গল্পঃ "স্যারের মেয়ে যখন আমার প্রেমিকা"
.
.
মাজহার স্যার ফোন করেছেন।
স্বল্প উৎকন্ঠা নিয়ে ফোনটা রিসিভ করে সালাম আর কুশল বিনিময় করলাম।
স্যার উনার বাসায় ডেকে পাঠিয়েছেন উনার মেয়ে মীমকে নিয়ে লাইব্রেরি যেতে। কি জানি একটা বই কিনবে মীম! কিন্তু স্যার ব্যস্ত থাকায় সাথে নিয়ে যেতে পারবেন না, আবার মেয়েকে একাও ছাড়বেন না। তাই আমাকে ফোন করা।
-
আমি তো আনন্দে বিহ্বল। স্বল্প উৎকন্ঠা আমার মুহূর্তের মধ্যেই এভারেস্ট এ উঠে গেলো। স্যার স্বয়ং নিজের মেয়ের দেহরক্ষী হিসেবে আমাকে নিয়োগ করেছেন এ কি চারটে খানি কথা।
_
_
_
ঘটনাটা এইচ এস সি এর বিদায় অনুষ্ঠানের। এত এত সুন্দরী বান্ধবী আর জুনিয়র থাকতে নজর আমার একটি মাত্রই মেয়েই কাড়ছে। বন্ধুদের এ খবর পেতে দেরী হলোনা। রীতিমত আমাকে টেনে হেঁচড়ে মেয়েটার সামনে দাড় করিয়ে দিলো।
-
মেয়েটাকে কি বলবো না বলবো এই ভেবে কান জোড়া গরম হয়ে যাচ্ছিলো। পাঁচ মিনিট ধরে মেয়েটার পথ আগলে রাখায় মেয়েটা বিরক্ত হয়ে নিরব রাগ দেখিয়ে পাশ কেটে চলে গেলো। কিন্তু তাকে ফলো করা ছেড়ে দিলাম না। তার হাটাচলা, হাসি, কাশি সহ সবকিছু এমনকি নিঃশ্বাসগুলোও দুচোখ ভরে দেখতে লাগলাম।
-
প্রথম দেখায় এভাবে কারো প্রতি এতটা দুর্বল হয়ে যাবো স্বপ্নেও কোনোদিন ভাবিনি। কি সুন্দর মায়াবী চোখ মেয়েটার ঠিক যেনো পাশের বাড়ির রহিম চাচার কালো গাভিটার চোখের মত। টিকালো নাক আর ছোট্ট টোল পড়া দুটি গাল তার। ছোট ছোট সাদা ট্যাবলেটের মত দাঁত আর তরমুজ এর মত গাঢ় গোলাপি ঠোটের কথা নাইবা বললাম। সুনিয়ন্ত্রিত হাটুনিটাও তার কম মাধুর্যযুক্ত নয়। তার এদিক ওদিক চাহনিতে তো বার বার অজ্ঞান হতে ইচ্ছে করছে আমার।
-
এক বান্ধবীর চুলে গুঁজে রাখা একটা গোলাপ ছিনিয়ে নিলাম। বান্ধবী রেগেমেগে আগুন। কিন্তু যখুনি শুনলো যে আমি এই গোলাপ কাউকে দেওয়ার জন্য নিয়েছি, তখন আমার বান্ধবী তো আমার পছন্দ করা অপ্সরীকে দেখার জন্য উতলা হয়ে গেলো। বান্ধবী মহলে ছোটখাটো একটা হইচই পড়ে গেলো। কি হয়েছে কি হয়েছে? আমিম একজনকে পছন্দ করেছে। যেই ছেলের মেয়েদের প্রতি এত এলার্জি সে কিনা একটা মেয়েকে পছন্দ করেছে। ভাবা যায়?
-
আসলেই ভাবা যায়না। কেননা মেয়েদের প্রতি খুব একটা এলার্জি না থাকলেও বর্তমান ঠুনকো প্রেম ভালবাসার প্রতি খুব এলার্জি আমার। কিন্তু এই নাম না জানা মেয়েটাকে দেখে এলার্জি তো দূরের কথা আমার শরীরের যাবতীয় রোগ জীবাণু নিমিষেই দূর হয়ে গেলো। মাথায় শুধু এখন একটা চিন্তা ভাবনাই কাজ করছে যে কিভাবে এই মেয়ের খুব কাছের একজন হওয়া যায়!
