বুঝি। তবে আপাতত এসব সায় দেই না। সেদিন তো বলেই ফেললেন,
- রোমান বাবা একটা বিয়ে করেই ফেল। আর কতদিন বাড়িটা খালি পরে থাকবে বল।
- কি যে বলো বাবা, বাড়িটা খালি কই? তুমি আছো আমি আছি, রহিমের মা আছে, শফিক চাচা আছে।
- এত প্যাচ মেরো না তো। আমি আর কয়দিনই বা বাঁচবো। নাতি-নাতনির মুখ কি দেখবো না? তোমার তো উপযুক্ত বিয়ের বয়স হয়েছে।
- দেখ বাবা, আমি আপাতত বিয়ে করছি না। বিয়ে করার জন্য আরো ৪ বছর লাগবে। আমার সময় চাই।
বাবা চুপ করে থাকেন। আমি একটা মেয়েকে ভালোবেসেছি দেশে এসেই। মেয়েটা ডানাকাটা পরীর মতন। কি মিষ্টি হাসি! তবে মেয়েটার কাছে একটাই কমতি মনে হলো, বাঙালিপনা। তবে তা বানিয়ে নিতে পারবো। একটা সময় শ্রুতির সাথে সম্পর্কটা হয়েই গেল। বড়লোক বাবার ছেলে বলে হয়তো খুব দ্রুত সবকিছু ঠিক করে নিয়েছে।
.
বেশকিছু দিন চুটিয়ে প্রেম করার পর বুঝলাম মেয়েটার বেখেয়ালিপনা অনেক। তবুও হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা দিয়ে তাকে আপন করে নিতে চেয়েছি। বিয়ের পর আস্তে আস্তে পরিবর্তন করতে চেয়েছি। তবুও কেন জানি মনে হচ্ছিলো মেয়েটা বেশ জেদি। কখনো কিছু করতে চাইলে করবেই। তবুও প্রথম স্বপ্ন দেখা তাকে নিয়েই।
সকলের মুখে একটা কথা শুনি, 'প্রথম ভালেবাসা ভোলা যায় না।'
আমিও হয়তো শ্রুতিকে ভুলতে পারবো না। ওর সাথে যতটুকু মিশেছি ততবারই বুঝেছি মেয়েটাও আমাকেই ভালোবাসে।
বাবাকে কথাটা বলার আগেই বাবার ডাক পড়লো,
- রোহান, বেশ কিছুদিন থেকে আমার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। আমি প্রতিদিনই তোমার মাকে স্বপ্নে দেখি, সে আমাকে ডাকছে। হয়তো আমি আর বেশিদিন বাঁচবো না। আমার একটা ইচ্ছা পূরণ করবি বাবা?
- বাবা তুমি এসব কি বলছ? তোমার কিচ্ছু হবে না।
- আগে বল পূরণ করবি কিনা?
- আচ্ছা বলো, তোমার কথা কি আমি ফেলতে পারি?
বাবা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে গলা খাকড় দিয়ে বললেন,
- আমার গ্রাম্য বন্ধুর মেয়ে, নাম ফাতেমা। গতবার যখন দেশে গিয়েছিলাম তখন তাকে বেশ পছন্দ হয়েছে। আমি চাই তুমি তাকে বিয়ে করে ঘরে তুলো।
বাবা আমার হাত দু'খানা চেপে ধরলো। বাবার চোখে হালকা পানি স্পষ্ট দেখতে পেলাম। হয়তো সত্যি সত্যি বাবার হৃদয়টা শূন্যতায় পরিপূর্ণ হয়ে গেছে।
বাবার কথায় শ্রুতির কথা পুরোটা ভুলে গেলাম। কোন কথা না বলে বাবার ঘর থেকে বের হয়ে আসলাম। এতদিন বাদে বাবার চোখে স্পষ্ট পানি দেখতে পেলাম। এই মূহুর্তে কিভাবে শ্রুতির কথা বলি?
