#শ্রাবণী
#২১তম পর্ব
প্রায় একমাস হল শ্রাবণী গ্রামের বাড়িতে দাদা দাদির কাছে রয়েছে।আফজাল পল্লব কে ঢাকায় দিয়ে এসেছে।আজ জহির উদ্দিন দুটো চিঠি পেয়েছেন।একটা শ্রাবণীর অন্যটা তার।তিনি নিজের চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করলেন-
বাবা ও মা,
আপনাদের পবিত্র কদমে আমার সালাম গ্রহন করবেন।আমরা সবাই ভালো আছি।আশা করি শ্রাবণী ও আপনারা ভালো আছেন।শ্রাবণীর ব্যাপারটা তো জানেন।আপনারা যাওয়ার পর কয়েকটা ভালো পাত্র পেয়েছি,কিন্তু ওকে রাজি করাতে পারিনি।ইদানিং একটা ভালো সম্বন্ধ এসেছে।তারপর আমেরিকা প্রবাসী একটা ছেলের বর্ননা দিলেন।তারপর জহির উদ্দিনকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন,আপনারা ওকে ছেলের সব জানিয়ে বুঝিয়ে রাজি করিয়ে অতি সত্বর নিয়ে আসবেন।
আপনি আমান নামে একটা ছেলের খোঁজখবর নিতে বলেছিলেন,নিয়েছি।ছেলের বাবার নাম রশিদুল ইসলাম।বছর চারেক আগে সন্ত্রাসীদের হাতে মারা গেছেন।আমান তার একমাত্র সন্তান।রশিদুল সাহেব বিয়ের পর প্রায় ১৫ বছর নিঃসন্তান ছিলেন।একদিন এক ফকির এসে তার অফিসে ঢুকে পড়ে।দারোয়ান বাধা দিয়ে আটকাতে পারেনি।ফকিরটা বাধা ঠেলে রশিদুল সাহেবের রুমে ঢুকে বলে আমার বেশ কিছু টাকা খুব দরকার।আপনি দেন।ততক্ষনে দারোয়ান ও স্টাফরা ফকিরটাকে ধরে নিয়ে যেতে চাইলেও তাকে একটুও নড়াতে পারে নি।রশিদুল সাহেব দৃশ্যটা দেখে খুব অবাক হয়ে ভাবলেন,ইনি হয়তো সত্যিই আল্লাহর ফকির।ফকিরকে ছেড়ে দিয়ে সবাইকে চলে যেতে বললেন।
সবাই চলে যাওয়ার পর ফকিরকে বললেন,আপনার কত টাকা দরকার?
যা চাইব তা দেবেন তো?
সাধ্যের মধ্যে হলে নিশ্চয় দিবো।
আপনার কথা শুনে খুশি হলাম।টাকা দিতে হবে না।আল্লাহ মানুষের দিলের খবর জানেন।দোয়া করি,আল্লাহ আপনার ঘরে আওলাদ দিক।তারপর হো হো করে হেসে বলল,আল্লাহ যে আওলাদই দিক না কেন,তাকে মাদরাসার পড়াবেন।আবার হো হো করে হেসে ছুটে বেরিয়ে যায়।
.
এ ঘটনার একবছর পর আমান জন্মায়।ছেলেক রশিদুল সাহেব প্রথমে হাফেজ করেন,তারপর আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি করান।তারপর আলিয়া থেকে পাস করে ঢাকা ভার্সিটি থেকে ইংলিশে অনার্স নিয়ে মাস্টার্স পড়ছিল,সেই সময় রশিদুল সাহেব বাড়ি তৈরির কাজ করছিল।সন্ত্রাসীরা একদিন বাসায় এসে রশিদুল সাহেবের কাছে এক লক্ষ টাকা দাবি করে।তিনি অস্বীকার করলে সন্ত্রাসীরা তাকে গুলি করে খুন করে।
সন্ত্রাসীরা যখন বাসায় ঢুকে তখন আমান রুমে ছিল।আয়ার মুখে কয়েকটা ছেলে এসে বাবার কাছে ১লক্ষ টাকা দাবি করেছে শুনে তাড়াতাড়ি এসে ড্রইংরুমের পর্দা ফাঁক করে তাদের প্রত্যেকের হাতে রিভালবার দেখে ঢুকল না।জানালার পর্দা যখন ফাঁক করল ঠিক তখনই পল্টু গুলি করে তার বাবাকে খুন করে সবাইকে নিয়ে চলে যায়।
পল্টু রাজনীতি করত।আমানের কাছ থেকে মাঝেমাঝে টাকা ধার নিলেও তা আর কখনো শোধ দেয়নি।আমান মাঝেমাঝে তাকে রাজনীতি ছেড়ে মন দিয়ে পড়াশোনা করতে বলত শুনে পল্টু হাসত।
সেই পল্টুকে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে নিয়ে তার বাবাকে খুন করতে দেখে আমান কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কিছুক্ষন স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে রইল।তারপর রুমে ঢুকে দেখল,বাবার নিথর দেহটা রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।বাসার কাজের মেয়ে ও দারোয়ান হাও মাও করে কাঁদলেও মা বাবার পাশে বসে নির্বাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে।চোখে একফোঁটা পানি পর্যন্ত নেই।
আমান থানায় ফোন করে ঘটনা জানালে পুলিশ আসে এবং পুলিশকে স্টেটমেন্ট দেয়ার সময় পল্টুর সব কিছু জানায়।পুলিশ পল্টুকে ধরে রিমার্ন্ডে নিয়ে সবার ঠিকানা জেনে তাদেরকেও এরেস্ট করে।মামলা চলার সময় আমান র্কোটে পল্টুকে শনাক্ত করায় তার যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়।আর তার সঙ্গীদের মধ্যে দুজনের দশ বছরের জেল হয়।বাকি দুজন বেকসুর খালাস পেয়ে যায়।
