১।
জয়িতার দিকে মুগ্ধতা নিয়ে তাঁকিয়ে
আছি। তেমন আহামরী কোন কিছুই নেই
মেয়েটার মুখে, ছোট একটা মুখ,
বাঁকানো ভ্রু, তার নিচে মোটা করে
কাজল দেয়া চোখ। প্রতি মুহুর্তে
চোখটাকে কেমন যেন বদলাতে পারে
মেয়েটা, আর এই বদলানোতেই ঘোরে
পড়ে যাই আমি। মোটা কাজল কখনো
কখনো লেপ্টে ঘোরটাকে মায়ায় নিয়ে
যায়। মাঝে মাঝে যখন ফ্রেমের মধ্যে
বন্দ্বী হয়ে যায় চোখ, তখন গুটিশুটি
মারা নাকের উপর বড্ড অভিমান হয়
আমার। এই নাকের উপর বসে থাকা
চশমাটাই যে জয়ীতার চোখের সবচেয়ে
কাছে থাকে। মেয়েটার দিকে একটানা
খুব বেশীক্ষন তাঁকাতে পারিনা আমি,
এজন্যই এত গভীরভাবে মনে রাখতে
পারিনা জয়িতার চেহারাকে। গোল
গাল মুখের উপরের দিকে কিছুটা
কোকরানো চুল পেঁচিয়ে থাকে উড়নায়,
আর মাঝে সাঝে চুল উড়ে এসে পড়ে ঠিক
ঠোঁটের উপর। পুরো নিচের ঠোঁটকে
ঢেকে দেয় চুলের বাঁক, আর অর্ধস্বচ্ছ হয়ে
যায় জয়িতার গাল। তখন হটাত করে চুল
সরাতে গিয়ে যখন মেয়েটা আমার
দিকে তাকায়, কিভাবে যেন বুঝতে
পারে আমাকে। পিচ্চি আঙ্গুল গুলো
তখন আর চুলের বাঁককে সরাতে পারেনা।
জয়িতা কথা বলতে পারে প্রচুর, একটানা
কথা শুনতে শুনতে হঠাতই অনুভব করি
আমি মেয়েটার একটা কথাও শুনিনি।
শুনিনি ঠিক না, আসলে কাঁপা কাঁপা
ঠোঁটের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে
থাকি আমি। ছোট্ট ঠোঁটটার জন্য মায়া
লাগে তখন, দাঁতগুলো মধ্য দিয়ে আসা
পড়ন্ত বিকেলের আলো ছায়ার মাঝে
নিজেকে হারিয়ে ফেলি। আর এই
মুগ্ধতার মাঝেই আমি অনুভব করি আমার
হাতের উপর আলতো চাপ।
- সপ্ত, হাতে খামচি দেই?
- দাও।
ঘোর থেকে জেগেও নির্লিপ্তই থাকি
আমি। নির্লিপ্ত যে থাকতে চাই তা
ঠিক না, কিন্তু নির্লিপ্ত থাকলে
মেয়েটার পবিত্রতাকে অনুভব করতে
পারি আমি। অন্যরকম এক পবিত্রতা,
একটা বাচ্চাকে জন্মের পর যেমন আস্তে
করে ধরে রেখে আদর করা হয়, সেরকম
পবিত্রতা। মুহূর্তেই আমাদের সম্পর্কের
বন্ধনকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাই
আমি, অনেকটা পথ। নিত্য প্রেমের
আবেগ, ভয়ঙ্কর আবেগের স্পর্শ অথবা
জয়িতার জন্য পাগলামী এরকম কোন
অনুভুতিই হয়না। বরং একটা দায়িত্ববোধ
কাজ করে। সপ্ত প্রতিবার নিজেকে
এভাবেই হারায় শনি গ্রহের জাতিকার
উপর। শনির মতই জয়ীতা আমার
চারপাশে বলয় হয়ে থাকে, হয়ত আমার
সম্মতিতে লজ্জাও পায় । তাইত অনুভব
নিয়ে ডাকতে পারে মেয়েটা। শুনতে
ভাল লাগে বলেই হয়ত জানা প্রশ্নটা
বারবার করে, আর বরাবরের মতই উত্তর
দিয়ে যাই আমি।
- সপ্ত, ভালবাসবি তো এরকম?
-বাসব।
এক শব্দের বেশী খুব করে কিছুই বলিনা
আমি জয়িতাকে, শুধু আমার হাতের
উপরে কাঁপতে থাকে হাতটাকে আকড়ে
ধরি। আর তখনি মেয়েটা ক্লান্তির
আবেশ নিয়েই মাথা এলিয়ে দেয়
আমার কাঁধে, পরম নির্ভরতায়। মনে মনে
তখন বারংবার আমি প্রেমে পড়ে যাই
জয়িতার, চুপচাপ বসে থাকি হাত
আঁকড়ে। এরকম বিশ্বাসের জোরকে
ভাঙ্গা কঠিন, খুবই কঠিন। এজন্যই
তাঁকানোর সাহসও হয়না আমার, আমি
জানি মেয়েটার দিকে তাঁকালে এই
নির্ভরতার খুব বেশী প্রতিদান দিতে
পারবনা আমি। তাইত ভুল ক্রমেও কখনো
আমার হাত জয়িতার কাঁধে উঠেনি,
আঙ্গুল কখনো গালের উপর চাপ দেয়নি,
শুধু অনুভবে নিজের হৃদপিন্ডের কম্পন
শুনি । বরাবরের মতই নিস্তব্ধ থাকি
আমি, উদাসীন আর বহেমিয়ান।
বিষন্নতার একটা পরতের পেছনেই
চিরকাল কেটেছে আমার। একগাদা
বিষন্নতার মধ্যে জীবনের স্বাদ খুঁজে
পাই আমি, তাইত বিষন্নতাই নেশার মত
আমার কাছে। রোদেলা দিনেও
বিষন্নতার বর্ষায় নিজেক ভেজাই,
অবাক চোখে জীবনের স্পন্দন অনুভব
করি। আশেপাশের জীবনকে অনেক
ভালভাবেই অনুভব করতে পারি আমি।
নিজেকে এখানেই সুখী লাগে আমার।