এদিকে শ্রুতি আরো এক বছর সময় চেয়েছে তার লেখাপড়া শেষ করার জন্য। সবদিক দিয়েই চাপে আছি। আজ মাকে খুব মনে পড়ছে। স্মৃতিগুলো বেশ আবছা! মায়ের মুখটা স্পষ্টতর নয়।
গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেল। শ্রুতিকে ফোন দিলাম। কথা বলতে বলতে বেলকনিতে আসলাম। দূরে পুকুরঘাটে কাকে যেন দেখতে পেলাম।
বাবা ভালো গিটার বাজাতেন। পুকুরঘাটে বসে এই মধ্য রাতে তিনি সেটাই করছেন। সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে গিটার নিয়ে হালকা সুর তোলার চেষ্টা করছেন।
আমি বাবার কষ্টটা বুঝি। এতটা বছর মায়ের স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে তিনি বেঁচে আছেন। বাবা গান ধরেছেন,
'আমার মতন এতো সুখী, নয়তো কারো জীবন।
কি আদর স্নেহ ভালোবাসা, জড়ালে মায়ার বাঁধন।'
আমি শ্রুতির ফোনটা কেটে দিয়ে বাবার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাবা গেয়েই চলছেন। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি ঝরছে। আমি বাবার কাঁধে হাত স্পর্শ করলাম। বাবা পিছনে ফিরে আমাকে দেখা মাত্রই চোখের জল মুছার চেষ্টা করলেন।
গিটারটা রেখে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। শূন্যতা মানুষকে এত দূরে নিয়ে যেতে পারে তা জানা ছিলো না। কারো স্বামী হিসেবে হয়তো বাবা ব্যর্থ। তবে পিতা হিসেবে তিনি কোনক্রমেই ব্যর্থ নন। আমি বাবার চোখে চোখ রেখে তার অশ্রুকণাগুলো মুছে মেকি হাসার চেষ্টা করলাম।
(চলবে)
গল্প: ভালোবাসা ভালোবাসা
পর্ব:২
.
.
বাড়িতে জমকালো আয়োজন। বাবার মুখের উপর কথা বলার আর সাধ্য হয়নি আমার। বাবার মায়া মাখানো মুখখানার উপর বলার প্রয়াস ছিলো না যে আমি বিয়ে করতে পারবো না।
আজই আমার বিয়ে। আমি বিয়ে করছি একথা শ্রুতি জানে না। জানলে হয়তো ব্যাপারটা অন্যদিকে মোড় দিতো। আমি বাবাকে শ্রুতির কথা বলতে পারি নি, এটা আমার দুর্বলতা। বাবার গ্রাম্য বন্ধুর মেয়েকে না দেখেই বিয়েতে মত দিয়েছি।
অবশ্য বাবা আমাকে বারবার কনে দেখার জন্য বলেছিলেন। কিন্তু আমি নিজের থেকেই দেখিনি। শুধু এতটুকু শুনেছি মেয়েটা শ্যামবর্ণের।
অনেকদিন পর বাড়ি ভর্তি মেহমান। বাবাকে খুব ব্যস্ত মনে হচ্ছে। এদিক-সেদিক বারবার ঘোরাঘুরি করছেন। আমি বন্ধুদের সাথে বসে আছি। আজ অনেকদিন বাদে বাবার মুখে হাসি দেখছি, স্বর্গীয় হাসির রেখা।
এই হাসির জন্য শ্রুতির মতন মেয়েকে হয়তো বিসর্জন দিয়ে গ্রাম্য একটা মেয়েকে বিয়ে করছি। তবে প্রথম প্রেমকে আমি হয়তো ভুলতে পারবো না।
বাড়িটা রাজপ্রসাদের মতন সাজানো হয়েছে। চারদিকে লাইটিং এ ভরপুর। ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে আমার ঘর। বুকের একপাশটা চিনচিন করছে। বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছি। বিবেক আমাকে প্রশ্ন করছে আমি কি চাই?
বাবার হাসিমাখা মুখ চাই, নাকি শ্রুতির ভালোবাসা চাই?
কিন্তু আমার জন্য দু'টোই প্রয়োজন। বাবার হাসিমাখা মুখখানা যেমন আমার চলার পথের পাথেয় ঠিক তেমনি সম্বল শ্রুতির ভালেবাসা আমার হৃদয়ের মন্দিরের মণিকোঠায়।
বন্ধুদেরকে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত করে আমি অন্ধকার ঘরে পরে রইলাম।
চোখ দিয়ে অঝোর নয়নে পানি ঝরছে। ইতিমধ্যে শ্রুতি বেশ কয়েকবার ফোন দিয়েছে, ইচ্ছে করেই রিসিভ করিনি। এবার আর রিসিভ না করে থাকতে পারলাম না।
কিছুক্ষণ স্বাভাবিকভাবে কথা বলার পর কেটে দিয়ে চোখ দু'টো বন্ধ করলাম। হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
চোখ খুলে দেখি বাবা আমার খুব কাছে। বাবাকে দেখে ধরপর করে বিছানায় বসে পড়লাম।
- বাবা তুমি? কখন এলে?