যারা ছাড়া পেয়ে গিয়েছিল,তারা আমানকে খুন করার জন্য তাকে অনুসরন করত।আমানের মা শারমীনের সামনে রশিদুল সাহেবকে সন্ত্রাসীরা খুন করে।সেই দৃশ্য দেখে তিনি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন।অবশ্য কিছুদিন পর বাকশক্তি ফিরে পান।আমানের এক মামা ব্যবসার হাল ধরেন।একদিন সন্ত্রাসীরা আমানকে রাস্তা থেকে জিপে তুলে মেয়ে ফেলার জন্য এক নির্জন জায়গায় নিয়ে যায়।গুলি করার আগে এক ফকির সন্ত্রাসীদের চোখে বালি ছুড়ে মারে।সন্ত্রাসীরা চোখের বালি পরিষ্কার করে দেখল,আমান ও ফকির কেউ নেই।
তারপর ২বছর আমানের খোঁজখবর পাওয়া যায়নি।তার মামা আমার কলেজ জীবনের বন্ধু ছিল।তারপর তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ ছিল না।কয়েক মাস আগে হঠাত্ একদিন এক শপিং সেন্টারে দেখা।তারপর একটা রেস্টুরেন্টে নাস্তা করার সময় আলাপ করি।তারপর থেকে মাঝে মাঝে সে আমাদের বাসায় আসে, আমরা তার বাসায় যাই।আপনার চিঠি পেয়ে একদিন তাকে বললাম,আমাদের গ্রামের মসজিদে আমান নামে এক ছেলে খাদেমের চাকরি করে।বাবা তার মা বাবার খোঁজ নিয়ে জানাতে বলেছেন।শুনে জামাল বলল,তোমাদের গ্রামের নাম কি?বললাম রইসপুর।গ্রামের নাম শুনে জামাল হেসে উঠে বলল,সে তো আমার ভাগনা।অবাক হয়ে বললাম,তোমার ভাগনা পাড়াগাঁয়ে চাকরি করছে কেন?জামাল তখন পুরো হিস্ট্রি বলল।আরো বলল,সেই ফকিরের হুকুমেই নাকি আমান ওখানকার মসজিদে খাদেমের চাকরি করছে।বছরে তিন চারবার খুব গোপনে এসে আমাদের সঙ্গে দেখা করে যায়।
আর বিশেষ কি লিখব,আশা করি,শ্রাবণীকে রাজি করিয়ে নিয়ে আসবেন।আপনাদের পবিত্র কদমে আবার সালাম জানিয়ে শেষ করছি।
ইতি
আপনার ছেলে
.
চিঠি পড়ে জহির উদ্দিন বুঝতে পারল,আজ পর্যন্ত আমান কেন তার পরিচয় গোপন করেছে।আমানের সবকিছু জেনে খুব আনন্দিত হয়ে শুকরিয়া আদায় করলেন।তারপর চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আমেরিকা প্রবাসী ছেলের সঙ্গে আমানের তুলনা করছিলেন।এমন সময় শ্রাবণীর গলা শুনতে পেলেন,চেয়ারে ঘুমাচ্ছেন কেন?শরীর খারাপ লাগছে?
জহির উদ্দিন কথা না বলে চোখ খুলে নাতনীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন,,,,,,
(চলবে)
#শ্রাবণী
#২২তম পর্ব
-আতঙ্কিত হয়ে শ্রাবণী কিছু বলতে গিয়ে কোলের উপর দুটো খাম দেখে বলল,কোনো দুঃসংবাদ আছে না কী?
-জহির উদ্দিন প্রথমে তাকে তার চিঠিটা দিয়ে বলল,তোমার বাবার চিঠি।তারপর নিজেরটাও দেয়ার সময় বলল,এটা আমাকে দিয়েছে।
-শ্রাবণী সামনের চেয়ারে বসে প্রথমে দাদুর চিঠিটা পড়তে গেলে জহির উদ্দিন বলল,আগে নিজেরটা পড়,তারপর আমারটা।
-শ্রাবণী দাদুরটা টেবিলের ওপর রেখে নিজেরটা পড়তে গিয়ে বুঝতে পারল,প্রেরকের ঠিকানায় বাবার নাম থাকলেও মা লিখেছে।
চিঠিতে তার মা আমানের সাথে কম কম ঘুরে বেড়াতে বলেছে।
আমেরিকা প্রবাসী ছেলের প্রস্তাবে সে যেন রাজি হয় সেসব বলেছে।
আর পাড়াগাঁয়ের মানুষ যে মেয়েদের বেপর্দা পছন্দ করেন না ,এমনকি কুত্সাও রটায় সেসবকিছু চিঠিতে উল্লেখ করেছে।
নিজের চিঠি শেষ করে দাদুর মুখের দিকে জিঙ্গাসু দৃষ্টিতে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল।
-জহির উদ্দিন তার মুখ দেখে বুঝতে পারল,তাকেও বিয়ের ব্যাপারে কিছু লিখেছে।বলল,আমার চিঠিটা পড়।তারপর যা বলার বলো।
-দাদুর চিঠি পড়ে শ্রাবণী মাথা নিচু করে অনেকক্ষন চুপচাপ বসে রইল।ভাবল,আমান তাহলে বাবার বন্ধু জামাল চাচার বোনের ছেলে?
-আমেরিকা প্রবাসী পাত্রের কথা ও আমানের পরিচয় জেনে নাতনীর মনের অবস্থা কিছুটা আন্দাজ করতে পারলেও কি বলে শোনার জন্য জহির উদ্দিন তার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন।
-এক সময় শ্রাবণীর চোখ থেকে টপটপ করে পানি তার কোলের ওপর পড়তে দেখে জহির উদ্দিন বলল,কাঁদছ কেন?মা কি তেমন কিছু লিখেছে?
-চোখ মুছে শ্রাবণী বলল,না,মা তেমন কিছু লিখে নি।
-তাহলে চোখে পানি কেন?
