#ফিরে_এসো_কাছে_কথা_বাকি_আছে
#তীর্থা
কি ব্যপার ;অসময়ে শুয়ে আছো যে ? ঘরের আলো জ্বালাওনি কেন ! ----সুইচবোর্ডের দিকে হাত বাড়ায় দীপ l
তুমিও তো অসময়েই ফিরেছো আজ l ---ধীরগতিতে বিছানা থেকে নামতে নামতে জবাব দেয় দেবারতি l
একটু বিস্মিত হয় দীপ l দেবারতি সাধারণত মুখে মুখে কথা বলে না l তবে ? আজ হঠাৎ কি হলো l অফিসের ব্যাগটা বিছানার ওপর রেখে টাই এর নটটা আলগা করতে করতে ভাবে দীপ l
কলকাতায় এখন ফেব্রুয়ারীর শেষ l এর মধ্যেই শীত বাবাজি তার তল্পিতল্পা গুটিয়ে বিদায় নিয়েছেন l সারাদিনের কর্মক্লান্ত শরীরটাকে শাওয়ারের তলায় মেলে ধরে দীপ l বিন্দুবিন্দু জলকণায় ধুয়ে যেতে থাকে শরীরের ক্লান্তি l দেবারতির ভাবনা তার মনে বেশিক্ষণ ঠাঁই পায় না l
দেবারতি অতি সাধারণ l সাধারণ মানুষকে নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না l সবাই ছোটে বিশেষের খোঁজে l
আজথেকে ঠিক ছয় বছর আগে দীপ আর দেবারতি বাঁধা পড়েছিল সাতপাকে l
প্রেমিকা মধুমিতার বাবা শুধুমাত্র কাস্টের দোহাই দিয়ে দীপের সাথে বিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছিলেন l
মধুমিতা বাপ মায়ের একমাত্র মেয়ে l সে পারেনি তাদের বিপক্ষে গিয়ে আপন ভালোবাসাকে স্বীকৃতি দিতে l বরং বাধ্য মেয়ের মতো তাঁদের পছন্দ করা প্রফেসার পাত্রের গলায় মালা দিয়ে সাজিয়ে নিয়েছিল নিজের ঘরকন্না l আর দীপের ঘর হচ্ছিলো নিকোটিনের ধোঁয়ায় পরিপূর্ণ l
মা রোজ ঘর পরিস্কার করতে এসে টেবিলের ওপরে রাখা অ্যাস্ট্রেতে আবিস্কার করতেন সিগারেটের স্তুপ l মধুমিতার কথা কখনো স্পস্ট করে মা কে বলা হয়ে ওঠেনি ; কিন্তু মা আন্দাজ করতেন l মা'রা হয়তো সবই আন্দাজ করতে পারেন l
একদিন খাবার টেবিলে মা একটা ফটো হাতে হাজির l ছবিটা একবার দেখ দীপ l
ছবি দেখার জন্য দীপ প্রস্তুত ছিল না l বিস্মিত চোখে বলেছিল ....কার ছবি ?
মা বলেছিলেন সেই চিরাচরিত কথা ---- আমি আর কদিন আছি বল l তোর একটা সংসার হলে শন্তিতে চোখ বুজি l
মানে ? উফফ মা একটু পরিস্কার করে বলবে কি বলতে চাইছো ? সদ্য প্রেমিকা হারানোর দুঃখে বিমর্ষ দীপ সেদিন মায়ের সোজা ইঙ্গিতও ধরতে পারেনি l মা'ই শেষে ভেঙ্গে বলেছিলেন ----এটা আমার এক বান্ধবীর মেয়ের ছবি l নাম দেবারতি l সাদামাটা ঘরোয়া মেয়ে l তুই একবার দেখে পছন্দ করলেই কথা এগোবো আমি l
তোমার পছন্দ ? ---দীপ জানতে চায় l
হ্যাঁ l কিন্তু বিয়ে তো আর আমি করবো না ;তাই তোর মতামতটাই জরুরি l মা স্মিত হেসে জবাব দেন l
তাহলে কথা এগোও l আমি মত দিলাম l দীপ বলে l
তার পছন্দ মানে তো মধুমিতা ;কিন্তু তাকে পাওয়া যখন সম্ভব নয় তখন দেবারতি বা অন্য কেউ ....একই ব্যাপার l
তারপর নির্দিষ্ট দিনে মায়ের পছন্দ করা বৌ দেবারতির সাথেই জীবন চলার শপথ নেয় দীপ l কিন্তু সব শপথ লক্ষ্যে পৌঁছয় না l