- এইতো কিছুক্ষণ, কি রে এভাবে ঘুমাচ্ছিসস কেন? মন খারাপ?
- না বাবা মানে?
বাবা আমার হাতের উপর তার হাতটা রেখে শক্ত করে রাখলেন।
- মায়ের জন্য মন খারাপ?
আমি কোন কথা না বলেই মাথা নিচু করে রাখলাম। বাবা আবার আমাকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ কাঁদলেন। ঘর থেকে চলে যাবার সময় বলে গেলেন,
- পুকুরঘাটে হলুদ ছোঁয়া দিবে সবাই। তাড়াতাড়ি আয় বাবা। গ্রাম তো অনেকদূরই। তাড়াতাড়ি রওয়ানা দিতে হবে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বন্ধুরা এসে লুঙি পরিয়ে দিলো। গামছাটা গায়ের উপর ছড়িয়ে দিয়ে আমাকে নিয়ে চললো পুকুরঘাটে। বারবার শ্রুতিকে মনে পড়ছিলো।
.
জমজমাট আয়োজনের মধ্য দিয়ে হলুদ ছোঁয়া পর্ব শেষ হলো। সবাই আমাকে ঘিরে কত আনন্দ করছে, আর আমি মন খারাপ করে বসে আছি। বাবাকে একটু আগে দেখলেও এখন দেখতে পাচ্ছি না। গোসলের পর্ব শেষ করো বাবাকে খুঁজতে লাগলাম। দেখি বাবা তার সেই ঘরে কার সাথে যেন কথা বলছে।
আমি আড়ি পেতে শুনতে পেলাম বাবা মাকে উদ্দেশ্য করে বলছে,
- জানো মায়া, আজকে আমাদের ছোট্ট রাজপুত্রের বিয়ে। বাড়িতে কত আয়োজন! সবাই কত মজা করছে। তবুও আমার কাছে তোমার শূন্যতা বিরাজমান। আজ সবকিছুই আছে শুধু তুমি নেই। ওর জীবনের দ্বিতীয় প্রেক্ষাপটের শুরুতে তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন ছিলো। আমাদের ছোট্ট বাবুটা আজকে অন্যকারো হয়ে যাচ্ছে। জানো মায়া, রোহান ঠিক তোমার মতই হয়েছে। বাবাকে সবসময় বুঝতে পারে। তুমি ওকে দোয়া করো মায়া, যাতে ও যাকে জীবনসাথী করে পাচ্ছে তাকে নিয়ে যেন সুখে থাকে।
বাবা কথাগুলো কেঁদে কেঁদে বলছিলেন। আমি কথাগুলো শুনে খুব দ্রুত ঘরে গেলাম। বিয়ের পোশাক রাখা আছে। সা'দ আর লিমন আমাকে কিছুটা সাহায্য করলো।
পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে অন্যান্য কাজগুলো শেষ করতে থাকলাম।
আমার ফুফুমনি বেশ কয়েকবার তাগাদা দিয়ে গেছে। সবাই কত ভালোবাসে আমাকে। অথচ আমি আছি শ্রুতির স্মৃতি নিয়ে। হৃদয়ের দরজায় শ্রুতির ছবিটা বারবার ভেসে উঠে বলছে,
'ঠকবাজ, আমাকে তুমি ঠকালে? আমার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেললে? আমি তো তোমায় ভালোবাসতে চাই নি। তুমিই প্রোপোজ করেছিলেন প্রথম। তবে কেন?'
