āĻŦৃāĻšāϏ্āĻĒāϤিāĻŦাāϰ, ā§§ā§Ē āĻĄিāϏেāĻŽ্āĻŦāϰ, ⧍ā§Ļā§§ā§­

3701

"গল্পঃ অন্তঃসত্ত্বা"
.
১-
.
"ছায়াঘেরা বিশাল গ্রামের একপাশে এক নির্জন পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় দুশো বছরের পুরনো জমিদারগৃহ। বর্তমানে এ প্রাসাদের সত্বাধিকারী জমিদার বংশের অষ্টম পুরুষ জোনাব আলী তালুকদার। আট পুরুষ আগে শুরু হয় তাদের জমিদারী, আর জোনাব আলীর তিন পুরুষ আগে জমিদারী খোয়ায় এ বংশ।
জমিদারি না থাকলেও শরীরে যে জমিদারী রক্ত বইছে তার রেশ তাদের বাহ্যিক আচার আচরণেও প্রকাশ পেয়ে থাকে।
.
জোনাব আলী তালুকদার এর ঘরে কোনো নারী নেই। পত্নীবিয়োগ হয়েছেন বহু আগেই। দুই মেয়ে আর এক ছেলে নিয়ে ছিলো সংসার। দুই মেয়েকে সৎপাত্রে পাত্রস্থ করে এখন মোটামুটি ভারমুক্ত। শুধুমাত্র ছেলের গতি নির্ধারণ করাই এখন বাকি।
ছেলে তোরাব আলী তালুকদার, পঁচিশ পেড়িয়েছে বেশ কিছুদিন। ছাব্বিশের মাঝামাঝি হবে হয়তো। পেশা বলতে তেমন কিছু আছে বলে মনে হয়না। প্রতিদিন সকালে বের হয় আর কখনোবাবা রাতে আবার কখনোবা দুপুরে ঘরে ফেরে।
শহরের বড় প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করেছে। ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য বিদেশেও পাঠাতে চেয়েছিলেন বাবা জোনাব আলী। কিন্তু ছেলে যেতে নারাজ।
এ বৃদ্ধ বয়সে বাবাকে একা ফেলে বিদেশ যেতে চায় না সে। এটা কি সত্যি বাবার প্রতি ভালোবাসা নাকি অন্যকিছু তা শুধু ও নিজেই জানে।
বাবাও আর জোর করেননি। এভাবে কাটে তোরাব আলীর দিন।
.
আর জোনাব আলীর দিন কাটে ঘরে শুয়ে-বসে। কোনো কাজ নেই। কিইবা করবে।
পৃথিবী যে বৃদ্ধ মানুষ দের কে শুধুমাত্র বৃদ্ধই বলতে শিখিয়েছে। সকালে যার কাঁধে পা রেখে উপরে উঠলো, আর বিকেলেই তাকে ভুলে গেল!
হায় বিধি তোর লীলাখেলা,
বোঝা সাধ্য কার!
.
মেয়েরা কখনো বেড়াতে এলে নাতি-নাতনির সাথে গল্প করা, হাসি ঠাট্ট করা ইত্যাদি চলে থাকে।
আর যখন তারা থাকেনা তখন জোনাব আলীর অবসর সময়ের সাথী হয় সাজু। পুরো নাম সাজিদা।
জমিদারবাড়ির বাবুর্চির, মা মরা একমাত্র মেয়ে। বারো ছেড়ে তেরোতে পা রেখেছে সবেমাত্র।
.
না না, ভুল বলেছি। নাতি নাতনি না থাকলে নয় শুধু, বরং তারা থাকুক না থাকুক সবসময়ই সাজু জোনাব আলীর খুব ভালো বন্ধু।
.
সাজু নামটাও জোনাব আলী তালুকদারেরই দেওয়া। আদর করে বাবা করিম মিঞাও সাজু বলেই ডাকেন।
সাজু জোনাব আলীকে নানা বলে ডাকে।
আর জোনাব আলী সাজুকে ডাকে ছোটগিন্নী নামে।
.
২-
.
ছোট বেলা থেকেই সাজুকে কখনো মায়ের অভাব বুঝতে দেননি করিম মিঞা। সাজুর বয়স যখন তিন বছর তখন ওর মা মারা যায়। সাজুকে নিয়ে করিম মিঞা থাকতোও অন্য গাঁয়।
সাজুর মা মারা যাওয়ার পর সেখানে এখন আর আপন বলতে কেউ নেই।
তাই এখানে চলে আসা। এখানেও যে আছে তাও নয়। কিন্তু, একটা কাজের সাথে সারাদিন ব্যস্ত থাকতে পারে, মেয়েটাকেও সারাদিন কাছে কাছেই রাখতে পারে। এমনকি মেয়েটাকে এত ভালো একজন বন্ধু দিতে পেরেছে, এটাই তার স্বস্তি।
.
সারাদিন কাজ শেষে করিম মিঞা সন্ধ্যায় ফেরে নিজ গৃহে। নিজ গৃহ বলতে জমিদারমহলেরই এক আলাদা ভবন। একসময় যেটা শুধু বাড়ির কাজের লোকদের জন্যই ব্যবহার করা হতো।
এখন অবশ্য লোকজনের পাশাপাশি স্টোররুম হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। কেননা জমিদার বাড়ির কাজের লোক যে আর আগের মতো নেই।
.