চারপাশের মাঝে কেমন যেন এক আকর্ষন
কাজ করে আমার উপর, জীবনের পথে
চলতে থাকা মানুষের চোখে গল্পগুলো
মনযোগ দিয়ে পড়ি। প্রত্যেকের চোখে
গল্প থাকে, হতাশার গল্প, ভালবাসার
গল্প, বেচে থাকার গল্প, মৃত্যুর দিন
গোনার গল্প, বাড়ি থেকে ঝগড়া করে
আসার গল্প, কিশোরের রাস্তায় দেখা
মেয়েটিকে ভাল লাগার গল্প, উপরে
উঠার গল্প, সব হারিয়ে তলিয়ে যাওয়ার
গল্প, অভিমানের গল্প। এই গল্পগুলোর
লোভেই বিষন্নতার কাছাকাছি
থাকতে চাই আমি, একমাত্র বিভ্রমের
জগত থেকেই এই গল্প গুলো পড়া যায়।
আর কিভাবেই যেন এই ব্যাপারটা বুঝতে
পারে জয়ীতা, এই বিভ্রম থেকে কখনই
বের করার চেষ্টা করেনা মেয়েটা। বরং
আমার জগতে ভাগ বসিয়ে হাতের
কনুইয়ের উপর শক্ত করে আকড়ে ধরে,
কান্না থাকেনা চোখে তারপরেও ধরা
গলায় বলে,
-তোমার নিজের জগতেও কখনই একা
ছাড়বনা তোমাকে সপ্ত।
এই ভালবাসায় নিষিদ্ধতার কোন আবহই
আসেনা আমার মাঝে, শুধুই পাশাপাশি
থাকার একটা প্রতিজ্ঞাকে মনে প্রাণে
বহন করি। এজন্যই অনেকটা গোপনেই
হয়ত বারবার বলি, "ভালবাসি, জয়ি।"
২।
উফফ, এই ছেলেটা এমন কেন? এরকম ভাবে
কেউ কারো দিকে তাঁকিয়ে থাকে
নাকি? আমার বুঝি লজ্জা করেনা। এই
ছেলেটাকে কিছুই বুঝেনা, নাকি বুঝেও
অবুঝই থাকতে চায় আমার কাছে। এর
কোন উত্তর কখনই পাইনি আমি, তবে খুব
লজ্জা লাগে সপ্তর ঘোর লাগা মায়া
মেশানো দৃষ্টিতে। অস্বস্তি বা
অস্বাভাবিকতা না, শুধুই লজ্জা,
শিহরণের লজ্জা। তাই মাঝে মাঝে
মুখের উপর বলতে ইচ্ছে হয়, "এভাবে
তাঁকাবা না। " কিন্তু কথাটা বলতে
গিয়ে লজ্জাটা আরেক মুঠো বেড়ে যায়
আমার। আর এজন্যই নিজের লজ্জা অথবা
ছেলেটার ঘোর লাগা দৃষ্টি লুকাতে
চাই আমার চঞ্চলতার আড়ালে। স্থির
পরিবেশকেই অস্থির করে তুলি কথার
ফুলঝুড়ি দিয়ে। কিন্তু লাভ হয় বলে মনে
হয়না আমার, তখন ঘোলা ফ্রেম আরো
মায়া লাগায় আমাকে। একশ কথার
উত্তরে কন্যা রাশির বালকের একটা
শব্দই যেন থামিয়ে দেয় আমাকে।
-"ভালবাসি, জয়ি।"
সপ্ত এমনিতেই বেশ চুপচাপ, আর এই
ঘাটতি অনন্ত প্রচেষ্টা নিয়ে পূরণ করি
আমি। কথার কথকথায় মাঝে মাঝে যেন
গালই ফুলিয়ে বসি, আর তারপর
অভিমানের দৃষ্টিতে ছেলেটার মন ভার
হওয়া দেখি। সেই মুহুর্তেও ভালবাসির
বেশী তেমন কিছুই বলেনা সপ্ত। গুনে
গুনে তিনবার বলে,
-"ভালবাসি, ভালবাসি, ভালবাসব।"
শব্দগুলোর মধ্যে একটা আচ্ছন্নতা আছে।
ইংরেজী আই লাভ ইউ এর মত এতটাও
সস্তা লাগেনা, বরং কেমন যেন
অস্তিত্বে নাড়া দেয়। আর এই একটা
শব্দই যেন শতাব্দীর স্তব্ধতায় ডুবিয়ে
দেয় আমাকে। কিন্তু দস্যি মেয়ে হওয়ায়
এসবে তেমন ধার ধারিনা আমি।
কিছুক্ষনের নিরবতা ভাঙ্গি আমিই।
আমার নিরবতায় ঘোর কাটাতে
পারেনা সপ্তর, যাই করিনা আমি চুপ
করে তাঁকিয়ে দেখে ছেলেটা। অন্যরকম
এক অনুভুতি হয় তখন, কিন্তু কিছুই বলিনা
আমি। অনুভুতির পাল্লাটা যে সবসময়
ভাললাগার দিকেই থাকে। সপ্ত আর
আমি চিরদিনই বিপরীত মেরুর। ওর
ভাললাগে নিরবতা আর আমি গুমরে
মরি স্তব্ধতায়, ছেলেটা ভালবাসে
অগোছালো চুল,কিছু কিছু ভুল, আর আমি
চিরকালই গোছানো স্বভাবের মেয়ে।
যে জিনিসটার সংগায় কোনভাবেই
সপ্তকে ফেলা যায়না সেখানেই
পুরোপুরি আমার সত্তা। ভেবে পাইনা
তখন এই বন্ধনের ভিত্তি। চিন্তার ভাঁজ
যখন কপালে পড়ে ও আস্তে আস্তে বলে
উঠে -
- বিপরীতে আছি বলেই হয়ত দুজনকে
ছাড়া চলবেনা কারোরই।
অবাক হয়ে তখন তাঁকিয়ে দেখি আমি।
মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় বলি,
- এই ছেলে, কেন এত ভালবাসিস
আমাকে?সবকিছুতেই ছায়া হয়ে থাকবি
তো এরকম।
এরকম ভালবাসায় সবসময়ই লোভ লাগে
আমার। পাওয়ার পরও সারাজীবনই কম
পড়বে আমার কাছে। অদ্ভুত ছেলে এই