এসব ভাবতে ভাবতে বাবা ঘরে ঢুকলেন, আমি বাবাকে দেখে চোখের পানি মোছার চেষ্টা করলাম।
বাবা বেশি কিছু টের পেলেন না। বিয়ের মুকুটটা আমার মাথায় পরিয়ে দিয়ে হাসার চেষ্টা করলেন। মুচকি হেসে বললেন, 'বাহ! আমার ছোট্ট রাজপুত্রকে তো অনেক সুন্দর লাগছে।'
বাকিটা বাবা সাজিয়ে দিয়ে নিচে নিয়ে চললেন। এই অমতের বিয়েতে একমাত্র প্রাপ্তি বাবার মুখের হাসি। আমি যতটা অসুখী বাবাকে তারচেয়েও বেশি সুখী মনে হচ্ছে।
আমি বাবার সাথে এক পা দু'পা করে নিচে নেমে গাড়ির দিকে অগ্রসর হলাম। গাড়িগুলোও বর্ণিল রঙে সাজিয়েছে। ঘটা করে সাজিয়েছে আমার গাড়িটা।
আমি গাড়িতে উঠে বসলাম, বাবা আমার ডানদিকে বসলেন। ফুফুমনি আমার বামদিকে বসলেন। একে একে সব গাড়ি ছেড়ে দিলো। বাবা একেরপর এক কথা বলেই যাচ্ছেন। আমার বাবা হলেও বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আমাদের মধ্যে।
বাবা মায়ের সাথে তার বিয়ের কয়েকটা মজার স্মৃতি গাড়ির মধ্যেই বলে ফেললো। হাস্যকর ছিলো বলে আমি মন খারাপের মধ্যেই হেসেছিলাম। ফুফুমনি বাবাকে থামতে বলে বাবা থেমেছেন নতুবা গড়গড় করে আরো কিছু বলতেন শিউর।
.
মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে ফাতেমা। বাবা যতটা বলেছেন তার থেকে মেয়েটা বেশ ভালো। মেয়েটা বাসর ঘরে বসে আছে। আমি মুকুটটা খুলে ছাদে গেলাম। সবকিছু ঠিকঠাক মিটে গেছে। ফাতেমাকে কিছুই বলিনি।
বাবা হয়তো শত ব্যস্ততা শেষ করে ঘুমিয়ে গেছেন। আমি ছাদে দাঁড়িয়ে রাতের আকাশে মাকে খোঁজার চেষ্টা করছি। শ্রুতিকে যেমন মনে পড়েছিল ঠিক তেমনি মায়ের কথাও মনে পড়ছিলো।
হয়তো মা বেঁচে থাকলে তার সাথে সব কিছু শেয়ার করতে পারতাম কিন্তু তিনি তো আমাকে জন্ম দিয়েই সব দায়িত্ব চুকিয়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। রাতের আকাশটা বেশ লাগছিলো। হালকা বাতাসে মনটা সতেজ লাগছিলো।
নাহ! আর থাকা যাবে না। ফাতেমাকে সব কথা বলতে হবে। মেয়েটা হয়তো এখনো ঘুমায়নি।
যা সন্দেহ করেছিলাম তাই সঠিক হলো। দেখলাম লম্বা ঘোমটা টেনে শতফুলের মাঝে বসে বসে হয়তো তার প্রিয়তমের জন্য অপেক্ষা করছে।
আমি কার কাছে গিয়ে বসলাম। ফাতেমা একটু নড়েচড়ে বসে আমাকে সালাম দিলো।
আমি সালামের জবাব দিয়ে সবটা ওকে বুঝিয়ে বললাম। আমার কথাগুলো শুনে ফাতেমা ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদতে লাগলো। আমি ওকে চুপ করে থাকতে বললাম।
ফাতেমা বললো,
- আপনার ভালোবাসার মানুষের জন্য কেন আমাকেই শাস্তি দিচ্ছেন? আপনি তো আগে আমাকে বলতে পারতেন।
- আমি বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারি নি। বাবা যতদিন বেঁচে আছে ততদিন তুমি এখানে বউয়ের মতো থেক। তোমার কাছে এটাই আমার আরজি। আশা করি সেটা তুমি ফেলবে না।
- আপনি আমার স্বামী, বিয়ে যখন করেছেন তখন আমিই আপনার স্ত্রী। আপনি যা বলবেন সেটাই হবে। তবে আমি নিরাশ হবো না। কারণ আল্লাহ কাউকে নিরাশ করেন না।
মেয়েটার কথা শুনে ইসলামীক মাইন্ডের মনে হলো। আমি যা চাই কার সবকিছুই পেলাম। শুধু তাকেই ভালোবাসতে পারবো না। আমার ভালোবাসা শুধু শ্রুতির জন্য। আমার প্রথম ভালোবাসার জন্য।
আমি পাঞ্জাবি পরিবর্তন কর সোফায় ঘুমিয়ে পড়লাম। ফাতেমাকে দেখলাম তাহাজ্জুদ পড়তে। তাহাজ্জুদ পড়ে সেও ঘুমিয়ে পড়লো। আমি বুঝতে পেলাম বাসর ঘরে আমার এই কথাগুলো তাকে কতটা কষ্ট দিয়েছে।
কিন্তু তাকে তো মিথ্যা আশা দিবো রাখতে পারবো না। একটা মেয়ে বাসর ঘরে তার স্বামীর ছোঁয়া চায়, ভালোবেসে কাছে পেতে চায়, ভালোবাসায় হারিয়ে যেতে চায়। কিন্তু এসবের পরিবর্তে তাকে নিজের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলাম।
(চলবে)
গল্প: ভালোবাসা ভালোবাসা
পর্ব:৩
.