এক সন্ধ্যায় কাজ সেরে ঘরে ফেরে করিম মিঞা। ঘরের প্রাথমিক সকল কাজ সেরে মেয়েকে কাছে নিয়ে বসে সে।
সারাদিনের জমানো সব কথা একে অপরের কাচগে ব্যক্ত করার সময় এখন। না না, এখন না। খানিক পর।
এখন তো খাওয়া দাওয়ার সময়।
খেতে বসে নিজ হাতে মেয়েকে খাইয়ে দেয় করিম মিঞা। খাইয়ে দেয় আর মাঝেমাঝে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
কখনো কখনো আনমনা হয়ে কি যেন ভাবে। আবার মেয়েটার ডাকে সম্বিৎ ফিরে পায়।
.
সাজুও মাঝেমাঝে বাবাকে খাইয়ে দেওয়ার জন্য হাত বাড়ায়। করিম মিঞা সাগ্রহে খাবার মুখে পুরে নেয়। এভাবেই চলে মেয়ে আর বাবার দুঃখ সুখের দিনগুলো।
.
খাওয়া দাওয়া শেষ করে এসে বিছানায় গা টা এলিয়ে দেয় করিম মিঞা। দরজা জানালা এগিয়ে দিয়ে এসে বাবার কোলের কাছেই শুয়ে পড়ে সাজু। বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে।
নিরবতা ভেঙ্গে সাজু বলে ওঠে,
-আইচ্ছা বাজান, রাইত অয় ক্যান!
-রাইত না অইলে যে মা আমরা কাম থেইক্যা আজুর পাইতাম না, ঘরে ফিরব্যার পারতাম না। আর, আমি তরে এমনে আদর কইরা ঘুমও পাড়াইতে পারতাম না।
বাবাকে জড়িয়ে ধরে সাজু বলে,
-ঠিকই কইছো বাজান, রাইত না অইলে যে আসমানে মা রেও দেখবার পারতাম না।
মেয়ের কথা শুনে চুপ হয়ে যান করিম মিঞা। কিছুক্ষণ জড়িয়ে ধরে থেকে উঠে পরে সাজু। দরজা খুলে বাইরে গিয়ে দাঁড়ায় ও। বাঁধা দেন না করিম মিঞা। কারন এটা যে ওর প্রতিদিনের নির্দিষ্ট একটা কাজ।
.
কিছুক্ষন পরে কাঁদোকাঁদো চেহারা নিয়ে ফিরে আসে সাজু। বাবাকে জড়িয়ে ধরে সত্যিই কেঁদে ফেলে সে।
কান্নার কারনটা করিম মিঞার অজানা না। তবুও আবার জানতে জিজ্ঞাসা করলেন,
-মা সাজু। কি অইছে মা! কান্দোস ক্যান!
সাজু কান্নাজড়িত কন্ঠে জবাব দিলো,
-বাজান, আইজ মা আসমানে নাই ক্যান!
করিম মিঞা মেয়ের কথার জবাবে বললো,
-মা রে, আইজ দেখলিনা বাইরে কি আন্ধার। আইজ অইলো অমাবস্যাতিথি। তিথি মানে অইলো রাইত। আইজকার রাইতে সবাই বাইরে বারাইতে ভয় পায়। তোর মা যদি আসমানে আসে তাইলে তো তুই সারারাত গিয়া মা রে দেখবি। কিন্তু, তুই যদি ভয় পাস তাইলে তোর মায়ের যে খুব চিন্তা অয়। এই জন্যেই তো আইজকার রাইতে তোর মা আসে না। বুঝছোস!
ফোঁপাতে ফোঁপাতে অস্পষ্টভাবে হু বলে জবাব দেয় সাজু।
কাঁধ থেকে সাজুর মাথা টা নামিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয় বাবা করিম মিঞা।
আনমনে কিছু একটা ভাবতে ভাবতে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো সে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে সাজু।
মেয়েকে কাঁথা দিয়ে ঢেকে দিয়ে নিজেও শুয়ে পড়ে পাশেই।.
.
৩-
.
-কি রে সাজু, কেমন আছিস!
সাজুর হাত থেকে চায়ের কাপ নিতে নিতে বললো তোরাব আলী তালুকদার।
-এইতো মামা, ভালাই আছি। তয় মনডা ভালা নাই। জবাব দেয় সাজু।
-কেন! এইটুকু মানুষের আবার মনও খারাপ হয় নাকি! মন খারাপ কেন!
-জানিনা মামা। বিষন্ন মনে জবাব দিয়ে চলে গেলো সাজু।
চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সাজুর দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে মুখে একটা রহস্যময় হাসি দিলো তোরাব।
_
.
-নানা, নানী মইরা যাওয়ার পর আর বিয়া করেননাই ক্যান!!