-বিয়ের কথা শুনলেই সেই দুর্ঘটনার কথা মনে পড়ে ।তখন নিজেকে সামলাতে পারি না।কেবলই মনে হয়,অপবিত্র মেয়ে হয়ে কি করে একজন পবিত্র ছেলেকে বিয়ে করে ঘর সংসার করব।তাছাড়া স্বামী যদি কখনও আমার অতীতের দুর্ঘটনার কথা জেনে যায়,তাহলে কি ঘটবে?তখন শুধু যে আমাকে ঘৃনা করবে তা নয়,ডিভোর্সও দেবে।মা বাবা ও আপনাদের সবাইকে অপমান করতেও ছাড়বে না।তারপর সিদ্ধান্তের কথা বলে বলল,এ ব্যাপারে আপনার মতামত জানতে চাই।
-চুপ।
-চুপ করে আছেন কেন?কিছু একটা বলুন।
-এ ব্যাপারে পরে আলাপ করব।এখন তোমার দাদিকে তিন কাপ চা করে নিয়ে আসতে বলে এস।
-আমরা তো দুজন,তিন কাপ কেন?
-যিনি বানিয়ে আনবেন,তিনিও খাবেন।
-শ্রাবণী হাসি মুখে বলল,ও তাই বলুন।আমি মনে করেছিলাম,এই সময়ে কারো আসার কথা আছে হয় তো।
-হ্যাঁ,একজন আসার কথা থাকলেও তিনি আসতে পারবেন না।
-তিনিটা কে?আর আসার কথা থাকলেও আসবেন না,তা আপনি জানলেন কিভাবে?
-তুমিতো অনুমান করতে পার,এটাও অনুমান করে বল।
-পল্লব চলে যাওয়ার পর থেকে আমান আসেনি।তাই শ্রাবণীর বেড়ানো বন্ধ হয়ে গেছে।তার না আসার কারন ভাবতে গিয়ে মনে হয়েছে,সে বেপর্দা হয়ে যায় বলে তাকে নিয়ে বেড়াতে চায় না।তবে দাদুর কাছে জিঙ্গেস করে জেনেছে,মসজিদের কাজে ব্যস্ত আছে,তাই আসে নি।কি কাজে ব্যস্ত দেখার জন্য ইচ্ছা হলেও দাদু কিছু মনে করতে পারেন ভেবে যায়নি।কেন কি জানি এই কয়েক দিন আমানকে না দেখে তাকে দেখার ইচ্ছা ক্রমশ বাড়ছে।তাই এখন দাদুর কথা শুনে আমানের নাম মুখে এসে গিয়েছিল।সামলে নিয়ে বলল,কার আসার কথা ছিল অনুমান করে বলতে পারব না।
-তাহলে ওকথা বাদ দাও,আমানের কথা বল।
-দাদুর চিঠিতে আমানের সবকিছু জেনে শ্রাবণীর মনে অজানা এক শিহরণ বইতে শুরু করে।দাদু যেন বুঝতে না পারে সেজন্য এতক্ষন নিজেকে সামলে রেখেছিল।দাদু আমানের কথা বলতে মনের শিহরণ চোখে মুখে ফুটে উঠল।কিছু বলতে গেলে গলা কেঁপে যাবে ভেবে চুপ করে রইল।
-নাতনীর চোখ মুখে আনন্দের ছটা দেখে যা বোঝার বুঝে গেলেন জহির উদ্দিন।মনে মনে খুশি হয়ে বলল,কি ব্যাপার?কিছু বলছ না কেন?
-শ্রাবণী সামলে নিয়ে বলল,তার কথা আমি কি বলব?বাবা তো তার সম্পর্কে সবকিছু লিখে জানিয়েছে আপনাকে।
-তাইতো তার সম্পর্কে তোমার মুখে কিছু শুনতে চাই।
-তার সঙ্গে কয়েকদিন বেড়াতে গিয়ে যতটুকু জেনেছি,তাতে এই রকমই কিছু অনুমান করেছিলাম।
-আমানের প্রতি নাতনী যে একটু এগোচ্ছে,তা তার কথাবার্তায় জহির উদ্দিন আগেই বুঝতে পেরেছিলেন।কতটা এগিয়েছে জানার জন্য বললেন,অনুমানটা সত্য জেনে নিশ্চয় খুশি হয়েছ?
-দাদুর চালাকি শ্রাবণী ধরতে পারল না।বলল,হ্যাঁ,খুব খুশি হয়েছি।পরক্ষনে দাদুকে মৃদু হাসতে দেখে তার চালাকি বুঝতে পেরে তার চালাকি বুঝতে পেরে লজ্জায় মাথা নিচু করে নিল।
-অল্পক্ষন অপেক্ষা করে জহির উদ্দিন,আমেরিকা প্রবাসী ছেলেটাও খুব ভালো,তাই না?
-মা বাবা যখন ভালো বলেছেন তখন নিশ্চয়ই ভালো।
-আমানের চেয়ে ভালো?
-আমানের সঙ্গে মেলামেশা হলেও তার সঙ্গে তো আর হয়নি।বলব কি করে?
-তাহলে এক কাজ করা যাক,কালই আমরা ঢাকা যাই।ছেলেটার সঙ্গে আলাপপরিচয় করলেই জানা যাবে কতটা ভালো।
-আমানের সবকিছু জানার পর তার সঙ্গে দেখা করার জন্য শ্রাবণীর মনের মধ্যে খুব অস্থিরতা অনুভব করছে।ঢাকায় যেতে ইচ্ছা করল না।চিন্তা করল,না গেলে দাদু হয়তো ভাববেন,আমান তার মনে দাগ কেটেছে।তাই বলল,কাল নয়,তিন চারদিন পর যাব।
-নাতনীর কথা শুনে জহির উদ্দিন ভাবলেন,এর মধ্যে আমানের সঙ্গে দেখা করতে চায়।হঠাত্ মনে পড়ল,আজ শাবান চাঁদের তেরো তারিখ।আমার মনেই ছিল না দু দিন পর শবে বরাত।ঠিক আছে তিন চারদিন পরেই না হয় যাব,,,,,,,
(চলবে)
ভালো লাগলে জানাবেন,,তাহলে তাড়াতাড়ি লেখার চেষ্টা করব।
#শ্রাবণী
#২৩তম পর্ব
আজ শুক্রবার শাবান চাঁদের চৌদ্দ তারিখ।
চৌদ্দ তারিখে দাদা দাদি রোযা রেখেছেন জেনে শ্রাবণী তাদেরকে জিঙ্গেস করল,এখন তো রোযার মাস না,তবু আপনারা রোযা রেখেছেন কেন?