দেবারতি বড় শান্ত স্বভাবের l একটু বেশিই ঘরোয়া lকোন অযাচিত কৌতুহল নেই তার l চাহিদাও নিতান্তই সামান্য lদীপের অফিস থেকে দেরি করে ফেরা বা নতুন বৌ এর প্রতি উদাসীনতা কোন কিছুতেই তার কোন অভিযোগ ছিলো না l এসব দেখে প্রথম প্রথম একটু খুশিই হয়েছিল দীপ l মধুমিতার স্মৃতি তখনো তার মনে টাটকা l এমতবস্থায় দেবারতি তার অধিকার দাবি করে জেহাদ ঘোষণা করলে দীপ একটু বিপাকেই পড়তো l কিন্তু দেবারতি সে পথ মাড়ায়নি l কেবল তার নীরব উপস্থিতি নিয়ে নিরন্তর মিটিয়ে গিয়েছে দীপের যাবতীয় প্রয়োজন l দীপও তাকে ঘরের নিত্য আবশ্যকীয় ভেবে নিয়ে নিজের পছন্দমতো বিবাহোত্তর ছয়টি বছর কাটিয়েছে l ইতিমধ্যে বছর খানেক হলো মধুমিতা বদলি হয়ে এসেছে দীপের অফিসে l
ফলে পুরনো অপূর্ণ প্রেম অচিরেই দানা বাঁধে l স্বামী সন্তান আর অফিস নিয়ে নাজেহাল একঘেয়ে জীবনে বিপর্যস্ত মধুমিতা পুরনো প্রেমে মুক্তির পথ খোঁজে l দীপ ও সেই প্রেমের নৌকোয় পাল তুলে ছুটে চলেছে জীবন পথে l
আজকাল তাই দেবারতি কে অসহ্য লাগে তার l মাঝে মাঝে অদ্ভুতও লাগে l সন্দেহ জাগে আদৌ ওর মন বলে কি কিছু আছে ? যদি থাকতো তাহলে কি দিনের পর দিন এভাবে নিজের স্বামীর থেকে দূরে থাকতে পারতো ? দীপ তাকে কাছে টানেনি ঠিক কথা , কিন্তু সে ও তো কোনদিন জোর করেনি l কোনদিন জোর গলায় বলেনি ---কেন তোমার এই উদাসীনতা !
দেবারতীর যে নিস্পৃহ ভাবকে বিয়ের প্রথম প্রথম দীপের খুব ভালো লাগতো , সেই নিস্পৃহতাই পরে অসহ্য লাগতে শুরু করে l বিশেষত মা মারা যাবার পর এই বাড়ির প্রতি আর কোন টানই অনুভব করতে পারে না সে l
*******
আচমকা দরজায় টোকা ; শাওয়ারটা বন্ধ করে সাড়া দেয় দীপ -----
বলো ?
তোমার ফোন l
কে করেছে ?
মধুমিতা l
দাও
.....বাথরুমের দরজাটা একটু খুলে ফোন টা হাতে নেয় দীপ l একটু অস্বস্তি হয় l ফোনটা কেটে দিয়ে বাথরুমের তাকে রেখে আবার শাওয়ার চালায় l খুব অদ্ভুত লাগে দীপের l মধুমিতার ব্যপারেও দেবারতি উদাসীন ! কোনদিন জিগ্গেস পর্যন্ত করেনি কে মধুমিতা l অথচ তার অন্যান্য বন্ধুর বৌ দের তো দেখছে ;পান থেকে চুন খসলেই সংসারে অশান্তি l সেদিক থেকে দেখলে দীপের সংসারে অখণ্ড শান্তি বিরাজমান l
এসব ভাবতে ভাবতেই স্নানঘর থেকে বেরোয় দীপ l এবার দেবারতি চা আর জলখাবার নিয়ে আসবে l ছ'বছর ধরে শীত গ্রীষ্ম বর্ষা কোন ব্যতিক্রম নেই l তার কোন কাজে কোন খুঁত নেই, বিশৃঙ্খলা নেই l
হঠাৎ রান্নাঘরে ভারি কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দে চমকায় দীপ l দৌড়ে যায় সেখানে l দেখে দেবারতি মেঝেতে পড়ে আছে ;চারপাশে ইতস্তত ছড়িয়ে আছে ভাঙ্গা কাপ প্লেটের টুকরো l কাছে গিয়ে বুঝলো জ্ঞান হারিয়েছে দেবারতি l
এই প্রথম ভাঁজ পড়লো দীপের কপালে l বেসিনের কল থেকে একটু জল নিয়ে আস্তে আস্তে ছিটিয়ে দিলো দেবারতীর চোখেমুখে l কিন্তু জ্ঞান ফিরলো না l দেবারতি কি অসুস্থ ছিলো ! ভাবতে ভাবতে তাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে শোবার ঘরে যায় দীপ l বিছনায় শুইয়ে তাড়াতড়ি ফোন করে পরিচিত ডাক্তারকে l তারপর তীক্ষ্ণ চোখে দেখতে থাকে স্ত্রীর মুখের দিকে l
শেষ কবে তার দিকে ভালো করে তাকিয়েছিলো দীপ আজ মনে পড়লো না l চোখের কোলের গাঢ় কালি আর বিবর্ণ নিষ্প্রাণ মুখ স্পষ্ট জানান দিচ্ছে দেবারতি ভালো নেই l কি যেন এক আশঙ্কায় দুরদুর করতে থাকে দীপের বুকের ভিতরটা l আলতো করে হাত রাখে তার মাথায় l
দেবারতি .....দেবারতি ....