ভালবাসাটা যে কবে থেকে জমিয়েছে
তাই ভাবি আমি। এজন্যই নিজে আরো
বেশী ভালবেসে যাই এলোমেলো চুলের
পিচ্চি পিচ্চি চোখওয়ালা ছেলেটাকে।
সপ্ত যে খুব ভাল একটা ছেলে তা কখনই
না, বরং ছেলেটা সব কিছু থেকে
আমাকে আগলে নিয়েছে এটাই যথেষ্ট
আমার কাছে। একজীবন শুধু এই আগলে
রাখার উপর নির্ভর করেই কাটিয়ে
দেয়া যায়। মাঝে মাঝে নিজেকে
অনেক বেশী ভাগ্যবান লাগে এই
ছেলেটার জন্য, স্রষ্টার কাছে অন্যরকম
প্রশান্তি জানাই।
শান্ত ছেলেটা মাঝে মাঝে
পাগলামীর সব সীমানা যেন পার করে
ফেলে আমার জন্য। তখন বকুনীর
হেয়ালীতে মুচকী হাসি আমি। কিন্তু
প্রথম যেদিন ছেলেটার পাগলামী
দেখলাম চোখ টা কেন যেন ঝাপসা হয়ে
যাচ্ছিল, পুরো শরীরেই আলাদা একটা
ভয় পাচ্ছিলাম। শত মানার পরেও যখন
আমাকে চমকে দিতে প্রথম দেখা করতে
আসে, সেদিন পাশে দাঁড়ানোর মত
অবস্থাও ছিলনা আমার। চার ঘন্টার
অপেক্ষার পর চার মিনিটও হয়ত দেখা
হয়নি আমাদের, শুধু প্রথম চমকে যাওয়া
ছাড়া। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতে রাস্তার
ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা মাঝে
মাঝেই আড়াল হয়ে যাচ্ছিল গাড়ীর
আড়ালে। সেদিনের বৃষ্টি আমার
চোখের বর্ষার চেয়ে বেশী ছিলনা
কখনই, সপ্ত লজ্জা পাচ্ছিল প্রচুর।
তাকাতেই পারেনি আমার দিকে,
সেদিনটা শুধু ছিল আমার দেখার জন্যই।
কিন্তু মোটা ফ্রেমের আড়ালের
পিচকুটে চোখ আমার বর্ষাকে ঠিকই
দেখেছিল, তাইত সেদিনের পর আর
বর্ষা ঝড়াইনি ছেলেটার সামনে।
ছেলেটা এরকমই, উদাসীনতার মাঝেও
আমাকে আগলে রাখে আলত করে। তাইত
দিনশেষে সবচেয়ে নির্ভরতার জায়গা
ওর মাঝে, ওর কাঁধেই খুঁজে পাই। সত্যি
সপ্তর জন্য, সপ্তর বদলানো দেখার জন্য
ওর পাশে থাকতে চাই প্রতিটা মুহূর্ত।
কৃষ্ণকালো ভ্রু জোড়ার নিচে লুকিয়ে
থাকা চোখেই তাই বারবার নিজেকে
হারাই, চোখ গুলোর দৃষ্টি হয়ত সাড়ে
পাঁচ পাওয়ারেই নিবদ্ধ, কিন্তু এর
মায়াজাল যে আমাকে সংগার বাইরে
নিবিষ্ট করে রেখেছে। আর এই বাইরের
জগত শুধু একটা বাক্য নিয়েই, "ভালবাসি,
সপ্ত।"
.
৩।
আমার আর জয়িতার প্রথম পরিচয়
পুরোটাই এক অজানা জগতে, মুখবইয়ের
কোন এক পেইজের ফ্যান হিসেবে।
পরিচয় থেকে বন্ধুত্বের আগে নিজেদের
মনকে হালকা করাই যেন ছিল
কথোপকথনের উদ্দেশ্য। জয়িতা সবসময়ই
বলত পরিচিত মানুষের চেয়ে অপরিচিত
কারো কাছে নিজেকে মেলে ধরা
অনেক সহজ। তারপর বন্ধুত্ব, কাছে আসা,
আর একে অপরের প্রতি প্রাণখোলা
স্বাধীনতা যে কবে ভালবাসায় বদলে
গিয়েছিল বুঝিইনি আমি। প্রথম
প্রেমের ব্যর্থতা, নিজেকে হারিতে
দেয়া সময়ের বিচ্ছিন্নতায়, বন্ধুত্বের
আড্ডায় বিষন্নতার সাথে যখন শুকনো
আর ভেজা কিছু নেশায় মিশে মিশে
বিষন্নতার অলিগলিতে উকিঝুকি
মারছিলাম তখনি জয়িতা যেন কোথায়
থেকে চলে আসে আমার পৃথিবীতে।
চিরকাল চিরকুমার থাকার মন্ত্র নিয়ে
মেয়েদের যখন একরাশ অবজ্ঞার চোখে
দেখতে থাকি, তখনি এই অষ্টাদশীর
আগমন আমার মত বহেমিয়ান কে গুছিয়ে
নিতে। সময়টাতে কখনই স্বাভাবিক
জীবন আলোড়ন জাগাতো না আমার
মাঝে, অস্বাভাবিক এক নির্লিপ্ততা
নিয়ে মাতালের মত পথ চলতাম।
এলোমেলো প্রতি পায়ে কখনোই
সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছে ছিলনা
আমার, যখন এই মায়াটা চলে যায় তখন
জীবনকে অন্যরকম লাগে। বেঁচে আছি
প্রতিনিয়ত তারপরেও যেন শুধু টিকে
থাকাই, নিজেকে সম্পুর্ণ ছড়িয়ে দিয়ে
টিকে থাকার চেষ্টা। আর এই ছড়ানো
আমাকেই কয়েক মুহুর্তের জন্য গুছিয়ে
নিত জয়িতার অধিকার দেখানো।
কেমন যেন লাগে ভাবলে, কতটা সহজেই
বা আমি পুরোটাই অচেনা হয়ে গেছি
এখন নিজের কাছে। জয়িতার কন্ঠ
যেদিন প্রথম শুনি আমি, কানে শুধু একটা
কথাই ছিল ... কে?