-জহির উদ্দিন দুদিন রোযা রাখার ও চৌদ্দ তারিখের দিনগত রাত্রে অর্থাত্ পনের তারিখের রাতের ইবাদাতের ফজিলতের কথা বল বললেন,তুমিতো ইসলাম সম্পর্কে একরকম কিছুই জান না।এখানে আসার পর আমার কাছ থেকে হাদিসের বই নিয়ে পড়েছ।আরো পড়ো,সবকিছু জানতে পারবে।
.
শবে বরাতের রাতে এশার নামায পড়ে আমান জহির উদ্দিনের সঙ্গে খেতে এল।তিনি তাকে সদরবাড়িতে বসতে বলে ভেতর বাড়িতে গিয়ে দেখলেন,শ্রাবণী দাদির সঙ্গে গল্প করছে।তাকে উদ্দেশ্য করে বলল,কি দাদু,দাদির সঙ্গে কি এত গল্প করছ?
-শ্রাবণীর আগে তাবাসসুম বিবি বলল,গল্প নয়,আজকের রাতে শবেবরাতের নামাযের নিয়ম শিখছে।
-আলহামদুলিল্লাহ,শুনে খুব খুশি হলাম।তারপর বললেন,লক্ষ লক্ষ রাকাত নফল নামায এক রাকাত ফরজ নামাযের সমান নয়।তাই বলছি,ফরজ নামাযও শিখে পড়তে -আলহামদুলিল্লাহ,শুনে খুব খুশি হলাম।তারপর বললেন,লক্ষ লক্ষ রাকাত নফল নামায এক রাকাত ফরজ নামাযের সমান নয়।তাই বলছি,ফরজ নামাযও শিখে পড়তে শুরু কর।
-শ্রাবণী বলার আগে তাবাসসুম বিবি বললেন,শুনে তুমি আরো খুশি হবে,ও আমার কাছে নামায শিখে আজ ৫,৬দিন হল ফরজ নামাযও পড়ছে।
-জহির উদ্দিন আর একবার আলহামদুলিল্লাহ বলে বললেন,আল্লাহ আমাদের সবাইকে দ্বীনকে জানার ও সেই মতো আমল করার তওফিক দান করুন।
-তিনি থেমে যেতে শ্রাবণী বলল,হ্যাঁ দাদু,আপনার ও দাদির কাছে নামাযের কথা শুনে আমি নামায পড়ার প্রেরণা পাই।আমানও একদিন মেয়েদের পর্দার সম্পর্কে অনেক কথা বলেছিলেন।হাদিসেও সে সব পড়েছি।তাই ভাবছি বাইরে যাওয়ার সময় পর্দা ব্যবহার করব।
-তাই নাকি তাহলে বোঝা যাচ্ছে খুনি নরপশু আমান তোমাকে গ্রাস করতে শুরু করেছে।
-দাদুর কথার শ্রাবণী লজ্জা পেয়েও বলল উনি খুনি নরপশু হতে যাবেন কেন?সেই খুনি নরপশুটার মতো আমান অনেকটা দেখতে।তাই তাকে সন্দেহ করেছিলাম।আমার সন্দেহটা যে ভুল,তা তো আপনাকে বলেছি।তবু তাকে ঐ কথা বললেন কেন?
-জহির উদ্দিন হেসে উঠে বলল,কেন বলেছি শুনতে চাও?
-আমার শোনার দরকার নেই বলে শ্রাবণী সেখান থেকে চলে গেল।
-স্ত্রীকে জিঙ্গেস করলেন,কিছু বুঝতে পারলে?
-তোমাদের দাদু নাতনির হেঁয়ালী কথা বুঝব কি করে?
-আমরা আবার হেঁয়ালী কথা কি বললাম?
-এইযে একটা ফেরেস্তার মতো ছেলেকে খুনি নরপশু বললে?
-ওটা হেঁয়ালী নয়,সত্য কথা।
-তাহলে আমান সত্যিই খুনি?
-নাহ,তোমার মাথার ঘিলু শুকিয়ে গেছে।তা নাহলে এই সামান্য কথাটাও বুঝতে পারলে না।তারপর আমানকে কেন খুনি নরপশু বলেছেন বললেন।
-ও এবার বুঝেছি।
-আমি কিন্তু এ ব্যাপারে বোঝার কথা জিঙ্গেস করিনি।
-তাহলে আবার কি ব্যাপারে?
-শ্রাবণী যে আমানের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে,তা কি বুঝতে পেরেছ?
-তাবাসসুম বিবি অবাক হয়ে বললেন,কি বলছ তুমি?এও কি সম্ভব?