-
আমার আগেই ক জন বন্ধু সব বান্ধবীদের সিরিয়াল করে আমার পছন্দ করা মেয়েটাকে দেখিয়ে দিলো। বান্ধবীদের মাঝে একজন বলে উঠলো- "আরে এ তো মীম, মাজহার স্যারের মেয়ে।"
-
এ কথা শুনে বড় বড় ঢক গিললাম কয়েকবার। স্যারের মেয়েকে পছন্দ করা কি যাতা ব্যাপার! তবে সবাই আমার পছন্দের তারিফ করতে লাগলো। সবাই এও বলতে লাগলো যে একটু চেষ্টা করলেই নাকি আমি স্যারের মেয়ের সাথে লাইন করতে পারি। কেননা মাজহার স্যারের খুবই প্রিয়ভাজন এবং বিশ্বাসভাজন ছিলাম আমি। মনে মনে অবশ্য এও ভাবতে লাগলাম যে মেয়ের সাথে লাইন করতে গিয়ে না জানি মেয়ের বাবার সাথে লাইন ছিড়ে যায়।
-
মাজহারের স্যারের বাসায় একদিন গিয়েছিলাম কিন্তু কই সেদিনতো মীমকে দেখিনি। যাকগে এসব। স্যারের মেয়ের সাথে এসব মানায়না।
-
যতই মীমের কথা মন থেকে মুছে ফেলতে চেষ্টা করি, ততই তার কল্পনা সামনে আসে। ভেংচি কেঁটে আমাকে জ্বালাতন করে তার মিষ্টি অবয়বটা। কল্পনায় আধ মিনিট যদি সে আসে তার বাবা আসে পুরা একমিনিট। স্যার যেনো বলছে- "ছিহ আমিম ছিহ! তোমাকে আমি ভাল জানতাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তুমি আমার মেয়েকে নিয়ে উল্টাপাল্টা ভাবনা শুরু করেছো?"
চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে, "আমি নই, আপনার মেয়ে আর আপনিই তো আমাকে ক্ষণে ক্ষণে জ্বালিয়ে যাচ্ছেন।"
_
_
_
এইচ এস সি পরীক্ষা শুরুর আগেরদিন। ভাবলাম স্যারের কাছে দোয়া নিতে যাবো কিন্তু মীমের সাথে দেখা হয়ে যেতে পারে তাই স্যারের বাসায় না গিয়ে ফোন দিলাম। কিন্তু একি স্যার ফোন টা রিসিভ না করে রিসিভ করলো স্যারের মেয়ে মীম। সালাম দিতেই ওপাশ থেকে সুমিষ্ট কন্ঠে ভেসে আসলো- "আব্বু তো ফোন রেখে বাইরে গেছে, প্রয়োজনীয় কিছু হলে বলুন, আব্বু আসলে আমি বলে দিবো।"
-
মীমের কথা শুনে সেদিন ভাষার সাথে সাথে নিঃশ্বাস নেওয়ার কথাও ভুলে গিয়েছিলাম। খানিক বাদে মীমের "হ্যালো" শব্দে আমার যেনো জ্ঞান ফিরলো। "স্যার আসলে শুধু বলিয়েন আমিম ফোন করেছিলো।"- এই বলে ফোনের রেকর্ডিং এর কথা মনে পড়লো, চালু করে দিলাম রেকর্ডিং । "আচ্ছা ঠিক আছে, এখন রাখি।"- এ কথা বলে সে ফোন রেখে দিলো।
-
পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত কতবার যে এই স্বল্প কথার রেকর্ডিং টা শুনেছি তার হিসেব নেই।
_
_
স্যার বলেছিলেন, পরীক্ষা শেষে স্যারকে যেনো জানাই পরীক্ষা কেমন হয়েছে। তাই ফোন দিলাম। ফোনটা রিসিভ করলো আবার স্যারের মেয়ে মীম। হালকা স্বরে শুনতে পেলাম- "আব্বু তোমার স্টুডেন্ট ফোন করেছে, এই নাও কথা বলো।"
-
এরপর থেকে স্যারকে ফোন করার পরিমাণ আমার বেড়ে গেলো। নিজের পড়াশুনা, সাজেশন আর স্যারের পার্সোনাল ব্যাপার নিয়েও কথা বলতাম। এমন করে একদিন মীমের ব্যাপারেও অনেক কিছু জেনে নিলাম।
-