সেদিন থেকে হঠাতই চুপ হয়ে গিয়েছি
আমি, সব অস্থিরতাকে এক বাক্যে
মেয়েটার কাধে চাপিয়ে বিভ্রমের
জগতে বুদ হয়ে থাকার শুরু। তারপর
অগোছালো দিনপঞ্জিতে নতুন এক
কাজের যোগ হওয়া, প্রতিদিনের
মুঠোফোনে এক কিশোরীর উচ্ছলতার
গল্প শোনা। জয়িতার কাছে চিরকালই
এক বিশাল স্বাধীনতার স্বাদ পেতাম
আমি। এজন্যই ভুল পথে গিয়েই বুঝতে
পারি পৃথিবীতে যদি কেউ আমাকে
ফেরাতে পারে তবে সেটা এই মেয়েই।
আর সেদিনই বিভ্রান্ত বালক আর
গোছানো বালিকার প্রণয়ের শুরু।
গল্পটা কখনই সাধারণ ছিলনা আমাদের।
বরং অসাধারণ কঠিন একটা বাউন্ডুলে
গল্পকে টেনে হিঁচড়ে গন্ডির মাঝে
বন্দী করছিল সাধারণ জয়িতা।
মেয়েটার জন্য আমার বদলানোর
প্রচেষ্টার পাশে প্রতিনিয়ত ভুল
গুলোকে মেনে নেয়াটা যেন অভ্যাসই
ছিল জয়িতার। পৃথিবীতে দ্বিতীয়
কোন জয়িতার জন্ম কখনই হবেনা, যে
আমাকে এভাবে সব অবস্থাতেই মেনে
নিতে পারে। সোল মেট নামে যদি কিছু
থেকে থাকে, ভয়ঙ্কর রকম বিশ্বাস করি
এই মেয়েটাই সেই। অন্যরকম এক
পরিকল্পনার মধ্যে দিয়েই হয়ত পরিচয়
আমাদের যা এখনো পুরোপুরিই
সুতোবিহীন ঘুড়ি আমার কাছে। অসম্ভব
রকমের এক শুদ্ধতায় সবসময় আমাকে
ডুবিয়ে রেখেছে জয়িতা। আর তাইত
দিন শেষে বিষাক্ত রক্তও জয়িতার
কাছেই বসে বসে কাঁদত। গুমরে মরতাম
আমি পুরোটাই নতুন হতে। কিন্তু পাপী
যখন পেছন থেকে সামনে এগুতে চায়,
পাপ তখনো ছাড়েনা তাকে। আর
এখানেই মেয়েটা আকড়ে ধরেছে
আমাকে, যখন না পারি তখন জয়িতা
নিজেই এসে পড়ে আমার জগতে।
মেয়েটার কাছে আমার যতটা না
ভালবাসার আবেদন, তার চেয়ে বড়
বেঁচে থাকতে এই মেয়েটাকেই যে
দরকার আমার।
অপেক্ষার প্রহর শেষে মুঠোফোনের
বালিকা যেদিন প্রথম সামনে আসে
আমার, অন্যরকম এক অনুভুতি ছিল। এই
মেয়েটা শুধুই আমার, এরকম অনুভুতি
নিয়েই নিজেকে ভেজাচ্ছিলাম
বর্ষনে। আর গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিকনা যখন
মোটা লেন্স ভেজাচ্ছিল আমার, তখনো
ঝাপসা চোখে দেখছিলাম জয়িতার
চশমার নিচে হাত কাঁপছে। সেদিনটায়
বড্ড খুশীই লেগেছিল আমার, এই
মেয়েটার কান্নাটাও শুধু আমার জন্য।
শুধুই আমার জন্য। পৃথিবীতে নিজেকে
নিয়ে ভাবার সময় যে এসে গেছে
সেদিনই বুঝে গিয়েছিলাম, নিজের
গহীন থেকেই তখন সাহস পাওয়া শুরু।
আর এই কান্নাটা দেখার জন্যই হয়ত
কখনো মেয়েটার হাত ছাড়তে পারবনা
আমি। আস্তে আস্তে বন্ধনের ইটের
গাঁথুনি শুরু হয় তখন থেকেই, আমাদের
চারকোনা দেয়ালে আবদ্ধ জগতের,
গোছানো একটা জগত। আর তাতে গুটি
গুটি পায়ে হাঁটা পিচ্চি পিচ্চি অনাগত
মানুষগুলোর জন্য নিজেদের কে যোগ্য
করা। সেদিন যখন ফিরছিলাম, এসি
বাসের ঠান্ডায় চশমার ঘোলা লেন্সে
বারে বারেই সেই মোটা কাজলের চোখ
দেখছিলাম, সেই চোখের গড়ানো জল
দেখছিলাম আমার বিভ্রমে। সেদিন
থেকে বিভ্রমের জগতেও এই মেয়্বর
আনাগোনা শুরু, তখন থেকেই আমার
চিরপরিচিত মেয়েটার অচেনা হওয়ার
শুরু। আর সেদিনই যেন শক্ত করে বলতে
শিখি, " ভালবাসি, জয়ি।"
৪।
প্রথম দেখার পর থেকেই সপ্তকে
পুরোপুরি নতুন লাগে আমার কাছে।
চেনা জগতের ছেলেটা আমাকে আগের
চেয়ে যেন আরো শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা
শুরু করে। নিজেও যেন মুঠোফোনের
প্রেমিকার চেয়ে অর্ধাঙ্গীর অনুভব
পেতে শুরু করি। চিরকাল বিষন্ন
জানালার পাশে অন্ধকারে বসে থাকা
কিশোর যে তার প্রিয় হেডফোনের
জায়গায় আমাকে বসিয়ে দিয়েছিল তা
অবুঝ বালিকার বুঝতে খুব কষ্ট হয়নি।
তাইত রাতের নির্জনতায় আগে যখন
ছেলেটা পেঁচিয়ে থাকা হেডফোন
কানে গুজে থাকত সেখানে আমার
কথার ঝুলি তার প্রিয় হয়ে যায়। ঘুমন্ত,
শান্ত, দূড়ন্ত সেসব রাতে আমার
বিপরীতে সপ্ত কোন কিছুই বলত না।
হুশে বেহুশে নিজেদের গল্পে বর্ণের পর
বর্ণ বসাতাম আমি। কখনো বা হঠাত
করেই যতি চিহ্নের মত চুপ থাকতাম