-সম্ভব তাবাসসুম বিবি সম্ভব।দুনিয়াতে অসম্ভব বলে কিছু নেই।
-কি জানি.তুমি যখন বলছ তখন হতেও পারে।
-হতে পারে না,হতে দেখেছি।আর শ্রাবণী যে আমানকে ভালোবাসতে শুরু করেছে,তার প্রমাণও পেয়েছি।
এখন এসব কথা বাদ দিয়ে খাওয়ার ব্যবস্থা কর।আজ এবাদতের রাত।এসব কথা বলে সময় নষ্ট করা ঠিক হচ্ছে না।
দাদির কাছ থেকে এসে শ্রাবণী বেহেসতী জেওর পড়ছিল।বেশ কিছুক্ষন পর আফজালের গলা শুনতে পেল,এশার নামায পড়ে আমি মসজিদে নফল নামায পড়ছিলাম।হঠাত্ মনে পড়ল খাদেম সাহেবকে ভাত খাওয়াতে হবে।তাই চলে এলাম।আসার সময় দেখলাম বৈঠকখানায় খাদেম সাহেব বসে আছেন।ভাত দিন।
.
-পড়া বন্ধ করে শ্রাবণী গায়ে মাথায় ওড়না সদরে এসে সালাম দিল।
-আমান চৌকির উপর পা তুলে বসেছিল ভাত খাওয়ার জন্য।হারিকেনের আলোতে সামনে কেউ এলে সম্পূর্ন দেখা যায় না।তবু শ্রাবণীকে চিনতে পারল।তাকে এই প্রথম সালাম দিতে গুনে ও গায়ে মাথায় ওড়না দিয়েছে দেখে খুব অবাক হলেও খুশি হল।সালামের উত্তর দিয়ে বলল,কেমন আছেন?
-শ্রাবণী একটা চেয়ার টেনে এনে বসে বলল,আপনি কেমন আছেন?
-আল্লাহর রহমতে ভালো আছি।আপনি কেমন আছেন বললেন না যে?
-পনের ষোলদিন যে কথা জানার দরকার মনে করেননি,আজ জানতে চাচ্ছেন কেন?শহরের বেপর্দা মেয়েকে না হয় বেড়াতে নাই নিয়ে গেলেন,তাই বলে একেবারে আসাই ছেড়ে দেবেন?
-দুটো কথাই ঠিক বলেননি।প্রথম কথাটা আমিও বলতে পারতাম।আর দ্বিতীয় কথার উত্তরে বলব,প্রতি বছর এই শাবান মাসে মসজিদের সবকিছু আমাকে করতে হয়,এমনকি মোয়াজ্জিম ও ইমামের কাজও।
-কেন?কেন এই মাসে কি ওনারা ছুটি নিয়ে বাড়ি যান?
-না,ওনাদেরকে গ্রামের ধনী গরিব সবাই দাওয়াত দিয়ে বাড়িতে নিয়ে যায়।ওনারা কুরআনের কিছু অংশ পড়ে দোয়া করেন,বখশিস দেন।সকালে বেরিয়ে রাত ৮,৯টায় ফেরেন।
-এটা কি ইসলামের হুকুম?
-না,বরং বেদাত।
-বেদাত কি?
-ভালো মনে করে যে কোনো কাজ,যার দলিল কুরআন হাদিসে নেই এবং রাসূল (সাঃ) এর যুগ থেকে সালফে সালেহীনদের যুগ পর্যন্ত নেই।অথচ তারপরের যুগ থেকে সওয়াবের আশায় প্রচলন হয়েছে তাকে বেদাত বলে।
এমন সময় আফজাল আমানের ছিব্বা চাপা দিয়ে ভাত নিয়ে এলে শ্রাবণী আবার বলল,আগে খেয়ে নিন,তারপর বলবেন।আমি ততক্ষনে বসছি।আপনার সঙ্গে আরো কথা আছে।
-আমান বলল,তাহলে আপনিও খেয়ে আসুন।
-আমি এত সকাল সকাল খাই না।আমি বসছি,আপনি খেয়ে নিন।
আজ শ্রাবণীর সব কথায় কেমন যেন আন্তরিকতার আভাস পেল আমান।তাই আর কিছু না বলে খেতে শুরু করল।
-খাওয়া শেষ হতে আফজাল থালা বাটি নিয়ে যাওয়ার সময় শ্রাবণী তাকে বলল,দাদু ও দাদিকে খেয়ে নিতে বলে তুমিও খেয়ে নিও।আমি কিছুক্ষন খাদেম সাহেবের সঙ্গে আলাপ করব।
-আফজাল চলে যাওয়ার পর শ্রাবণী আমানকে জিঙ্গেস করল,,,,,
(চলবে)
#শ্রাবণী
#২৪তম পর্ব
-বেদাতের কয়েকটা উদাহরণ দিন তো?
-যেমন মরহুম-মরহুমা মুরুব্বিদের নামে মিলাদ পড়ান,টাকা দিয়ে কুরআন খতম করান,দোয়ার মাহফিল করা,কুলখানি করা,জন্মদিন ও মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা,বিয়ের অলিমায় দাওয়াত দিয়ে উপহার গ্রহণ করা,এসব ছাড়াও মুসলিম সমাজে আরো অনেক বেদাতের প্রচলন রয়েছে।
-এসব কথা আপনি গ্রামের মানুষকে জানান নি?
-জানিয়েছি কিন্তু কাজ হয়নি।
-কাজ হয়নি কেন?
-আজকাল সব ইমাম,মৌলবী সওয়াবের কথা বলে এই সব করে অর্থ উপার্জন করছে।লোকজন তাদের কথা শুনবে, না আমার মতো খাদেমের কথা শুনবে।
-আপনি খাদেম হলেও অল্প শিক্ষিত নন,আপনার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত আলাপ-আলোচনা করে বুঝতে পেরেছি,আপনি ধর্মীয় লাইনে উচ্চ শিক্ষালাভ করেছেন এবং ভার্সিটি থেকেও শিক্ষা লাভ করেছেন।তারপর জিঙ্গেস করল,আমার অনুমান ঠিক কি না বলুন?
-তাতে আপনার লাভ?
-লাভ ক্ষতির প্রশ্ন পরে,আমার কথার উত্তর দিন।
-লাভের কথা বললে বলতে পারি?
-না বললেও আমার কথা যে ঠিক,তা জানি।আরো জানি,ধনী ঘরের উচ্চশিক্ষিত ছেলে হয়েও কেন এখানে এই সামান্য চাকরি করছেন?