.
শুরু হলো ফাতেমা আর আমার নতুন যুদ্ধ। যুদ্ধ না বলে একে অন্য নামে ডাকার মতন নাম আমার হৃদয়ে আবিষ্কৃত হয়নি। ফাতেমা অনেক ভালো মেয়ে। পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করে, নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়ে, বাবার সেবা করে।
আড়ালে থেকে আমারো সেবা করাটা ছাড় দেয় না।
গোসলের সময় তোয়ালে, প্যান্ট, শার্ট রেডি করে দেয়া কিংবা মানিব্যাগের টাকা পয়সা নিছি কিনা সব দেখে দিবে।
আমি চুপ করে শুধু দেখে যেতাম।
শ্রুতির আগে ফাতেমাকে দেখলে হয়তো ওকে ভালোবাসায় আঁকড়ে রাখতাম। বাবা ফাতেমাকে পেয়ে আনন্দে গদগদ। নিজের মেয়ে পায়নি, তাই হয়তো ফাতেমাকে দিয়ে সবটা পূরণ করছে।
ফাতেমাও বাবার পছন্দ করা সবকিছু সবসময় করার চেষ্টা করে। ফাতেমা সংসারে আসার পর থেকে বাড়ির দারুন পরিবর্তন ঘটেছে। চাকর-বাকর থেকে শুরু করে বাবা পর্যন্ত সবাই নামাযী হয়েছে।
শুধুমাত্র দু'জন একে অপরের সাথে কথা বলিনা বলে হয়তো আমাকে বলতে পারে নি। বাড়িতে হয়তো বাবাকে আর শূন্যতা গ্রাস করতে পারে না। বাবাকে আনন্দে দেখে বেশ ভালো লাগে আমার।
অফিসের সব কাজ আমার হাতে বুঝিয়ে দিয়ে আজ তিনি যে নিশ্চিন্ত। কত করে বললাম অর্ধেকই থাক, কিন্তু কে শোনে কার কথা। ফাতেমা সবাইকে নিয়ে বেশ সুখেই আছে। আমি আছি শ্রুতিকে নিয়ে।
বিয়ের কয়েকদিনের মাথায় নিজ হাতে রান্নাবান্নার কাজ শুরু করে ফাতেমা। প্রথম রান্না খেয়ে বাবা কিছুক্ষণ থ হয়ে ছিলো। চেটেপুটে খুব দ্রুত খেয়ে বলেছিলো,
- ঠিক আমার মায়ের মতন রান্না। আহা! মা জননী কি খাওয়াইলি।
আমার দিকে বাবা আড়চোখে বাবা তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। বাবার এই চাহনি কথা আমি ঢের বুঝতে পেলাম। তিনি বলছেন, 'বাবাজি, তোমার জীবন স্বার্থক।'
আমি একটু রাগত ভঙ্গিতে খাওয়া শুরু করলাম। বাহ! বেশ রেঁধেছে মেয়েটা। আমি মেকি হেসে বাবার দিকে তাকালাম।
বুঝতে পেলাম বাবার দিকে দেখলে আবার তার দৃষ্টি দিয়ে কোন কিছু বোঝাবে। তাই সেদিকে না তাকিয়ে খাবারটুকু সাবাড় করে অফিসের দিকে ছুটলাম।
আজকাল বাবা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে মাথায় টুপি দিয়ে বারান্দায় তার বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয় নতুবা ফুলগাছে পানি দিয়ে সময় কাটায়।
বাবাকে দেখলে সহজেই বোঝা যায় তিনি বহুদিন পর সুখে আছেন, বেশ সুখে আছেন। হয়তো এই সুখটুকু মহান আল্লাহ তায়ালা ফাতেমার মাধ্যমে এই সংসারে পাঠিয়েছেন। বাবার পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করার কয়েকদিন পর বাবা কথার ছলে বলেই ফেললেন, 'রোহান বাবা এবার বাড়িতে নতুন অতিথি নিয়ে আয়। সংসারটা আরো ভরে উঠুক।'
বাবা জানে না ফাতেমার সাথে আমার কি সম্পর্কের বেড়াজাল। এই কয়েকমাসে ফাতেমা ছুঁই নি পর্যন্ত।
.