দুজনেই। তারপর রাতের অন্ধকারকে
সূর্যের আলো দিয়েই শেষ করতাম
আমাদের স্বপ্নলোকের অভিযাত্রা।
সপ্তকে প্রেমিক হিসেবে যতটা না
দেখেছি আমি, তার চেয়ে বেশী
চেয়েছি ছেলেটা বন্ধুর মত মন খোলা
থাকুক আমার কাছে। তাইত শত
অন্যায়ের পরেও যখন সপ্ত সঙ্কোচের
বিপরীতে থেকে স্বীকার করত আমার
কাছে, আমি নিজের অধিকারের বৃদ্ধি
বুঝতাম ঠিকই। আর সেই অধিকারের
জন্যই ছেলেটাকে বদলাতে চাইতাম
প্রতিবার। এজন্যই ভুলের চেয়ে সপ্তর
বলাটাকেই ভাল লাগত আমার। আসলে
হয়ত ভালবাসার জন্য সেসময় স্বার্থপর
হতে ইচ্ছে হত, একারণে নিজেকে
বুঝিয়ে হলেও আগলে নিতাম সপ্তকে।
আর ছেলেটা তো নিজেকে
গোছাচ্ছিলই আস্তে আস্তে, তাই
কখনোই পুরোপুরি থামিয়ে দিতে
ইচ্ছেই হয়নি আমার।
সপ্ত যখন আমাকে অগোছালো
বহেমিয়ানের গোছানো বালিকা
ভাবত, মনে প্রানে সেই বিশ্বাসটাকেই
তিলে তিলে বড় করতে চাইতাম। সপ্তর
সব সাফল্যের পেছনে ছায়া হয়ে সেই
বিজয়লক্ষ্মী নারী হতে চাইতাম।
মনিজেকে চিরকাল সপ্তসঙ্গীনি
হিসেবেই সাজাতাম, ছেলেটার
অন্ধকারে নিজেকে মানিয়ে নিতাম
চিরসাদা বালিকা হয়েও। নিজেকে
কখনই এতটা চিনিনি আমি, যতটা
ছেলেটা আমাকে চিনিয়েছে। একটা
মেয়ের চেয়ে সপ্তর চিরবিশ্বাসের
পাত্র বলেই হয়ত এতটা সম্ভব হত। আর
তারপর থেকেই পুরো পৃথিবীর বাইরে,
নিজেদের পৃথিবীকে গোছাতে শুরু করি
আমরা। সপ্তর সাহসটাকে নিজের ভেতর
উপলব্ধি করতে পারতাম। এই
উপলব্ধিটার কারণেই সপ্তের কাঁধে
মাথা রেখে নিজের নারীত্বের স্বপ্ন
দেখতাম। নারীত্বকে পূর্নতা দিয়ে মা
ডাক শোনার স্বপ্ন দেখতাম, চিরকাল
ধরে চলে আসা প্রথায়, শ্বশুড়বাড়ি
নামক এক অদ্ভুত পরিবারের বন্ধনে
নিজেকে মানিয়ে নেয়ার কথা
ভাবতাম। এজন্যই হয়ত নিজেকে
উচ্ছলতার আড়ালে লুকানো আমিও,
ধীরে ধীরে বড় হয়ে যাচ্ছিলাম। বুঝতে
পারছিলাম যে নিজেকে কেন যেন
হঠাতই ভাল লাগতে শুরু করেছিল, পুরো
আমাকেই যেন সপ্তর সম্পত্তি ভাবতাম।
উদ্দেশ্যহীন মিছিলে পা বাড়ানোর
চেয়ে তখন পৃথিবীকে বেঁচে থাকার
মায়া দিয়ে প্রানের মোহনায় পা
বাড়াতেই ভাল লাগত। এজন্য বদলাতে
থাকা কিশোরের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া
দায়িত্বর পুরোটা আমিও অনুভব করতে
শিখি। আমার মায়ের মেয়েটা তাই
হয়ত ততদিনে সপ্তর মায়ের ছেলের বউ
হয়ে যাচ্ছিল প্রতিদিন একটু একটু করে।
ঝগড়া, অভিমান, অনুরাগ চিরদিনই
বেশী ছিল আমার। বেশী ছিল শুধু সপ্তর
জন্যই, আর তখন থেকেই দেখি যে
আমাকে বুঝতে পারা ছেলেটার কাছে
আস্তে আস্তে রহস্যের ধোয়াশা
হচ্ছিলাম আমি। প্রতিটা মেয়েই তার
প্রিয় মানুষের কাছে রহস্যের আবর্ত
হতে চায়, নিজেকে চিরদিনই একটা
ছায়ার আড়ালে রাখতে চায়। আর আমি
যে তখন সপ্তর কাছে ছায়ার আড়ালে
চলে গিয়েছিলাম বুঝতাম ঠিকই। সপ্তর
আমাকে বুঝে নেয়ার ক্ষমতা কমে
যাচ্ছিল, আমিও নিজের কৈশোর
পেরিয়ে যেন তরুণীর মত হয়ে
গিয়েছিলাম। মাঝে মাঝে অভিমান
হত ছেলেটার এই অবুঝ হওয়াতে, কিন্তু
দিনশেষে নিজেকে পূর্ণ লাগত।
নিজেকে কেমন যেন জয়িতার চেয়ে
জয়ি মনে হত। সপ্ত নামক পাত্রের পুরো
আয়তনেই ভরে গিয়েছিলাম জয়ি হয়ে,
সপ্তের আকারেই যেন নিজেকে দিয়ে
পূর্ন করেছিলাম পুরো সপ্তকে। এই
অনুভুতিটার জন্যই হয়ত প্রতিটা নেয়ে
জন্মায়, আর এই অনুভুতির মায়ায়ই হয়ত
আমরা পুরো পরিবারকে সুতোর মত
বেঁধে রাখি। এরকম অনুভুতির লোভেই
হয়ত বাবার মেয়ে কোন পরিবারের বউ
হওয়ার স্বপ্ন দেখে, এই অনুভুতির
প্রশান্তিই হয়ত একটা মেয়ের কাছে মা
ডাকটাকে এতটা দামী করে দেয়।
পৃথিবীর কোন পুরুষই এই অনুভুতির
ছিটেফোঁটাও উপলব্ধি করতে পারেনা,
এজন্যই মাঝে মাঝে নিজেকে অনেক
বেশী ভাগ্যবান ভাবি নারী হিসেবে।
আর দিনশেষে আনমনেই হেসে বলি,
"ভালবাসি সপ্ত, আমাকে এরকম অনুভুতি
দেয়ার জন্য। "
.