-তার কথা শুনে আমান খুব অবাক হলেও তা প্রকাশ না করে মৃদু হেসে বলল,আপনার কথাগুলো ঠিক না বেঠিক বলব না।তবে হঠাত্ এ রকম কথা কেন বললেন বুঝতে পারছি না।
-যদি বলি কোনো দুর্ঘটনার কারণে বিপদে পড়েছিলেন এবং আপনার কোনো শুভাকাঙ্খির হুকুমে এখানে আছেন?
-তার কথা শুনে আমান এত অবাক হল যে,কিছুক্ষন কথা বলতে পারল না।তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে বলল,আপনি এমন কথা জানলেন কেমন করে?
-সে কথা পরে।আগে বলুন আমার কথা সত্য কিনা?
-হ্যাঁ,সত্য।
-আপনি ভার্সিটিতে পড়ার সময় রাসেল নামে কাউকে চিনতেন?
-হ্যাঁ চিনতাম।
-সে যে ভার্সিটির একটা মেয়েকে খুন করে বিদেশে পালিয়ে গেছে,তা জানেন?
-হ্যাঁ,জানি এবং আপনাকেও চিনি।
-এবার শ্রাবণীর অবাক হওয়ার পালা,আমানের কথা শুনে সে অবাক কন্ঠে বলল,কি বললেন?
-কেন বিশ্বাস হচ্ছে না?
-রাসেলকে বা আমাকে চেনেন কিভাবে?
-আপনি ও রাসেল যখন ফিজিক্সে অনার্স করছিলেন তখন আমিও ইংলিশে অনার্স করছিলাম।হঠাত্ একদিন আপনাকে দেখে মুগ্ধ হই।এর কিছুদিন পর একা পেয়ে আপনার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য যখন কাছে গেলাম তখন রাসেল এসে আপনাকে নিয়ে চলে গেল।তখন অবষ্য আপনার নাম ও রাসেলের নাম এবং আপনাদের সম্পর্কের কথা জানতাম না।পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরে মনের আশা মনে চেপে রেখে সবর করে আছি।
-এখানে দেখার আগে পর্যন্ত কি আমার কথা মনে ছিল?
-ছিল এবং আজীবন থাকবে।
-কথাটা শুনে শ্রাবণী চমকে উঠে ভাবল,আমার দুর্ঘটনার কথাও জানে নাকি?কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে সামলে নিয়ে ভয়ে ভয়ে জিঙ্গেস করল,আমাদের সম্পর্ক কেন বিচ্ছিন্ন হল,তা জানেন?
-হ্যাঁ জানি।আপনাদের সম্পর্ক জানার পর রাসেল ও আপনার সবকিছু খোঁজ খবর নিই।আসলে রাসেল খুব খারাপ চরিত্রের ছেলে।আপনাকে কথাটা জানাবার আগেই খুনের আসামি হয়ে বিদেশে পালিয়ে গেল।
-দুর্ঘটনার কথা জানে কিনা বুঝতে না পেরে শ্রাবণীর ভয়টা থেকেই গেল।জিঙ্গেস করার সাহস হল না।তাই প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্য বলল,আপনি যে বললেন,আমাকে প্রথম দেখার পর থেক আজও মনে রেখেছেন এবং আজীবন রাখবেন,আর আমি যদি বলি এতদিনে আপনি বিয়ে করলে আমার কথা ভুলে যেতেন?
-তা বলতে পারেন বলে আমান থেমে গেল।
-থেমে গেলেন কেন?কথাটা শেষ করুন।
-একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে আমান বলল,থাক.সে কথা বলা নিষ্প্রয়োজন।
-আপনার কাছে নিষ্প্রয়োজন হলেও আমার কাছে প্রয়োজন থাকতে পারে।
-যা অসম্ভব ও অবাস্তব , সে কথা না বলাই উচিত।
-কিন্তু আপনি তো অসম্ভব ও অবাস্তবকেই সম্ভব ও বাস্তবে পরিণত করেছেন?
-আপনার সঙ্গে কথায় পারব না।এসব কথা এবার থাক।আপনার এখনও খাওয়া হয়নি,তাছাড়া আজ ইবাদতের রাত।সময় নষ্ট করা উচিত হচ্ছে না।
তারপর সালাম বিনিময় করে শ্রাবণীকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে আমান হন হন করে চলে গেল।
-শ্রাবণী তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে চিন্তা করতে লাগল,আমানের মতো ছেলে আজকালের যুগে দেখাই যায় না।অথচ সন্ত্রাসীদের কারণে তাকে পাড়াগাঁয়ে খাদেমের চাকরী করতে হচ্ছে।বাবাকে বলব ওর মামার সঙ্গে আলাপ করে ঐ সন্ত্রাসী দুজনকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে।আবার ভাবল,আমি কেন তার ভালো মন্দ চিন্তা করছি?তবে কি তাকে ভালবেসে ফেলেছি?তার মন বলে উঠল.হ্যাঁ তুই তাকে ভালবেসে ফেলেছিস।কিন্তু কাজটা ভালো করিসনি।
-শ্রাবণী মনকে বলল,ভালো-মন্দ চিন্তা করে কেউ কাউকে ভালবাসে না।
-মন বলল,এটা তোর ভুল ধারনা।একবার তো ভালো-মন্দ বিচার না করে রাসেলকে ভালবেসেছিলি,তার ফলাফল এরই মধ্যে ভুলে গেলি?
-না ভুলিনি।তাই এবার চিন্তা-ভাবনা করেই এগিয়েছি।
-কিন্তু তুই তো অপবিত্রা,আমানের মতো পবিত্র ছেলের কাছে নিজেকে সমর্পন করবি কী করে?
-ভালোবাসা পবিত্র-অপবিত্র বিচার করে না।
-কিন্তু সে যে ভালবাসে তা তো জানিস না?