জোনাব আলীর মাথা টিপে দিতে দিতে বললো সাজু।
একটু দুষ্টামি হাসি হেসে জোনাব আলী বললেন,
-আরেকটা বিয়ে করলে কি আর ছোটগিন্নীর সেবা পেতাম রে!! হে হে হে।
সাজুও লজ্জায় হি হি করে হেসে উঠলো।
বাড়ির বাগানের কাজ করছিলো করিম মিঞা। মেয়ের হাসিখুশি মুখটা দেখে তার প্রান টা যেন জুড়িয়ে যাচ্ছিলো।
মা মরা মেয়েটাকে নিয়ে সবসময় চিন্তায় থাকে, যতদিন না তার নায্য অধিকার দিয়ে সৎপাত্রে পাত্রস্থ করতে পারছে, ততদিন যেন তার মরেও শান্তি নাই।
মেয়ের হাসিমাখা মুখটা আরেকবার দেখে কাজে মন দিলো সে।
.
.
-সাজু, খাইছিস সকালে!
জিজ্ঞাসা করলো তোরাব।
-হ মামা, খাইছি।
জবাব দিলো সাজু।
-কি রে সাজু, তুই না দিন দিন অনেক সুন্দর হচ্ছিস রে!!
বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল তোরাব।
অবাক হয়ে তোরাব এর দিকে তাকিয়ে ভাবলো, "মামা হঠাৎ এ কথা বলছে কেন!"
ঘর ঝাড়ুর কাজ শেষ, বের হয়ে যাচ্ছিলো সাজু।
তোরাব ডাক দিয়ে বললো,
-চায়ের কাপটা নিয়ে যা তো সাজু!
-হ মামা, নিতাছি। বলে এগিয়ে গেল সাজু।
.
চায়ের কাপ নেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই সাজুর হাত টা চেপে ধরলো তোরাব। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আবার ছেড়ে দিয়ে বললো,
-সুন্দর বললাম কিছু তো বললিনা!
কিছু না বলেই চায়ের কাপ হাতে নিয়ে দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে এলো সাজু।
.

.
কাজকাম শেষ করে ঘরে ফিরেছে করিম মিঞা অনেক আগেই। আসা থেকেই দেখছে সাজু বাইরে গিয়ে বিষন্ন মনে বসে আছে। কয়েকবার ডেকেওছিলো, কিন্তু ও আসেনি।
এবার আর না ডেকে নিজেই উঠে গিয়ে বসলো মেয়েটার পাশে।
মাথায় হাত রেখে বলে-
-কি রে মা, কি অইছে তোর!
বাবার দিকে তাকায় সাজু। কিছু না বলে মুখটা আবার স্বাভাবিকভাবেই ঘুরিয়ে চুপ করে বসে থাকে।
করিম মিঞা আবার বলে-
-ঘরে যাবিনা!
সাজু এবারো কিছু বলেনা। বাবার দিকে তাকায়ও না।
করিম মিঞা কিছু একটা আঁচ করে উঠে যেতে যেতে বললেন,
-আমি শুইয়া পড়লাম রে মা। তুই বেশিক্ষণ থাকিস না, চইলা আহিস।
কথা টা সাজুর কানে পৌছালো কিনা জানেনা করিম মিঞা।
.
সাজুর এ ধরনের কাজ ই প্রথম না, তাই বাধাও দেয়না করিম মিঞা।
বাবা ঘরে চলে যেতেই সাজু ফিসফিস করে বলতে লাগলো-
-ও মা, তুমি আর আসোনা ক্যান!! আমার এতসব দুঃখের কথা আমি কার কাছে কমু। বাজানের কাছে কইতে শরম লাগে!
ও মা, মা!!!
এতটুকু বলেই ডুকরে কেঁদে ওঠে সাজু। ভাঁজকরা দুই হাঁটুর মধ্যে মাথা গুজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে ও।
.
আজ কেন যেন সাজুর মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে করিম মিঞার। মেয়েটা বড় হয়ে গেছে। শরীরের গঠনে, আচার আচরনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এই সময়টায়ে মেয়েদের পাশে মায়ের উপস্থিতি যে খুবই দরকার। মেয়েকে মাঝে মাঝে বলেন আলাদা ঘরে শোওয়ার কথা, কিন্তু মেয়ে যেন বাবাকে ছাড়া থাকতে নারাজ। বাবাও মেয়েকে আলাদা একা ঘরে রেখে মনে স্বস্তি পাননা।
নানান কিছু ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে গিয়েছিলো করিম মিঞা নিজেও জানেনা।
ফজরের আজান কানে আসতেই ঘুম ভেঙ্গে গেল। পাশ ফিরে মেয়েকে না দেখে মুখে চিন্তার ছাপ পড়লো।
ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে এসে দেখে সাজু তখনো সেই আগের জায়গায়ই বসে আছে। আনমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
আবারো রাতের কথা মনে পড়লো। মেয়েটা আজকাল মাকে একটু বেশিই খোঁজে।
মেয়েকে তুলে ঘরে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো-
-মা রে, তোর কি অইছে মা! তোর মায়ের অভাব তো আর পূরন করব্যার পারবোনা, কিন্তু তোর মায়ের দায়িত্ব যে আমারই পালন করা লাগবো।
উত্তর না দিয়ে চোখ বুজে ঘুরে শোয় সাজু।
কাঁথাটা মেয়ের গায়ে চড়িয়ে দিয়ে মাথায় আরেকবার হাত বুলিয়ে দিয়ে নামাজ পড়তে যায় করিম মিঞা।
.