তবে একটা জিনিস এর সুরাহা আমি কিছুতেই করতে পারছিলাম না। আর সেটা হলো যে, যখনি আমি স্যারকে ফোন দিতাম প্রায়ই মীম ফোনটা রিসিভ করে স্যারকে ধরিয়ে দিতো। এমন একটা ভাব যেনো স্যার ফোন রিসিভ করতেই পারেনা।
-
এমন অনেক ছোট ছোট কাহিনীর মধ্য দিয়ে আমার লিখিত পরীক্ষা শেষ হলো। প্রাক্টিক্যাল এর জন্য মাজহার স্যারকে বলতেই স্যার উনার বাসায় আমাকে ডেকে পাঠালেন।
-
-
একপ্রকার তিরিং বিরিং নাচতে নাচতে স্যারের বাসায় গেলাম। কলিং বেল টিপলাম। ভেবেছিলাম দরজা খুলে দিবে স্যারের মেয়ে কিন্তু স্যার নিজেই দরজা খুলে দিলো।
-
স্যারের সাথে এটাসেটা গল্প করতে করতে মীম নাস্তা নিয়ে এলো। আমার দিকে তাকিয়ে মীমের দেওয়া কয়েক টুকরো হাসি দেখে আমিও আমার ভেতর থেকে যথেষ্ট ভাল একটা হাসি দেওয়ার চেষ্টা করলাম।
-
স্যার হুট করেই বলে উঠলো- "আমিম তোমার বিচার আছে।"
-
আমি তো কয়েক কিলোমিটার বেগে ভয় পেয়ে স্যারের মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকা মুখটা নামিয়ে পা বরবার সেট করে থর থর করে কাঁপতে লাগলাম। স্যার কি তাহলে সব টের পেয়ে গেছে! খুব উঁচু মানের একটা অপমান যে আমার জন্য ওয়েট করছে তা বুঝতে আর বাকি রইলোনা।
-
"বিদায় অনুষ্ঠানের দিন নাকি তুমি মীম এর পথ আগলে কি জানি বলতে চেয়েছিলে?"
-
এ কথা শোনার পর আমার হাত পা ঠক ঠক শব্দ করে কাঁপা শুরু করলো। গলা শুকিয়ে সাহারা মরুভূমি হয়ে গেলো। স্যার শরবত এগিয়ে দিলেন। গ্লাসটাও ভাল মত ধরতে পারছিলাম না। স্যার শরবত খেতে সাহায্য করলেন। ঠান্ডা শরবত খেয়ে শরীরের ভেতরের গরম থেকে যেনো ভ্যাপসা ধোয়া বের হচ্ছে ।
-
"বলতে চেয়েও কিছু বলোনি কেনো সেদিন মীমকে?"
-
আমি কাঁপা কাঁপা গলায় স্যারকে বললাম। "স্যার আমার ভুল হয়ে গেছে, আমায় মাফ করবেন। এমন ভুল আর আমি কোনোদিন করবনা।"
-
স্যার ঠান্ডা গলায় বলতে লাগলেন- "মীম তোমায় সেদিন দেখিয়ে দিয়েছিলো। আমি তোমার যা জানি সব বলেছি সেদিন মীমকে। ছোট মেয়ে তো, তোমার সম্পর্কে বলা কথা গুলো বুঝি তার খুব মন কেড়েছিলো। বিশেষ করে তোমার নামটা। সেদিন থেকে তোমার কথা শুনতে চাইতো সে। হুটহাট করে তোমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতো। তোমার ছবি চাইলো। একটা মাত্র ছবি ছিলো সেটাও দিলাম। "
-
একটু চুপ থেকে আবার স্যার বলা শুরু করলেন- "আমি বাবা হয়ে ব্যাপারটা ভালই বুঝতে পারছিলাম মেয়ের মতিগতি। তুমি ভাল ছেলে আমার প্রিয় ছাত্র তাই মীমকে বকাবকি করিনি কোনোদিন।"
-
এসব কথা শুনে লজ্জায় আমার কান লাল হতে শুরু করলো। স্যারের মুখে এমন কথা শোনো যেনো মুরগী না চাইতে রোস্ট।
-
সত্যি সত্যি সেদিন মুরগীর রোস্ট সহ কত আইটেমের খাবার খেয়ে জামাই এর মত আদর পেয়ে বাসায় ফিরেছিলাম।
_
_