-সে যখন আমার ও রাসেলের সম্পর্ক জানার পর আজও আমাকে মনে রেখেছে এবং আজীবন রাখবে বলছে তখন তো বোঝাই যাচ্ছে ভালবাসে।
-ভালোবাসা এক জিনিস আর বিয়ে করা আর এক জিনিস।ছেলেরা মেয়েদের মধু খাওয়ার জন্য ভালোবাসা করে,বিয়ে করার জন্য নয়।আর ছেলেরা যে এক ফুলের মধুতে সন্তুষ্ট থাকে না,তার প্রমাণ তো আগেই পেয়েছিস।
-সব ছেলে সমান হয় না।আমান আর রাসেল আকাশ পাতাল তফাত্।
-তা জানি,তবু বলব, সে তোকে ভালোবাসে কিনা আগে জানার চেষ্টা কর।যদি পজিটিভ বুঝতে পারিস তখন দুর্ঘটনার কথা জানাবি।তারপরও সে যদি তোকে চায়,তাহলে তুই ভাগ্যবতী।
-শ্রাবণী কতক্ষন এইসব চিন্তা করছিল জানে না।সে যেন অন্য জগতে বিচরণ করছিল।আফজালের গলা শুনে বাস্তবে ফিরে এল।তার দিকে চেয়ে বলল,কিছু বললে?
-আফজাল বলল,আপনি অনেকক্ষন ধরে এখানে বসে রয়েছেন।দাদি ভাত খেতে ডাকছে।
-ও,হ্যাঁ,যাই বলে শ্রাবণী চলে গেল,,,,,,,
(চলবে)
#শ্রাবণী
#২৫তম পর্ব
আজ জীবনে প্রথমবার রাত জেগে শ্রাবণী নামায পড়ছে।কিছুক্ষন পড় ভাবল,একটু ঘুমিয়ে নিই।কিন্তু ঘুমাতে গিয়ে তার ঘুম এলো না।চোখ বন্ধ করতেই আমান আর ফকিরের কথা মনে পড়তে লাগল।কে সেই ফকির?যার দোয়ায় আমানের জন্ম,যে নাকি মৃত্যুর দরজা থেকে তাকে বাঁচিয়েছে?মনে হয় আমান তাকে চেনেন।তা নাহলে আমানকে বাঁচাইলো কেন?তার কথায় আমান পাড়াগাঁয়ে সামান্য খাদেমের চাকরিইবা করছে কেন?
একথা ওকথা ভাবতে ভাবতে একটা বেজে গেল।দাদা-দাদি নামায পড়ছে কিনা দেখার জন্য রুম থেকে বেরিয়ে এল।দেখল,দাদু নামায পড়ছে আর দাদি অনুচ্চস্বরে কুরআন পড়ছেন।ভাবল,আমানও নিশ্চয় এরকম কিছু করছে।কি করছে দেখার জন্য এক্ষুনি যেতে ইচ্ছা করলেও কেউ না কেউ দেখে ফেলতে পারে ভেবে ইচ্ছাটা দমন করল।রুমে এসে জানালা খুলে পূর্নিমার আলো দেখতে লাগল।আর ভাবতে লাগল,এখানকার চাঁদের আলো যেন কত মিষ্টি,কত মধুর।অনেক্ষন সেই সৌন্দর্য দেখে অযু করে নামায পড়তে শুরু করল।
.
সাড়ে ৩টার সময় শ্রাবণী দাদা-দাদিকে খেতে দেখল।তারপর তাদের কাছে এসে বলল,কালও রোযা রাখবেন?
-তাবাসসুম বিবি বললেন,হ্যাঁ তুইও রাখবি নাকি?রাখলে কিছু খেয়ে নে।
-আপনারা তো ২টা রাখছেন,একটা রাখা যায়?
-এবার জহির উদ্দিন বললেন,কেন যাবে না,যাবে।
-তাহলে দিন আমিও খাব।
যারা ছোটবেলায় রোযা রাখে তাদের বয়সকালে রোযা রাখলে খুব কষ্ট হয়।শ্রাবণীরও খুব কষ্ট হতে লাগল।তাই নামায পড়ার সময় ছাড়া সারাদিন ঘুমিয়ে কাটাল।
-আজও আমান রাতে খেতে এলে আফজাল যখন তার খাবার নিয়ে যাচ্ছিল তখন শ্রাবণী তাকে বলল.খাওয়া হয়ে গেলে খাদেম সাহেবকে অপেক্ষা করতে বলবে,আমি আসব।
-রোযা রেখেছিল বলে আজ শ্রাবণী দাদু-দাদির সঙ্গে খেয়ে নিল।তারপর দাদুকে বলল,আমরা কাল ঢাকায় যাব তাই না দাদু?
-কাল নয় পরশু যাওয়ার ব্যবস্থা করছি।
-খাদেম সাহেবকে অপেক্ষা করার জন্য বলেছি।উনি অপেক্ষা করছেন।যাই তা হলে?
-স্বামী কিছু বলার আগে তাবাসসুম বিবি বলল,কাল তো অনেকসময় কথা বলেছিস,আজ আবার যাবি কেন?
-জহির উদ্দিন বলল,ও তুমি বুঝবে না।তারপর নাতনীকে বলল,তুমি যাওতো ভাই।
-শ্রাবণী গায়ে মাথায় উড়না দিয়ে যাওয়ার পর তাবাসসুম বিবি বলল,তুমি জেনে শুনে এই রাতের বেলা যেতে দিলে?
-হ্যাঁ দিলাম।কারণ আমি আমানের সঙ্গে ওর বিয়ে দিতে চাই।সেদিন তোমাকে বললাম না।শ্রাবণী আমানের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে।তাই ভাবছি,ঢাকা থেকে এসে শ্রাবণীর দুর্ঘটনার কথা জানিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দেব।
-যদি আমান রাজি না হয়?