.
-কি রে সাজু, আমি ডাকলে আমার কথায় যেন পাত্তাই দিসনা যে!
তোরাবের ঘরে দুপুরের খাবার দিতে এসেছে সাজু। ঘরে ঢুকতেই অনেকটা ধমকের সুরে কথাটা বললো তোরাব।
-মামা, আপনে আমার লগে এমন করেন ক্যান!
-কেমন করি!
-আমি জানিনা।
-আরেবাবা, আমাকে মামা ডাকিস। আমি কি ভাগ্নি হিসেবে তোকে আদর করতে পারিনা!
আয়, কাছে আয়!
বলল তোরাব।
ভয়ে ভয়ে কাছে গেলো সাজু।
সাজুর কপালে একটা চুমু দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো-
-যা, গিয়ে খাওয়া দাওয়া কর। বিকেলে এসে বাসন নিয়ে যাস।
-আইচ্ছা মামা।
বলে চলে গেলো সাজু।
পেছন থেকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে রইলো তোরাব।
.
সাজু কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে গেছে। কি যেন অজানা একটা ভয় তার মন থেকে কেটে গেছে। মনটা বেশ খুশি খুশি।
খাওয়া দাওয়া করে অনেকক্ষন রুমাল সেলাই করেছে। বাবার জামাকাপড় পরিষ্কার করে শুকাতে দিয়েছে। আরো কত কি!
করিম মিঞা মেয়ের চঞ্চলতা দেখে মনে মনে বেশ খুশিই হলেন।
.
বিকেলে বাংলো ঘরের বারন্দায় বসে জোনাব তালুকদারের সাথে গল্প করছিলো সাজু।
-আইচ্ছা নানা, তুমি আমার লগে দৌড়ে পারবা!!
হাসি দিয়ে জোনাব তালুকদার বললো-
-কি যে বলিস না! ছোটবেলায় স্কুলে পড়তে কতবার যে পুরষ্কার পাইছি। এখন তো বুড়া হয়ে গেছি। এখন কি আর সেই খেই আছে রে!
সাজু জোরে হেসে বললো-
-হে হে হে, তাইলে তুমি স্বীকার করলাই তুমি পারবা না, পারবা না।
সাথে জোনাব তালুকদারও হেসে উঠলো।
-
-
-মামা, ভিতরে আসি!
-কে, সাজু! আয় আয়।
-মামা, বাসন নিতে আইছিলাম।
-ও হ্যা, নিয়ে যা।
আচ্ছা, একটু এদিকে আয় তো!
-কি মামা!
-মাথা টা খুব ব্যাথা করছে। একটু টিপে দিয়ে যা তো।
-আইচ্ছা মামা।
-আর শোন, দরজা টা লাগিয়ে দিয়ে আয়।
-ক্যান মামা!
-আলো ভালো লাগছেনা।
-ও আইচ্ছা।
দরজা চাপিয়ে দিয়ে তোরাবের মাথার কাছে গিয়ে বসে মাথা টিপে দিতে লাগলো সাজু।
চুপচাপ মাথা টিপে যাচ্ছে সাজু। বললো-
-এহন কেমন লাগতাছে মামা!
-হুম, ভালো লাগছে।
-আমি কি এহন যামু!
-না, আরেকটু দিতে থাক।
-আইচ্ছা।
_
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ সাজুর হাতের কবজি চেপে ধরে তোরাব।
সাজু অবাক হয়ে বলে-
-মামা আপনের কি খারাপ লাগতাছে!
মুখে কিছু না বলে উঠে বসে তোরাব।
সাজুর হাতের কবজি ছেড়ে কাঁধে হাত রাখে সে।
সাজু ভয় পেয়ে বলে-
-মামা, আপনে কি করতাছেন!
মামা, মামা..... মামা
.
বাজা...............................
ডাকটা পুরো শেষ হওয়ার আগেই মুখটা চেপে ধরে তোরাব।
.
.
জ্ঞান ফিরে নিজেকে দেখে নিজেই অবাক হয়ে গেল সাজু। একটা মানুষ কতটা পাষান হলে এভাবে একটা অসহায় মেয়েকে নির্যাতন করতে পারে!
ডুকরে কেঁদে উঠলো সাজু।
নিজেকে ঠিক করে নিয়ে উঠে দৌড় দিতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল মেঝেতে।
অসম্ভব যন্ত্রনায় হাঁটাও কষ্টকর অথচ ও চেষ্টা করছে দৌড়াতে।
আস্তে আস্তে উঠে ঘর থেকে বের হয়ে চলে যায় সাজু।
পেছন থেকে তোরাব বাঁকা চোখে তাকিয়ে সেই রহস্যময় হাসি হাসতে থাকে।
.

.
অসময়ে মেয়েকে শুয়ে থাকতে দেখে অবাক হলো করিম মিঞা।
কাছে গিয়ে মুখের দিকে তাকাতেই দেখে সাজুর চোখে পানি।
কপালে হাত দিতেই যেন করিম মিঞার হাত যেন পুড়ে যাচ্ছিলো।
তাড়াতাড়ি করে ঘর থেকে বের হয়ে যায় তোরাব মিঞা। হাতে নিয়ে ঔষধ আর কিছু সস্তা ফল।
.