সেদিন ঘটলো এক আশ্চর্য ঘটনা। আমি গোসল সেরে মাত্রই রুমে এসেছি, সেসময় ফাতেমা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো। দেখলাম বিছানার উপর একটা ডায়েরী।
ডায়েরীতে সুন্দর করে লেখা,
'আপনার কাছে একটা জিনিষ চাইবো, দিবেন তো?'
আমি উক্ত কথাটার নিচে লিখলাম,
'হ্যাঁ বলো।'
কথাটা লিখেই অন্য সাইটে দাঁড়িলাম। ফাতেমা আমার সাথে কথা বলে না। আমিও বলি না। হয়তো ও আমার সাথে কথা বলার জন্য ছটফট করে কিন্তু আমি সুযোগ দেইনি।
দেখলাম আমার কথার নিচে লিখলো,
' আপনি পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়বেন নিয়মিত? আমি তো আপনার শর্ত পূরণ করছি, আমার একটা আবদার রাখা যায় না?'
আমি লেখাটা দেখে কিছু না লিখে সকালের নাস্তা করে অফিসে বের হলাম। মেয়েটা হয়তো কিছুটা দুঃখ পেয়েছে।
আমার অনুধাবন সঠিক হলো অফিস থেকে ফিরে এসে। টেবিলের উপর ডায়েরীটা খুললাম, ফাতেমা ঘুমিয়েছে।
ডায়েরীর পাতা যে ভেজা তা সহজেই বুঝতে পেলাম। লেখাগুলো অস্পষ্ট হয়ে গেছে।
বুঝলাম মেয়েটা কেঁদেছে। আমি কোন ভ্রুক্ষেপ না করে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরদিন সে একবারো আমার দিকে তাকালো না। এমনিতে কাজের ছলে আমার চারদিকে ঘুরঘুর করতো, আর আজ! ওর ঘুরঘুর করাটা আমাকে বিরক্ত না লেগে বেশ ভালোই লাগতো। কিন্তু আজ ঘুরঘুর করাটা বড্ড মিস করছি।
অফিসে এসে মনটা ভালো লাগছিলো না। বারবার ফাতেমান শ্যামবর্ণ মুখটা ভেসে আসছিলো।
শ্যামবর্ণ হলেও ফাতেমা দেখতে বেশ। আজ কিছুটা একটা আমাকে ভাবাচ্ছে, খুব ভাবাচ্ছে।
আজ না হয় কাল তো আল্লাহর আদেশ পালন করতেই হবে। শুনেছি যুবক বয়সে আমল করলে অনেক বেশিই নেকি পাওয়া যায়। অন্ধকারের পথ থেকে আলোতে আসলাম।
আমার পরিবর্তন দেখে ছোট্ট একটা চিরকুট লিখলো ফাতেমা। যা আমি আমার মানিব্যাগে পেয়েছিলাম,
'ধন্যবাদ আমার আবদারটুকু পূরণ করার জন্য। আপনার পছন্দের তারিফ করতে হয় রোহান সাহেব। আপনার শ্রুতি দেখতে অনেক সুন্দর।'
শ্রুতির সৌন্দর্যের বর্ণনা দেখে হঠাৎ চোখ গেলে মানিব্যাগের একটা তাকের দিকে। সেখানে যে শ্রুতির ছবি রাখা আছে। আমি সরিয়ে রাখতে ভুলে গিয়েছিলাম।
এজন্য আমার মনে কোন দুঃখ নেই, সে তো জানে শ্রুতিকে আমি ভালোবাসি, কতটা ভালোবাসি!
আমি শ্রুতির দিকে ঝুঁকে থাকলেও ফাতেমা ঝুঁকেছে সংসারের দিকে। ভাঙা মচকানো সংসারটাকে আবারো উদ্ধার করছে। শূন্য বাড়িটা আবারো ভরিয়ে তুলেছে। যে বাড়িতে সুখের কমতি ছিলো সেখানে আজ সুখের ছায়া বিরাজমান।
শুধু আমি ফাতেমার পাশে থাকলে হয়তো পরিবেশটা মধুর হতে পারতো। ফাতেমা সেটা চায়, তাহাজ্জুদের সময় সে কাঁদে। আমি ঢের বুঝতে পারি।
.