৫।
প্রণয়ের পর প্রতিটা দেখাই ছিল
নিজেদেরকে আরো একটু একটু করে কাছে
নিয়ে যেতে। জয়িতার পবিত্রতাকে
মুগ্ধ হয়ে দেখার। অনন্তকালের জ্বাজল্য
হৃদয়ের সব শান্তি যেন মেয়েটার
মাঝেই ছিল। আর জয়িতার ভরসাই যেন
নিজের দায়িত্বের চিন্তাকে বারেবার
মনে করিয়ে দিত। নিজেকে তাইত বড়
কোথাও দেখতে চাইতাম, চিরকাল
নির্লিপ্ত আমি নিজের
নির্লিপ্ততাকে হারিয়ে ফেলতে
চাইতাম শুধু এই মেয়েটার ভরসার
কারণেই। এজন্যই আমাদের ভালবাসায়
যতটা না পাগলামী ছিল, তার চেয়ে
বেশী ছিল নিজেদেরকে বাস্তবতার
সাথে পরিচয় করানো। সাধারন প্রেমের
গল্পের মত আমাদের গল্পকে কখনই
চালাতে চাইতনা জয়িতা, একারনেই
প্রেমিকার উচ্ছলতার চেয়ে স্ত্রীর মত
সবকিছুতে কর্তৃত্বই ছিল ওর মাঝে। আর
আমি এই কর্তৃত্বকেই জায়গা ছেড়ে
পাশে বসে দেখতাম, অধিকারের বাধা
যে জয়িতার জন্য কখনই ছিলনা।
সীমানার মাঝে মুক্ত পাখিকে বন্দি
করতে কখনই চাইনি আমি, তাহলে যে
বিষন্ন বালক নিজের বিষন্নতার
নেশাটাকেই হারিয়ে ফেলত। প্রতিটা
ছেলের কাছেই প্রিয় মানবীকে স্রষ্টা
থাকে একটা ঘোর হিসেবে পাঠান,
সচেতন মনের একটা অবচেতন ঘোর,
কখনো সেটা প্রকট কখনো বা নিঝুম।
নারীকে রহস্যের আড়াল থেকে নিজের
পরিচয়ে রাখার, পুরোটা অস্তিত্বকে
খুটিয়ে খুটিয়ে চেনার প্রচেষ্টা সবসময়ই
চলে, কখনো বা সেটা স্বীকৃতি পায়
অথবা থাকে শুধুই গোপন। তবুও প্রচেষ্টা
চলে নিরন্তর। জয়িতাকেও সেরকম মনে
হত আমার, পুরোটা অস্তিত্বকে নিজের
পরিচয়ে আটকাতে চাইতাম, কিন্তু বন্দী
করার চেষ্টা কখনই ছিলনা। একারনেই
দুজনেই যেন সাধারণ প্রেমের গল্পের
বয়সকে পেছনে ফেলে হঠাতই বড় হয়ে
গিয়েছিলাম। নিজেদের জন্যই
নিজেদেরকে গোছাতাম, স্বপ্ন দেখার
আগে বাস্তবতার হিসেব নিকেশ
চালাতাম প্রতিবারই। ছোট্ট নীড়ের
জন্য ছোট ছোট নৃ'র জন্য নিজেদেরকে
সবসময়ই মূল্যায়ন করতাম।
এভাবেই দিনের হিসেব কে সপ্তাহ,
তারপর মাস, বছর পেরিয়ে যুগের
অর্ধেকে নিয়ে এসেছি আমরা। ঝড়
বর্ষা, শঙ্কা ভয়, হতাশা নিরাশা কোন
কিছুরই অভাব কখনই হয়নি আমাদের
গল্পে। গতির সাথে গল্প বেড়েছে,
পৃষ্ঠার গণনা বা কালির হিসেব করতে
করতে হঠাতই অনুভব করি জীবনে
বাস্তবতা নিয়ে ভাবতেও মাঝে মাঝে
স্বপ্নকে বাধভাঙ্গা হতে হয়,
পাগলামীকে অসঙ্গায়িত হতে হয়। আর
সেজন্যই যেন কোন এক ঝুম বর্ষায়, লাল
শাড়ির মেয়েটাকে বিয়ে করে ফেলি।
মেয়েটার জন্য অস্বাভাবিক ছিলনা
সেটা, ছিলনা সদ্য পাসকরা যুবকেরও।
কিন্তু সবকিছুর পরেও বাবার মেয়ে আর
মায়ের ছেলে তো ছিলাম আমরা।
তাইত ঝোক কিংবা সময়ের
পরিপেক্ষিতে পাগলামী যাই বলি
সেটা অস্বাভাবিক ঠিকই ছিল
সমাজের কাছে, সমাজের মাঝে থাকা
আমাদের ছোট্ট পরিবারদের মাঝে।
তারপর কয়েক মাসের জন্য নিজেদেরকে
আরো বড় হিসেবে আবিষ্কার করা, আর
বড় বড় দুটো মানুষের তাদের চেয়েও বড়
কয়েক জোড়া মানুষকে বোঝানোর
চেষ্টা। পুরোটা পথেই জয়িতা সাথেই
ছিল আমার। সেই উচ্ছল কিশোরীটা
উচ্ছল তরুনী হয়েই গুছিয়ে যেত
বিবাহিত বহেমিয়ান আমাকে। কর্তৃত্ব
করার স্বীকৃতিও যে পেয়ে গিয়েছিল
সে। দুজনের নিজেদেরকে সামলে নিয়ে
চলা, আর বড় বড় সেই মানুষদের জন্য
আরো দায়িত্বশীল হওয়া। এর মাঝে
ছোট ছোট অনেক গল্প আছে, অবশ্য গল্প
দৈর্ঘ্য বা উপন্যাসের গভীরতার মত
এতকিছু নিয়ে জীবনকে মাপিনি
আমরা। চলেছি ছোট ছোট কিছু বর্ণ
সম্ভার নিয়ে। বিয়ে করাটা যতটা
কঠিন বিয়ের পর বউকে পালা তার চেয়ে
হাজার গুন কঠিন এটা বিয়ের পরেই
প্রথম বুঝতে পারি আমি। এজন্যই যত
সহজে ঝুম বর্ষায় মালা বদল হয়েছিল তত
সহজে সেই বর্ষা যায়নি আমাদের কাছ
থেকে। কয়েক পক্ষের কষ্ট করতে হবেটা