মেয়েকে নিজ হাতে খাইয়ে দিয়ে ঔষধ খাইয়ে দিলো।
আনমনে মাথায় হায় বুলিয়ে দিতে দিতে ভবাছিলো আর অবাক হচ্ছিলো, এই অসময় কেন মেয়েটার গায়ে এত জ্বর!!
জ্বরে তো গা টা পূড়ে যাচ্ছেই, দেখেও মনে হচ্ছে যেন দূর্বলতা একেবারে গ্রাস করে নিয়েছে।
.
মেয়ের মুখের দিকে তাকায় করিম মিঞা।
একনজরে একদিকে তাকিয়ে আছে, চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছে তো ঝরছেই।
আবারো অবাক হলো করিম মিঞা।
মাথায় কিছুক্ষণ হাত বুলিয়ে দিয়ে কি কাজে যেন উঠে গেল।
.
সাজুর মনজুড়ে যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে। না পারছে সইতে, না পারছে কাউকে বলতে।
মায়ের কথা বারবার মনে পড়ছে। কিন্তু এটা ভেবে শুধু অশ্রুবিসর্জন দিয়েই চুপ করে আছে যে, যতই মা কে ডাকুক না কেন মাকে পাওয়া যে সম্ভব না।
.
ভাবতে ভাবতে অস্ফুটভাবে তিনবার মা ডাকতে ডাকতে কণ্ঠটা মিলিয়ে গেল, চোখটাও বুজে গেল।
.

.
প্রায় সপ্তাহখানেক কেটে গেছে। সাজুর জর এখনো কমবার নাম নেই। করিম মিঞার চিন্তা যেন বেড়েই চলেছে।
চঞ্চল, দুরন্ত মেয়েটা কেমন একেবারে নিস্তেজ হয়ে গেছে এই কদিনেই। কথা বার্তা বলেনা বললেই চলে। ইচ্ছে হলে খায়, আর না হলে শত জোরাজুরিতেও কাজ হয়না।
.
সারাদিন ঘরের ভেতরে শুয়ে থাকে সাজু।
বাবা মাঝে মাঝে কাজের ফাঁকে এসে দেখা করে যায়। মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিয়ে আবার কাজে চলে যায়।
.
জোনাব আলী তালুকদার মাঝে মাঝে এসে অনেকক্ষণ বসে থাকে সাজুর মাথার দিকটাতে।
মাথায় বিলি কেটে দেয় আর বলতে থাকে-
-কি রে ছোটগিন্নী, তুই উঠবিনা!! আমার সাথে আর কেউ গল্প করেনা। তুইও করবিনা!! বিকেলে আমার আমার মাথাটা আর কেউ টিপে দেয়না। তুইও দিবিনা!!
জোনাব আলীর কথা শুনে ঘাড় তুলে ছলছল চোখে একটু তাকায়।
আবারো চোখ বন্ধ করে সরিয়ে নেয় অন্যদিকে।
.
.
মাস পুরেছে দুদিন হলো। সাজুর জর কমেছে আজ বারোদিন।
শরীরের অবস্থা আগের চেয়ে অনেকটা ভালো, কিন্তু কথা বলা আর খাওয়ার পরিমান টা প্রথম দিককার মতই আছে।
.
বেশিরভাগ সময় ঘরেই থাকে। দুপুরে গোসলের পর ভেজা কাপড় মেলতে ছাদে যায়, আর বিকেলে শুধু বাংলোর বারান্দায় বসে জোনাব আলীর অলস সময়টাকে একটু সংগ দেওয়া।
শুধু সংগ দেওয়া পর্যন্তই, আর আগের মত ঠাট্টা মস্করা হয়না। জোনাব আলী কিছু বললেও বড় মানুষের মত একটা ভাবগম্ভীর হাসি হাসে।
.
রাত এলে এখন আলাদা ঘুমায় সাজু।
ওর আর ভয় করেনা। আর কিসেরই বা ভয় করবে। যা ছিল, সবই তো শেষ। যা হবার তা তো হয়েই গেছে, আবার যদি হয় এর চেয়ে বেশিকিছু তো আর হবেনা।
.
সাজু আর বাইরে বসে আসমানে মাকেও খোজেনা।
খুজেইবা কি করবে! এ মুখ যে ও ওর মাকে দেখাতে পারবেনা।
মাকে তখন অনেককিছু বলার ছিলো, কিন্তু এখন আর কিইবা বলবে!
সবই তো শেষ।
.
ওদিকে চরম উৎকণ্ঠায় রাত কাটে করিম মিঞার। মেয়েটার কি হলো না হলো, কি করবেন না করবেন, কোনো কূল খুজে পাননা তিনি।
এভাবেই নানা ঘোর আর ভাবনার মাঝেই কাটতে থাকে অস্বাভাবিক নতুন দিনগুলো।
.

.