শ্রুতির সাথে সময়টা ভালো যাচ্ছে না। শ্রুতি বিয়ের জন্য তাগাদা দিচ্ছে। অথচ আগে বলেছিলো এক বছর পর বিয়ে করবে। কিন্তু আমার বাবা তো জানে না।
জানলে হয়তো তার মুখের অশান্ত ছাপ ফুটে উঠবে। ফাতেমার সাথে বিয়ের ৭মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। কিছু বুঝতে পারছি না কি করবো। বেলকনিতে বসে ভাবছি, বাবা বাড়িতে নেই। ফাতেমার বাবার সাথে দেখা করার জন্য গ্রামে গেছে।
আমাকে সবকাজ বুঝে দিয়ে বাবা স্বাধীন। অনেক পুরোনো আত্মীয় তার জেগে উঠেছে। আমি মনে মনে ভাবি, 'তিনি এসব করে সুখে থাকলেই আমার সুখ।'
আগামীকাল শ্রুতির সাথে আমার প্রথম রিলেশনশিপ ডে। সে আমার কাছে স্বর্ণের আংটি আবদার করেছে। টাকা পয়সার কোন অভাব নেই আমার।
একটা নেকলেস আর আংটি গিফট দিব বলে ভাবছি। অর্ডার করাও শেষ।
প্রথম রিলেশনশিপ ডে কেমন হবে তা নিয়ে বেশ চিন্তিত আমি। ফাতেমা ইতিমধ্যে এক কাপ কফি দিয়ে ঘরে শুয়ে পড়েছে।
আমার দুই পৃথিবী, ভালোবাসার মানুষ শ্রুতি আর বিয়ে করা বউ ফাতেমা। দু'জনকেই নিয়ে চিন্তিত আমি। পায়চারী করতে লাগলাম। সবাই ঘুমিয়ে শুধু আমিই জেগে আছি।
হাঁটতে হাঁটতে বাবার সেই ঘরের সামনে আসলাম।
যেখানে বাবা প্রায় সময় বসে থাকেন। আজকে সাহস করে ঢুকলাম। সুন্দর করে সাজানো ঘরটাতে চারদিকে মায়ের ছবি।
কখনো বাবার সাথে বা কখনো ছোট্ট রোহানের সাথে। সব পুরনো জিনিষপত্র সবটা এই ঘরে। হয়তো বাবা-মায়ের সাংসারিক জিনিষপত্র হবে।
এতদিনেও বাবা সবকিছু ঠিকঠাক আগলে রেখেছে। আর আমি! দু'পৃথিবীর চাপে দু'দিকে ঘুরছি।
সত্যিই আমি স্বার্থপর। ফাতেমার কাছে দিনদিন অপরাধ করেই যাচ্ছি। মেয়েটা নিতান্তই ভালো বলে সবকিছু মুখ বুঝে সহ্য করে।
হয়তো ফাতেমার জায়গায় অন্যকেউ হলে একদিনে সংসার করার পরিবর্তে মামলা করে ছেড়ে দিতো।
যাইহোক প্রথম রিলেশনশিপ ডে টা বেশ ভালোভাবেই হয়ে গেল। শ্রুতি অতিরিক্ত নেকলেসটা পেয়ে আমার অতি কাছে এসে কিস করার চেষ্টা করছিলো।
কেন জানি কি আমায় নিষেধ করলো। আমি তাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে বললাম,
- এখন সব নয় শ্রুতি, বিয়ের পর।
- এটা মোহ নয় রোহান। আমার ভালোবাসা।
- এসব না হয় বিয়ের পরের জীবনের জন্য তোলা রইলো।
আমার কথায় কিছু না বলে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো, 'রোহান তুমি এত সরল কেন? এজন্যই বুঝি তোমাকে আমার ভালো লাগে।'
শ্রুতির কথাই কি সত্যি? আসলেই কি আমি সরল?
.
লেখা: সাজ্জাদ আলম বিন সাইফুল ইসলাম
āĻোāύ āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āύেāĻ:
āĻāĻāĻি āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āĻĒোāϏ্āĻ āĻāϰুāύ