কয়েক মাস পেরিয়ে গিয়েছিল চোখের
পলক ফেলার আগেই। অবশ্য দিনশেষে
যখন ঝগড়ার পড় সদ্য বর্ষায় ভেজা
স্যাতস্যাতে চোখ নিয়ে জয়িতা
রাতের খাবার বানাতে যেত, আমিও
বারান্দায় বসে আরো কাছে চলে
যেতাম জয়িতার। প্রতিটা অভিমানই
দূড়ত্বকে কমায়, আর প্রতিটা দূড়ত্বের
সংকোচন অধিকারকে বাড়ায়। এজন্যই
হয়ত ঝগড়ার পরের নিরবতাও ভাল লাগে
আমার। খুব যে কষ্টের ছিল দিনগুলো তা
ঠিক না, কিন্তু অভ্যস্ত হতে কষ্ট
হয়েছিল দুজনেরই। যতটা আমার তার
চেয়ে জয়িতার্। কিন্তু এর মাঝেও ঐ যে
সেই ব্যাপারটা ছিল। নিজেদের
জগতটাকে যে আমি তুমির বাইরে
আমরা তে ভাগ করে নিয়েছিলাম,
কষ্টটা দিতে বা নিতে তাইত খুব বেশী
ভার লাগেনি।
যাই হোক, এত কিছুর পরে সবকিছুই ঠিক
এখন। আসলে মানুষের জীবনে কিছু
দূর্ঘটনার দরকার হয়, অথবা কিছু খারাপ
সময়ের, একটা মানুষ যখন নিজে উপলব্ধি
না করে জীবনে ভাল থাকা প্রয়োজন
তখন পর্যন্ত সে ভাল হতে পারেনা। আর
খারাপ সময়েই আমরা বুঝি পৃথিবীতে
বেঁচে থাকার চেয়ে ভালভাবে বেচে
থাকাটাই আসল। একারণেই সবকিছুতে
দুজন একসাথে থাকার পরেও ভেবেছি
পরিবারের বড় বড় মানুষের ছায়ার নিচে
থাকার কথা। আর হাজার হোক
তারাতো বিষন্ন বালক আর বুঝ
বালিকাদেরই পরিবার, মেনে
নিয়েছিলেন ঠিকই। আর তারপর তো
জয়িতার পরিবারকে গুছিয়ে নেয়ার শুরু,
আর গুছিয়ে নেয়ার পর অবসরে
বহেমিয়ান আমার খোঁজ খবর নেয়া।
জয়িতার ব্যস্ততাকে ভাল লাগত আমার,
ওর ব্যস্ততার মাঝে ওকে আড়াল থেকেই
দেখতে পারি। আর এই লুকিয়ে লুকিয়ে
দেখাতেই আবারো প্রেমে পড়ে যাই
মেয়েটার, "সত্যিই ভালবাসি জয়ি,
অনেক ভালবাসি।"
.
৬।
সপ্ত আর আমার যখন নিজেদের জন্য কিছু
করার চেষ্টা শুরু, তখন সৃষ্টিকর্তা সহায়
ঠিকই ছিলেন আমাদের। দুজনেই একটা
ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম,
কিন্তু সবকিছুর পরেও সমাজের কাছে যে
বাবার মেয়েই ছিলাম তখনো আমি।
আর সেজন্যই বাবার পাত্র খোঁজা
চলছিল অবিরাম। যোগ্য পাত্রের
পুঁথিপঞ্জির খোঁজ দেয়ার মানুষেরও
অভাব ছিলনা সেসময়। শুধু অভাব ছিল
সপ্তর দাঁড়ানোর ভিতটা যে তখনো
আমাকে নেয়ার মত শক্ত হয়নি।
তারপরেও বাবার সামনে যখন সপ্ত
দাঁড়ায়, মেয়ের কথা ভেবেই বাবা
সহজেই না করে দিয়েছিলেন। কিন্তু
দুজনেই জানতাম যে এই না কে নিয়ে
এখন ভাবলে হয়ত সারাজীবনই আফসোস
করে কাটাব কেন সেদিন ভাবিনি।
তাইত বাবার মেয়ে অসম্ভব সাহসী হয়ে
যায়। ঝুম বৃষ্টিতে বান্ধবীর বাসায়
যাবার কথা বলে যখন মায়ের লাল
শাড়িতে নিজেকে সাজাচ্ছিলাম,
সপ্তর হয়ে যাওয়ার চেয়ে আমার মায়ের
মেয়ে বেশী মিস করছিলাম। সহজেই
যেন একবার পা বাড়ালে, আমার সবকিছু
আলাদা হয়ে যাবে। যে ঘরে আমার
বছরের পর বছর কেটেছে সেই ঘরটা আর
জয়ীতার থাকবেনা, সেই আয়না আর
আমার থাকবেনা, কেমন যেন। হয়ত
জয়িতাই আর এই বাড়ির থাকবেনা।
কিন্তু তারপরেও সেদিন স্বার্থপর হয়েই
ছিলাম আমি। বিয়ে করাটা ঐ বয়সে
সহজ ছিলনা, তারপরেও। সপ্তর বাসায়
একাধিক শর্ত, নিজেদের প্রমাণ করার
চেতনা, সব মিলিয়ে সপ্ত আর জয়িতা
ঠিকই বিয়ের দিল্লীকা লাড্ডু ভালই
বুঝতে ছিল।
তারপর আর কি, বিয়ের পর ঘর মোছা
থেকে চন্ডি পাঠের অনুশীলন শুরু হল
আমার। যতটা না অনভ্যস্ত ছিলাম, তার
চেয়ে কঠিন ছিল পুরো একটা সংসারকে
আস্তে আস্তে তৈরী করা। নিজের পুরো
সত্তাকে যে বাসায় ফেলে
এসেছিলাম,সেই বাসার মানুষ গুলোকে
অনেক বেশীই মনে করতাম। কিন্তু সেই
মানুষগুলোকে আবার ফিরে পাওয়ার
শক্তি যে সপ্তই ছিল। এজন্যই সবকিছুর
পরেও নিজেদের সামলাতাম, নতুন
পরিবেশ, অপরিপক্কতা সবকিছু মিলিয়ে
রোদন কম হয়নি সেই সংসারে। আসলে
মাথার উপর ছাদ হিসেবে যে তখন কেউ