আরো অনেকগুলো দিন পার হয়ে গেছে। সাজু আর আগের অবস্থায় ফেরেনি।
জ্বর টা সেরে গেছে ঠিকই কিন্তু ঘর থেকে খুবেকটা বের হয় না, কারো সাথে খুবেকটা কথাও বলেনা।
এদিকে করিম মিঞার চিন্তাও কমবার নাম গন্ধ নেই। মা মরা মেয়েটার এ দশা দেখে কখনওই মনের ভেতর থেকে দুশ্চিন্তা শেষ হয় না।
জোনাব আলীও যেন এ চিন্তায় ই বেশি চিন্তিত থাকেন। বুড়ো বয়সে একটা এত ভালো একটা বন্ধু পেয়ে, তার এ অবস্থা দেখে নিজেও মাঝে মাঝে ভেবে কুল পাননা।
.
তোরাব আলী দেড়মাস হলো শহরে গেছে বিশেষ কোনো কাজে। দুইদিন বাদে ফিরবে।
বাড়িতে শুধু জোনাব আলী, করিম মিঞা আর সাজু। এই তিনজন।
কিন্তু সাজু যেন থেকেও নেই।
.
বাড়িটা একেবারে ফাঁকা ফাঁকা লাগে জোনাব আলীর কাছে।
এখন তিনি নিজেও আর বাংলোয় গিয়ে বসেন না।
বিকেলটা হয় বাজারে আর না হয় ঘুমিয়েই কাটিয়ে দেন।
.
.
-মা, কি অইছে তোর মা! এমন করতাছোচ ক্যান! মা সাজু!!
সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে বাগানে কাজ করার সময় সাজুর চিৎকার শুনতে পায় করিম মিঞা। কাজ ফেলে দৌড়ে ছূটে আসে।
এসে দেখে সাজু ঘরের বাইরে বসে বমি করছে। মেয়েকে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বাবা। বাবার কোলেই মাথা ঘুরে পড়ে যায় সাজু।
ঘরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে মুখে পানির ছিটা দেয় করিম মিঞা।
এরই মধ্যে বড় মহল থেকে ছুটে চলে এসেছে জোনাব আলী।
জ্ঞান ফিরেই আবারো বমি বমি ভাব নিয়ে ওয়াক করতে থাকে সাজু।
জোনাব আলী করিম মিঞাকে বলে-
-করিম, তাড়াতাড়ি যাও, ডাক্তার নিয়া আসো।
-আইচ্ছা হুজুর। বলেই মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে চলে গেল করিম মিঞা।
সাজুর শিয়রে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন জোনাব আলী।
.
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার নিয়ে ফিরে এলো করিম মিঞা।
তাড়াতাড়ি করে ডাক্তার সার্বিক শারীরিক পর্যবেক্ষণ করে কিছু ওষুধ লিখে দিলেন আর বললেন-
-ভয়ের কিছু নেই। আমার সাথে একটু বাইরে আসুন।
বলে নিজের ব্যাগ গোছাতে লাগলো ডাক্তার।
-আইচ্ছা। বলে ডাক্তারের ব্যাগটা হাতে নিয়ে ডাক্তারের সাথে বাইরে চলে গেলো করিম মিঞা।
.
সাজুর শিয়রেই বসে আছে জোনাব আলী। মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। সাজু কখনোবা চোখ বুজে আছে, আর কখনোবা চোখ খুলে আনমনে একদিকে তাকিয়ে আছে।
.

.
মাঝরাত ছুঁই ছুঁই। বারান্দার খুঁটির সাথে হেলান দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে আছে।
হয়তো সাজুর মাকে খুজছে। মনে হয় প্রশ্ন করবে ডাক্তার যা বলেছে তা সম্পর্কে সে কিছু জানে নাকি!
যদি জানে তবে তাকে বলেনি কেন!!
.
নাহ, এরকমটা কিছুই না।
ডাক্তারের কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেছে করিম মিঞা। যেন মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে।
কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছে।
.
সন্ধ্যায় ডাক্তারের সাথে বাইরে যাবার পর ডাক্তার বলছিলো-
-এত ছোট মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন কেন!
করিম অবাক হয়ে সত্যিটা লুকিয়ে বললো-
-ক্যান স্যার!
-এতো ছোট বয়সে মেয়েদের গর্ভধারণ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এতে জীবন মরনের আশংকা থাকে।
ডাক্তারের কথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়ে করিম মিঞা। ডাক্তার কি বলতে চাচ্ছে তা বুঝতে আর বাকি নেই তার। তবুও সত্যটা চেপে গেলো করিম মিঞা।
ডাক্তার সাহেব আবারো বললো,
-কিছু ঔষধ লিখে দিয়েছি। অনেকদিন খাওয়াতে হবে। আল্লাহ আল্লাহ করেন।
আর শেষফল যাই হোক, পুরোটাই ভাগ্যের পরিনতি। শুধু ঔষধ গুলো ঠিকমতো খাওয়াবেন।
অনেক কষ্টে করিম মিঞা শুধু এতটুকুই বললো-
-আইচ্ছা।
ডাক্তারকে পৌছে দিয়ে ফিরে এসে সেই যে বসেছে, আর উঠেনি।
.
করিম মিঞা ফিরে আসার বেশ কিছুক্ষণ পর জোনাব আলী চলে গেছে।
ঘরে একা একা ঘুমাচ্ছে সাজু।
.