তার পরেরদিন থেকে লজ্জায় স্যারের সাথে আর কথা বলিনি বেশ কিছুদিন। আর এদিকে আমি বাবা মেয়ে দুজনের প্রেমে হাবুডুবু খেতে লাগলাম। মাজহার স্যার এর মত শ্বশুর পাওয়া কম ভাগ্যের নয়! যিনি কিনা নিজ থেকে মেয়ের লাইনের তার জোড়া লাগান।
_
_
_
প্রাক্টিক্যাল পরীক্ষার পর স্যারদের বাসার সামনে ঘুরাফিরা করতাম। মীমকে ফলো করতাম। সে গার্লস স্কুলে ক্লাস টেনে পড়তো। সেখানেও যেতাম।
-
এর মধ্যেই মীম এর সাথে আমার টুকটাক কথা বলাবলি শুরু হলো। যদিও কোনো প্রতিবন্ধকতা ছিলোনা তবুও ভয় পেতাম এসবে। একদিন মীমদের বাসার সামনে ঘুরাফিরা করছিলাম, স্যার পিছন থেকে আমার কান ধরে বাসায় নিয়ে গেলেন। স্যার ম্যাডামের সামনেই মীমের সাথে টুকটাক কথা বললাম। এমন করেই আমি মীমদের বাসার একজন সদস্য হয়ে গেলাম আর মীম এর কাছের মানুষ হয়ে গেলাম।
-
-
কিন্তু হটাৎ করে স্যার বললো- "আমিম তুমি আর বাসায় এসোনা, মীম অনেক ছোট। আশেপাশের লোক খারাপ চোখে দেখছে তোমার আসা যাওয়া।"
-
চোখ দুটো ছল ছল করে সেদিন বাসায় ফিরে এসেছিলাম। বুঝলাম কেউ ফুসমন্তর দিয়েছে স্যারকে। কেননা মীমের সাথে কেবল আমার প্রেমের প্রাথমিক পর্যায় চলছে আর সেটা স্যার ভাল করেই জানেন।
-
সেদিন থেকে মীমদের বাসায় যাওয়া বন্ধ করলাম। আর শুরু করলাম ফোনে কথা বলা। গল্প করতে করতে যে কখন রাত ফুড়িয়ে যেতো আর কখন যে গল্পই ফুড়িয়ে যেতো বুঝতেই পারতাম না। সময় করে একদিন মনের ভেতর জমা ভালবাসার কথাগুলোরও আদান প্রদান হয়ে গেলো। বিশ্বাস, ভালবাসা, রাগ, অভিমান সবকিছু মিলিয়ে খুব ভালই চলছিলো আমাদের প্রেম।
-
আজও প্রেম করছি। আজও দিনে পনেরো বিশবার এর মতো মাজহার স্যার নামে সেভ করা নাম্বারটা থেকে ফোন আসে। কথা বলি, ভাবের আদান প্রদান করি মিনিটের পর মিনিট ঘন্টার পর ঘন্টা।
_
_
এভাবে কয়েক মাস কেটে যাবার পর একদিন স্যারের নাম্বারটা থেকে মীমের বদল স্বয়ং স্যারের ফোন। "আমিম, বাসায় আসতে পারবা একটু, মীম নাকি বই কিনবে, তার সাথে লাইব্রেরি যেতে হবে।" আর এ কথা শুনে আমি তো খুশিতে বাকবাকুম না হয়ে প্যাক প্যাক হয়ে গেলাম।
_
_
উফফ! এতদিন পর হাটছি, মীম আর আমি আমিম পাশাপাশি।
অনেকদিন পর মীমকে অনেক কাছ থেকে দেখতে পেলাম। কানে কানে বললাম- "মীম তোমার গরুর মত চোখকে খুব ভালবাসি। আর চোখের মালিকটাকেও ভালবাসি অনেক অনেক অনেক।"
-
মিষ্টি হাসি না দিয়ে মীম ক্ষেপে গিয়ে বললো- "কি..? আমার চোখ গরুর মত? এত বড় সাহস তোমার? আমার চোখকে গরুর চোখ বলো?"
-
মীমকে সাথে সাথে রহিম চাচার বাড়িতে নিয়ে গেলাম। উঠানে বাঁধা গরুটার চোখ দেখে মীমের চোখ তো ছানাবড়া। সে শুধু একটা কথাই বলে যাচ্ছে- "গরুর চোখ এত সুন্দর হয় কিভাবে?"
.
.
.
________~সমাপ্ত~________
.
.
.
___লিখাঃ আমিম এহসান.____
.
āĻোāύ āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āύেāĻ:
āĻāĻāĻি āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āĻĒোāϏ্āĻ āĻāϰুāύ