-তা নাও হতে পারে,তবু দেব।
-দুর্ঘটনার কথা না জানালে হয় না?
-না হয় না।আমি না জানালেও শ্রাবণী জানাবে।
-ঠিক আছে,যা ভালো বুঝ তাই কর।
.
-সদরে এসে শ্রাবণী সালাম দেওয়ার আগে আমান দিল।
-সালামের উত্তর দিয়ে শ্রাবণী একটা চেয়ারে বসল।
-আমান বলল,কেন অপেক্ষা করতে বলেছেন বলুন।
-কয়েকটা কথা জানতে চাই।
-বেশ তো বলুন,কি জানতে চান?
-যে ফকির আপনাকে সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রক্ষা করেছিল,তাকে চেনেন?
-খুব অবাক হচ্ছি,আপনি তার কথাও জানেন দেখছি।কিভাবে জেনেছেন বলুনতো?
-শ্রাবণী তার কথার উত্তর না দিয়ে বলল,শুধু তাই নয়,ঐ ফকিরের দোয়াতেই আপনার জন্ম সে ইতিহাসও জানি।
-কিন্তু কিভাবে জানলেন?প্লিজ বলুন না।
-শ্রাবণী কিভাবে জেনেছে বলার পর জিঙ্গেস করল,ঐ ফকিরকে চেনেন কিনা বলুন।
-না,চিনি না।
-সত্যি বলছেন?
-আপনাকে প্রথম দিনই বেড়াবার সময় বলেছিলাম,আমি ঙ্গান হওয়ার পর থেকে মিথ্যে বলি না।
--আপনার জন্মের ইতিহাস জানেন?
-হ্যাঁ,মায়ের কাছে শুনেছি।
-ফকিরের সম্পর্কে তাকে কিছু জিঙ্গেস করেন নি?
-প্রয়োজন মনে করি নি,তাই জিঙ্গেস করিনি।
-আপনার মা কি ফকিরের সম্পর্কে কিছু জানেন?
-তাও বলতে পারব না।
-আপনাদের বাসার ঠিকানাটা দিন তো?
-ঠিকানা দেয়া ঠিক হবে কি না আমান চিন্তা করতে লাগল।
-তাকে চিন্তা করতে দেখে শ্রাবণী বলল,ঠিক আছে,ঠিকানা দিতে বাধা থাকলে জোর করব না।আচ্ছা,ঐ ফকির কি মাঝে মাঝে আপনার কাছে আসেন?
-বলা যাবে না।
-শ্রাবণী ব্যাপারটি বুঝতে পেরে চুপ করে গেল।তারপর তার মন বোঝার জন্য বলল,আমি দাদা-দাদির সঙ্গে ঢাকায় ফিরে যাচ্ছি।
-জানি।
-দাদুর কাছে জেনেছেন?
-হ্যাঁ।
-আবার আসব কিনা অথবা একেবারেই আসব কি না জানতে ইচ্ছা করছে না।
-কিছু না বলে আমান চুপ করে রইল।
-কি হল?কিছু বলছেন না যে?
-আমান মৃদু হেসে বলল, দু দিন আগে হোক আর পরে হোক,ফিরে আপনেকে আসতেই হবে।
-এত নিশ্চিত হলেন কি করে?
-তা বলতে পারব না,মনে হল তাই বললাম।
-আমার তো মনে হচ্ছে,আপনি আর বেশিদিন এখানে থাকবেন না।
-কি করে বুঝলেন?
-মা-বাবার একমাত্র ছেলে।তার ওপর উচ্চশিক্ষিত,ব্যবসা আছে।কতদিন আর পাড়াগাঁয়ে পড়ে থাকবেন।বিপদের আশঙ্কা কেটে গেলে সেই ফকির হয়তো এসে আপনাকে ঢাকায় ফিরে ব্যবসার হাল ধরতে বলবে।
-বিপদের কথাও জানেন দেখছি।তবু আপনার বুদ্ধির তারিফ না করে পারছি না,যদিও মাঝে মাঝে ভুল করেন।
-কম বেশি ভুল সবাই করে।এখন কি ভুল করলাম বলুন তো?
-এই আমার ব্যাপারে যা কিছু বললেন।
-তাহলে কি আপনার বিপদ কেটে গেছে এবং আজীবন খাদেমগিরি করে এখানে থেকে যেতে চান?
-আমান তার কথার উত্তর না দিয়ে বলল,আচ্ছা,একটা কথা বলুন তো,আমার সম্পর্কে এতকিছু জানতে চাচ্ছেন কেন?
-আমার তো মনে হচ্ছে,উত্তরটা জেনেও জিঙ্গেস করছেন?
-সেটা তো অনুমান।আমি সিওর হতে চাই।
-যদি বলি আপনার অনুমান সত্য?
-তাহলে একটা কথা বলব,মাইন্ড করবেন না বলুন?
-ঠিক আছে বলুন,আমি মাইন্ড করব না।
-গতকাল আপনাকে বলেছি,"আজও আপনার কথা আমার মনে আছে এবং আজীবন থাকবে।"কেন মনে রেখেছি জানেন?
আপনাকে আমার সমস্ত সত্তা দিয়ে ভালবাসি।রাসেলের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার পর বাবা খুন না হলে অনেক আগেই বিয়ে করে ঘরে তুলতাম।ভাগ্যের ফেরে তা সম্ভব হয়নি।এখানে আপনি না এলেও কিছুদিনের মধ্যে আপনাদের বাসায় প্রস্তাব নিয়ে মাকে পাঠাতাম।অবশ্য তার আগে আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতাম মতামত জানার জন্য।আজ সময় সুযোগ পেয়ে বলে ফেললাম।তারপর আমান চুপ করে মুখ নিচু করে রইল,,,,,,
(চলবে)
āĻোāύ āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āύেāĻ:
āĻāĻāĻি āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āĻĒোāϏ্āĻ āĻāϰুāύ