কতক্ষন এভাবে যে বসে আছে, জানেনা করিম মিঞা।
ঘাড়ে কিছুর স্পর্শ পেয়ে ফিরে তাকাতেই দেখে সাজু দাঁড়িয়ে আছে।
করিম মিঞা দ্রুত সাজুকে পাশে বসিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো।
বাবার সাথে নিজেও কাঁদছিল সাজু।
.
খানিকক্ষণ পর করিম মিঞা সাজুকে জিজ্ঞাসা করলো-
-মা সাজু, মা আমার! তোর এ সর্বনাশ কে করছে মা!
ফোঁপাতে ফোঁপাতে সাজু বললো-
-বিশ্বাস করো বাজান, আমার কোনো দোষ নাই। মামায় আমারে..............
এতটুকো বলেই কেঁদে ফেললো সাজু।
মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে নিজেও কেঁদে ফেললো করিম মিঞা।
.
.
খুব সকালে করিম মিঞার ঘরে এসে হাজির জোনাব আলী।
-করিম মিঞা, ও করিম!!
-হুজুর এতো সকালে আপনে!
অবাক হয়ে বললো করিম মিঞা।
-কাল ডাক্তার কি বলে গেলো কিছু তো বললেনা!
জিজ্ঞাসা করলো জোনাব আলী।
ডুকরে কেঁদে উঠে মাটিতে জোনাব আলীর পায়ের কাছে বসে পড়লো করিম মিঞা।
কাঁদতে কাঁদতে বললো-
-হুজুর, আমার মেয়ের সর্বনাশ হয়ে গেছে হুজুর!
অবাক হয়ে জোনাব আলী বললো-
-মানে!!
এর মধ্যে ঘুম থেকে উঠে চলে এসেছে সাজু।
.
.
এতক্ষন বাংলোর বারান্দায় বসে সাজুর মুখ থেকে সব শুনলো জোনাব আলী।
সব শোনার পর যেন সেও বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে।
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলো সাজু।
কাছে ডেকে বুকে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন জোনাব আলী।
করিম মিঞা বলে উঠলো-
-হুজুর, আমার মাইয়ার জীবনডা তো শ্যাষ অইয়া যাইবো হুজুর। হুজুর, আপনি কিছু একটা করেন! আমার মাইয়ার এই সর্বানাশের নায্য বিচার করবেননা হুজুর!!
বলেই কান্না করে ফেললো করিম মিঞা।
-আমি বেঁচে থাকতে কারো প্রতি অবিচার হয়ে দেবোনা।
কঠিনভাবে কথাটা বলে বারান্দা থেকে উঠে চলে যায় জোনাব আলী।
বাবা-মেয়ে চুপ করে বসে বসে তার যাওয়ার দৃশ্যই দেখে যাচ্ছিলো।
.
১০
.
জোনাব আলীর কফিনের পাশে বসে কাঁদছে করিম মিঞা।
চুপ করে বসে বসে অশ্রুবিসর্জন দিচ্ছে সাজু।
কাল রাতে ভবের মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন জোনাব আলী।
হয়তো ছেলের এতবড় অপকর্মের কথা শুনে নিজেকে আর এপারে ধরে রাখতে পারেননি।
অথবা সাজুকে ন্যায্য বিচার দিতে পারবেনা বলে তাকে দেওয়া কথাই রেখেছে।
.
বাবার মৃত্যুর খবর শুনে শহর থেকে ছুটে এসেছে তোরাব।
কিছুক্ষন চুপ করে কফিনের পাশে বসে ছিলো।
তারপর আবার উঠে কোথায় যেন গেলো।
জোনাব তালুকদারের মেয়েদুটোও এসেছে। আসার পর থেকেই কফিনের পাশে বসে বিলাপ করছে। ছোট ছোট নাতি নাতনিগুলোও মায়েদের সাথে বসে কেঁদে যাচ্ছে সমানভাবে।
.
মসজিদে জোনাব আলীর জানাজা সময় ঘোষনা হচ্ছে।
ঘরের ভেতর বসে বসে কেঁদে যাচ্ছে সাজু।
আর ওদিকে ভেজা চোখেও মনিবের শেষকৃত্যের জোগাড় করে যাচ্ছে করিম।
এদের কান্না কি মনিব বা বন্ধু হারানোর জন্য, নাকি নায্য বিচার না পাওয়ার জন্য, এর উত্তর হয়তো ওরা নিজেরাও দিতে পারবেনা।
.
বিকেল হয়ে এসেছে। জোনাব আলীর দাফন শেষ হয়েছে দুপুর পরেই। বিশাল মহলের সামনে বিশাল উঠানের ঠিক মাঝখানে দাফন করা হয়েছে তাকে।
বাবার শেষকৃত্য শেষ করে আবার শহরে ফিরে যাচ্ছে তোরাব।
তোরাবের সেই বাঁকা চাহনি আর রহস্যময় হাসিটা এখনও যায়নি।
.
মেয়েরা যাবেকিনা জানেনা করিম মিঞা। তবে যতদূর সম্ভব মেয়েরা বেশ কিছুদিন থাকবে। কারন বাবার প্রতি ভালোবাসাটা নাকি মেয়েদের একটু বেশিই হয়।
.