দেবারতি সাড়া দেয়না l খালি ঘর কেবল আরও খালি মনে হয় l
********
আমার ঠিক সুবিধের মনে হচ্ছে না l আপনি ইমিডিয়েট ওনাকে হসপিটালে অ্যাডমিট করুন l ----ডাক্তারবাবু পরামর্শ দেন l
দীপ ততৎনাত তার ব্যবস্থা করে l কিন্তু দেবারতির আর জ্ঞান ফেরে না l হসপিটাল জানায় দেবারতি ব্ল্যাড ক্যান্সারে ভুগছিল l সাথে অন্যান্য অনেক কমপ্লিকেশন l দীপকে চিরতরে মুক্তি দিয়ে দেবারতি নীরবেই অনন্ত পথে পাড়ি দেয় l
শূন্যঘরে ফিরে আসে দীপ l স্ত্রীর প্রতি তার এই অবহেলা জন্ম দেয় এক তীব্র বিবেকদংশনের l কতটা উদাসীনতা থাকলে একটা মনুষের এরকম একটা দুরারোগ্য ব্যাধি নজর এড়িয়ে যায় তার হিসেব চলে দীপের মনের মধ্যে l দেবারতির নীরব উপস্থিতি সরব হয়ে আছড়ে পড়ে দীপের সমস্ত চেতনা জুড়ে l এই বাড়ির সর্বত্র জুড়ে সে ....কেবলমাত্র সে l তার স্পর্শসুখ আজকাল আচ্ছন্ন করে রাখে দীপকে l বাড়ি ছেড়ে সে কোথাও যেতে চায়না l খালি মনে হয় এই বোধহয় দেবারতি চা নিয়ে এলো l ওই বোধহয় সে ছাদে যাচ্ছে কাপড় শুকোতে দিতে l দেবারতিহীন জীবন অসহ্য লাগতে শুরু করে দীপের l
ঘর আবার পূর্ণ হয় নিকোটিনের ধোঁয়ায় l ঘরের যত্রতত্র জমতে শুরু করে মদের বোতল l কিন্তু দেবারতির ভাবনা নিজের জায়গায় অবিচল থাকে l
এভাবেই কেটে যায় কিছুদিন l দেবারতির যত্নে সাজানো সংসার ক্রমশ হয়ে পড়ে ধুলো মলিন l সে মলিনতায় ক্রমশ চাপা পড়ছে তার স্মৃতি l নাহ .......এটা হতে দেওয়া যায় না ;এই স্মৃতিটুকু নিয়েই তো সে বেঁচে আছে l একথা মনে হওয়া মাত্রই দীপ তার অপটু হাতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে এই সংসারে দেবারতির এঁকে যাওয়া নকশা l কিন্তু কোথা থেকে করবে শুরু ? সমস্ত বাড়িটাই তো শ্রীহীন হয়ে পড়েছে l
অনেক ভেবে শোবার ঘরের টেবিল থেকে কাজ শুরু করলো দীপ l টেবিলের ওপর পোড়া সিগারেটের টুকরো আর কিছু আধখাওয়া বাদামের টুকরো পড়ে ছিলো l সব আস্তে আস্তে সাফ হতে লাগলো l এই টেবিলটা দেবারতি ব্যবহার করতো l বিভিন্ন ম্যাগজিন একপাশে ডাঁই করে রাখা l কি মনে করে সেখানে হাত দিতেই সোনার জলে নকশা করা লাল রংয়ের একটা ডায়েরি চোখে পড়লো দীপের l
দেবারতি ডায়েরি লিখতো ! ডায়েরিটা হাতে তুলে নেয় দীপ l কাঁপা হাতে ওল্টাতে থাকে তার একেকটি পাতা l প্রতি পাতা নতুন করে স্তম্ভিত করতে থাকে দীপ কে l চোখ আটকে যায় বিশেষ কয়েকটি পাতায় l দেবারতির আত্মকথা যেন ছায়াছবির মতো চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে দীপ l
১২/১২/২০০৮