ছিলইনা, তাইত ভারটা বেশীই ছিল
আমাদের উপর। ঝগড়া, অভিমান রাগ
সবকিছুর পরেও একসাথে ছিলাম এটাই
কথা। আর যা ছিল তাতে ভালই চলত
দুজনের। ঘটি বাটি থেকে বর কনে
দুজনেই যে ছিল আনকোরা, পুরোটাই
নতুন। তাইত মানিয়ে নেয়ার প্রশ্ন আসত
প্রতিবার। আসলে প্রেমিকা হিসেবে
যত সহজে সামলানোর কথা ভাবা যায়,
স্ত্রী হিসেবে ততটাই কঠিন। নতুন
সম্পর্ক সব পরিকল্পনাকেই আড়াল করে
দেয়।
তারপরেও চলছিল দিন, দুজনেই একটা
সময় একটা শক্ত জায়গায় দাঁড়িয়ে
যাওয়া। আর তারপর দুজনের শক্ত পায়ের
উপর একজোড়া তুলতুলে পায়ের জন্য
অপেক্ষা। এই অনুভুতিকে বাক্য, শব্দে
প্রকাশ করা কখনই সম্ভব নয়। নিজের
অনুভুতিটাকে শুধু অনুভবই করতে পারি,
পুরো নিজের ভেতর আস্তে আস্তে
বাড়ানো আরো একটি আমিকে। তাও শুধু
আমি না, অর্ধেক আমি, অর্ধেক সপ্ত।
কেমন যেন প্রতিটা লোমকূপেও
অস্তিত্বের শিহরন, আর প্রতিবার
সুযোগ পেলেই নিজেকে খুটিয়ে খুটিয়ে
দেখা। আর এই ছোট্ট অনাগত মানুষটাই
যেন গলিয়ে দিল সব বড় বড় মানুষদের
মন। দিনশেষে সম্পর্কের মায়া এড়াতে
পারেনা মানুষ। পরিণতি চিরকালের এই
দূর্বলতার কাছেই নিজেদেরকে
হারানো, অথবা হার মেনে নেয়া। এরপর
অবশ্য অঘটন ঘটন খুব বেশী ঘটেনি।
নিজেরা এখনো ঠিক আগের মতই আছি।
আমি উচ্ছল আর সপ্ত সেরকম নির্লিপ্ত।
নতুন কারো আগমনটা সপ্তকে আরো
বদলে দিচ্ছে দিনে দিনে। সেই প্রথম
দিন ভেজা ভেজা অনুভুতি থেকে এখন
পর্যন্ত আজকের পথচলা খুব বেশী কিছুই
বদলায়নি। এখনো আমরা একই আছি, একই
ভাবে বাঁচি, একই রকম ভালবাসি।
গল্পের শুরু যেখানে, সমাপ্তিটা
সেখানেই হয়ত। আমাদের জন্ম দিয়েই
গল্পের শুরু, হয়ত মৃত্যু দিয়ে শেষ। কিন্তু
একটা কথা কি, সব গল্পই একই, শুধু
লেখকেই ভিত্তিতে লেখার ধরন পাল্টে
যাই তাই নতুন লাগে। কিন্তু আমাদের
জীবনের গল্প যে একজন স্রষ্টাই লেখেন
প্রতিনিয়ত, তাই হয়ত চেনা আদলেই
গল্প বাড়তে থাকে। গল্পের শেষে,
একসময় স্রষ্টাও আমাদের তার
উপস্থিতি উপলব্ধি করান।
সূর্য ডুবে যাচ্ছে এখন প্রায়, আমি সপ্তর
কাঁধে মাথা রেখে সেদিকে দেখছি আর
শক্ত করে হাত খামচে বসে আছি ছাদে।
মোটা কাজল গড়িয়ে কালো কালি
সপ্তর শার্টে লাগছে, ছেলেটা হয়ত
বুঝতে পারছেনা। শুধু আলতো করে
পেটের উপর হাত চেপে বসে আছে।
সপ্তর কাছে দিনে দিনে রহস্যময় হয়ে
যাচ্ছি আমি, ছোট্ট মানুষটা আসার পর
হয়ত আরো হয়ে যাব। ভাল লাগে এই
রহস্যময়তার দিকে যখন ফ্রেমে ঢাকা
একজোড়া উদ্ভ্রান্ত চোখ তাঁকিয়ে
থাকে, উদ্ভ্রান্ত চোখের সেই মানুষটার
এলোমেলো চুল গুছিয়ে দেই আমি তখন।
আজকাল নিজেকে অনেক বেশী ভাল
লাগে, প্রতিদিন অফিসের পর সপ্তর
সাথে ছাদে বসে সূর্যের ফিরে যাওয়া
দেখতে ভাল লাগে। মাঝ রাত্তিরে
যখন ঘুম ভেঙ্গে দেখি সপ্ত নামক
পাগলাটে ছেলেটা চশমা না পেয়ে,
হাতড়ে হাতড়ে আমার পেটের উপর কান
নিয়ে যাচ্ছে তখন সেই ছেলেটার কান
টেনে ফিসফিসিয়ে বলতে ভাল লাগে
"ভালবাসি সপ্ত।"
.
By
আদনান পারভেজ
āĻāϞ্āĻĒ āϏংāĻ্āϰāĻš āĻāϰা āĻāĻŽাāϰ āύেāĻļা। āϰোāĻŽাāύ্āĻিāĻ, āĻৌāϤিāĻ, āϰāĻŽ্āϝ, āĻৌāϤুāĻ āϏāĻš āĻšাāĻাāϰো āĻāϞ্āĻĒ āĻāĻে āĻāĻŽাāϰ āϏংāĻ্āϰāĻšে।
āĻļāύিāĻŦাāϰ, ⧍ āϏেāĻĒ্āĻেāĻŽ্āĻŦāϰ, ⧍ā§Ļā§§ā§
725
āĻāϰ āĻĻ্āĻŦাāϰা āĻĒোāϏ্āĻ āĻāϰা
Rahathossain1010100@gmail.com
āĻāĻ āϏāĻŽā§ে
⧝:ā§Ēā§Ē PM
āĻāϤে āϏāĻĻāϏ্āϝāϤা:
āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝāĻুāϞি āĻĒোāϏ্āĻ āĻāϰুāύ (Atom)
āĻোāύ āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āύেāĻ:
āĻāĻāĻি āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āĻĒোāϏ্āĻ āĻāϰুāύ