খাওয়া দাওয়ার আয়োজন তেমন কিছু নয়, যা না হলেই নয় এমন আয়োজনই হয়েছে।
খাবার ব্যাপারে কারো তেমন কোনো আগ্রহ নেই বলেই মনে হচ্ছে।
বাচ্চারা বাদে আর কেউই খেতে এলো না। শেষবারের মত সবাইকে ডেকে খাবারের ঘর বন্ধ করে চলে গেলো করিম মিঞা।
.
.
ঘরে গিয়ে সাজুকে পেলোনা করিম মিঞা। বাইরে গিয়েও না পেয়ে ভাবলো এত আগে তো সাজু কখনওই ঘুমাতে যায় না। শরীর-টরীর কি বেশি খারাপ করলো নাকি!
সাজুর ঘরের দিকে পা বাড়ালো করিম মিঞা।
.
.
১১
.
করিম মিঞার চিৎকার শুনে ছোটবড় সবাই ছুটে এসেছে। আকাশচুম্বী চিৎকারে যেন মহলেও ফাটল ধরে গেছে।
সাজুর লাশের পাশে বসে আপন মনে আহাজারি করছে করিম মিঞা।
মাঝেমাঝে কিছুটা পাগলের মত প্রলাপও বকে যাচ্ছে।
শান্তনা দিতে কেউ এগিয়েও যাচ্ছেনা। কারন সবাই জানে এখানে শান্তনা মানেই আগুনে ঘি ঢালা।
.
সাজুর ঘরে ঢুকতেই মেয়েকে ছাদের রডের সাথে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলতে দেখে চিৎকার দেয় করিম মিঞা।
চিৎকার শুনে সবাই এগিয়ে আসে।
চিৎকার দেয়ার পর থেকেই পাগলের মত প্রলাপ বকতে শুরু করেছে করিম।
.
কেও জানেনা এ মৃত্যুর কারন কি! সবারই জানার অন্তরালে রয়ে গেল সত্যটা।
আর করিম মিঞা! সেও জানেনা। কারন সেও এখন দোটানার মাঝে।
বন্ধুবিচ্ছেদের ধাক্কা সইতে না পারা নাকি অপারে গিয়ে নায্য বিচারের জন্য ধরা!
.
.
রাতেই দাফনের আয়োজন করা হলো।
জোনাব তালুকদারের মেয়েদের অনুরোধ করে তার কবরের পাশেই কবর দিবে বলে সিদ্ধান্ত হলো।
মেয়েকে নিজ হাতে কবর দিতে গিয়ে বারবার ডুকরে কেঁদে ফেলছিলো করিম মিঞা।
দাফন শেষ করে কাঁদতে কাঁদতে কবরের পাশেই বসে পড়লো।
.
মাঝরাত পেড়িয়ে গেছে। সবাই যার যার মত চলে যাচ্ছে। শুধু কবরের পাশে করিম মিঞাই বসে আছে।
চারিদিকে শুনশান পরিবেশ।
কাঁদতে কাঁদতে কবরের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়লো করিম মিঞা।
.
.
১২
.
অনেক রাত জাগার কারনে বেশ দেরীতে ঘুম ভাঙলো সবার।
বাড়িটা কেন যেন একেবারেই ফাকা ফাকা লাগছে।
রান্না ঘরের দিকে গিয়ে দেখে ঘর তালা মারা।
করিম মিঞার ঘরে গিয়েও তাকে পাওয়া গেলোনা। সবকিছু ঠিকঠাক আছে। কিন্তু করিম মিঞাকে কোথাও খুজে পাওয়া যায় না।
সকাল পেরিয়ে দুপুর পেরিয়ে বিকেলেও খোঁজ মিললোনা করিম মিঞার।
একদিন, দুদিন করে সপ্তাহ কেটে গেল, করিম মিঞার কোনো খোঁজ মিললোনা।
.
অনেক দিন কেটে গেছে।
জোনাব আলী আর সাজু, দুজনের কবরের উপরেই অনেক ঘাস গজিয়ে গেছে। চারিদিকে দেওয়া বাঁশের বেড়া শুকিয়ে কোথাও কোথাও ভেঙ্গেও পড়েছে।
.
জোনাব আলীর মেয়েরা মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে জমিদার মহলটা সরকারের কাছে হস্তান্তর করেছে।
এখন সরকারের লোকই এর দেখাশোনা করে।
কবরদুটো না বাঁধালেও বেশ বড় জায়গা নিয়ে চারপাশে সীমানা করে দেওয়া আছে, এর ভেতরে প্রবেশ নিষেধ।
.
মানুষজন মাঝেমাঝে বাড়িটাকে পুরাতন সম্পদের নিদর্শন হিসেবে দেখতে আসে।
.
লোকজনের মুখে শোনা যায়, অনেক দূর থেকে দুপুরবেলায় বাড়িটার দিকে তাকালে নাকি তের-চৌদ্দ বছরের কিশোরী মেয়েকে ছাদে কাপড় মেলতে দেখা যায়, কাছ থেকে দেখা গেছে এরকম প্রমান কখনওই মেলেনি।
.
.
---স।মা।প্ত---
.
লিখেছেনঃ Zaid Hasan Zoha

āĻ•োāύ āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āύেāχ:

āĻāĻ•āϟি āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āĻĒোāϏ্āϟ āĻ•āϰুāύ