বিয়ের পর আজ আমি প্রথম লিখতে বসলাম l দীপের মতো ছেলে কে স্বামী হিসেবে পাবো কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি l এমন বর , ঘর অনেক ভাগ্য করে মেলে l
১৮/১২/২০০৮
বিয়ের পর দশদিন কেটে গেলো l আমাকে বোধহয় দীপের পছন্দ হয়নি l কিভাবেই বা হবে ? আমি যে নিতান্ত সাধারণ l না আছে চোখ ধাঁধানো রূপের জৌলুস , না আছে তীক্ষ্ণ মেধা l নিজেকে মাঝে মাঝে বড্ড বেমানান লাগে দীপের পাশে l হয়তো দীপের ও তাই মনে হয় l
৩/৩/২০০৯
আজ বুঝলাম দীপের কেন আমাকে পছন্দ হয়নি l ও যে অন্য একজনকে ভালোবাসে l আজ দীপের আলমারি পরিস্কার করার সময় দীপকে লেখা মধুমিতার একব্যাগ চিঠি পেয়েছি l সাথে মধুমিতার একটা ছবিও l ওই রূপের কাছে আমি কিছুই নয় l
কিন্তু এই কয়দিনে দীপকে আমি যে বড্ড ভালোবেসে ফেলেছি l বেশ -----দীপ যদি মধুমিতার স্মৃতি নিয়ে ভালো থাকতে চায় তাহলে তাই থাকুক lওর কাছে যাবার যোগ্যতা যখন নেই তখন আমি বরং ওকে দূর থেকেই ভালোবাসবো l
১৫/৭/২০১৩
আজকাল দীপ বড্ড রুক্ষ হয়ে গেছে l বোধহয় আমাকে আর সহ্য করতে পারছে না l মধুমিতাও এখন ফোন করে ওকে l বোধহয় আবার নতুন করে যোগযোগ হয়েছে l আচ্ছা আমি সহ্য করতে পারছিনা কেন ? দীপ তো কোনদিনই আমায় কাছে টানেনি ; তাহলে ? কিসের দাবিতে প্রতিবাদ করবো ?
৬/১/২০১৪
আজকাল শরীরটা বড্ড খারাপ লাগে l ডাক্তার কতগুলো টেস্ট করতে দিয়েছেন l কিন্তু কি হবে টেস্ট করিয়ে ? কার জন্য বাঁচবো আমি ? দীপের তো আমার দিকে ঘুরে দেখবার ও রুচি নেই l তার থেকে এই ভালো l নিঃশব্দে চলে যাবো l এমনিতেও ওর আর মধুমিতার সম্পর্কটা আমি আর নিতে পারছিনা l
থরথর করে কাঁপছে দীপের হাত l এত কষ্ট দিয়েছিল সে দেবারতিকে ? নিজেকে নিজেই ধিক্কার দিয়ে ওঠে l ঠিক হয়েছে , বেশ হয়েছে l দেবারতি যোগ্য শাস্তিই দিয়েছে তাকে l এত ভুল করেছে সে দেবারতি কে চিনতে ! ! একরাশ অভিমান নিয়েই সে চলে গেলো ?
একবাড়িতে , এক ছাদের তলায় থেকেও সে না পেয়েছে স্ত্রীর মনের তল , না শরীরের l দেবারতির যে ব্যবহারকে সে নিস্পৃহ ভেবেছিলো সেটা আসলে তার অভিমান ছিলো ! হায় ভগবান l
এই কদিনের আত্মদংশন , আত্মগ্লানি ঝরঝর করে ঝরে পড়ে তার দুচোখ বেয়ে lমোচড় দিয়ে ওঠে বুকের ভিতরটা l একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা নিয়ে চিত্কার করে একটা কথাই বেরিয়ে আসতে চায় -----ফিরে এস কাছে , কথা বাকি আছে l
-------------------------_
āĻোāύ āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āύেāĻ:
āĻāĻāĻি āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āĻĒোāϏ্āĻ āĻāϰুāύ