নিকোটিন জিবন।
ক্রমশ ৫ টা সিগারেট খেয়ে যখন ৬ নাম্বার সিগারেটটা টেনে তার ধুয়ার পানে তাকিয়ে থেকে চিন্তায় মগ্ন রইলাম ঠিক তখনি একটা ২৩ - কি ২৪ বছর বয়সী মেয়ে আমার কাছে এসে আমাকে বলে উঠলো---ভাইয়া সিগারেটটা কি একটু দিবেন? একটু খাবো।
মেয়েটির এমন আজগুবি আবদারে আমি খুব বেশি অবাক হয়ে গেলাম কিন্তু পরক্ষণে আমার অবাক হওয়াটা স্বাভাবিক হয়ে যায়, মেয়েটির পোশাকআশাক আর চেহারা দেখে। মেয়েটির পরনে একপ্রকার বলতে গেলে ছেড়া শাড়ি ছিলো,চুলগুলো ছিলো রুক্ষ আর চেহারার পানে ছিলো ক্লান্তি বোধ আর সহানুভূতি। ছেড়া শাড়িটা দিয়ে শরীরের যে অংশগুলো দেখা যাচ্ছে তাতে রয়েছে এক-- একটা নখের আছড়, যা থেকে বুঝে ফেললাম , মেয়েটি হয়তো পাগল আর না হয় কোনো বাজে মেয়ে হবে। তাইতো শরীরে এরকম শকুনদের নিষ্ঠুরতার আছড়।
--- কি হলো ভাই দিবেননা? কতদিন হলো খাইনি।
মেয়েটির এরকম কথায় মনে ওর জন্য একটু সহানুভূতি জাগে, কিন্তু সেই সাথে প্রচুর রাগ ও হয় এই ভেবে যে---- মেয়ে মানুষ হয়ে সিগারেট খেতে চাইছে, কি অদ্ভুত।
যাইহোক কি আর করার, মেয়েটিকে সিগারেটটা দিয়ে দিলাম।
আর তাছাড়া সেই অনেকক্ষণ থেকে এই নিশ্চুপ গাছের নিচে একা বসে আমিই শুধু নিকোটিনের সাথে বন্ধুত্ব করছি, অবশেষে এখন তো কেউকে পেলাম সঙ্গ হিসাবে সে যাই হোক পাগল কিংবা বাজে ।
---- এই নেও।
এই কথাটি বলা মাএই মেয়েটি আমার হাত থেকে সিগারেটটা নিয়ে ক্রমশ টানতে লাগলো।ব্যাপারটা দেখে আমি খুব বেশি অবাক হলাম, কেননা মেয়েটি এমন ভাবে সিগারেটটা টানছে যে মনে হলো ও অমৃত পান করছে।
প্রচন্ড গম্ভীর কন্ঠে মেয়েটিকে প্রশ্ন করলাম --- আচ্ছা সিগারেট কি মেয়েদের খাওয়া উচিত?
মেয়েটি আমার প্রশ্নটা শুনামাএই আমার গা ঘেষে গাছের নিচে বসে পড়লো, অতঃপর আমাকে বলে উঠলো --- আচ্ছা সিগারেটের কোন পাশে লেখা আছে যে মেয়েদের সিগারেট খেতে নেই, বরং সিগারেটের প্যাকেটের উপরে লেখা থাকে ধুমপান মৃত্যুর কারন যা সবার জন্য।
মেয়েটির উওরটা শুনে লজ্জাবোধ নিয়ে মুখটাকে নিচু করে ফেললাম , মেয়েটির কথাটা তো সত্যিই। তবে আমাদের সমাজে একটি ছেলে সিগারেট খেলে কোনো সমস্যা হয়না, কিন্তু একটি মেয়ে সিগারেট খেলে আমাদদের কাছে সে খারাপ বলে চিহ্নিত । আসলে সেই প্রাচীন যুগ থেকেই এই প্রথাটি চলে আসছে যার এখন অবদি নিঃশেষ হয়নি।
তবে ভদ্র ফ্যামিলির মেয়েরা আর সুস্হ মস্তিষ্কের মেয়ে এই জিনিসটা কখনোই খায়না,
তাহলে মেয়েটি কি সত্যিই পাগল বলে সিগারেটটা খাচ্ছে? নাকি আমার মতো..
--- ভাই সিগারেটটার জন্য ধন্যবাদ।
মেয়েটি হঠ্যাৎ সিগারেটের শেষের টুকু নিচে ফেলে দিয়ে এই কথাটি বলে উঠলো।
মেয়েটির গলার আওয়াজ পেয়ে চিন্তা থেকে বাস্তবতায় ফিরে আসলাম তারপর মেয়েটির পানে তাকাতেই দেখি, ওর চোখ থেকে একফোঁটা জল গড়িয়ে নিচে পড়ছে।
কিছু না বলে চুপচাপ অন্যদিকে তাকিয়ে রইলাম,কেন জানি মনটা প্রশ্ন করতে চাইছেনা মেয়েটি কেন কাঁদছে, কারন এদের চোখের পানির কোনো মূল্য আমাদের কাছে নেই, এরা কাঁদলে ও আমরা এদেরকে পাগল বলি কিংবা হাসলে ও পাগল বলি। আসলে
এদের প্রতি কেন জানি আমরা স্বাভাবিক মানুষরা সহজে সহানুভূতিশীল হইনা, কেননা প্রতিদিন ঘর থেকে বের হলেই আমাদের চোখের সামনে এরকম হাজারো অসহায়ত্ব মানুষ ঘুরে--ফিরে যা দেখতে- দেখতে এক সময় আমরা মানুষরা অভ্যস্ত হয়ে যাই।
যাইহোক তবুও কৌতুহল বর্শে মেয়েটিকে প্রশ্ন করলাম--- কাঁদছো কেন?
মেয়েটি তখন আমার প্রশ্নটার কোনো উওর না দিয়ে, বরং আমার প্রশ্নটাকে উপেক্ষা করে,
আমার দিকে কিছুসময় তাকিয়ে রইলো তারপর হঠ্যাৎ বলে উঠলো --- আচ্ছা ভাই আপনে কেন সিগারেট খাচ্ছেন?
--- মানে?
--- আসলে আপনাকে সেই কখন থেকে এখানে একা বসে সিগারেট খেতে দেখছি।
এই জায়গা টা তো আমাদের মতো মানুষদের আশ্রয় স্হল তাই দিনশেষে এখানে এসে এই গাছের নিচে শুয়ে থাকি,
আর এখন মধ্যরাত শিয়াল-- কুকুর আর আমাদের মতো আশ্রয় হীন মানুষ ছাড়া আর কেউই বাইরে থাকেনা, কিন্তু আপনে কেন বাইরে? কেন ক্রমশ একটার পর একটা সিগারেট টানছেন?
মেয়েটির কথায় একটু নিশ্চুপ হয়ে রইলাম, ক্রমশ সিগারেট কেন টানছি সেই ঘটনাগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছে, গম্ভীর কন্ঠে মেয়েটিকে বলে উঠলাম--- স্ত্রীর সাথে তুমুল জগড়া হয়েছে, সারাদিনের কর্মব্যস্ততার পর রাতে ঘরে পা রাখতেই কানের সামনে এসে ঘ্যানঘ্যান করতে থাকে, বাচ্চার দুধ লাগবে, ঘরে বাজার নেই, চাল নেই, ডাল নেই, এই বলে।
আমি যদি তখন বলি ---আমার কাছে ও টাকা নেই, কি করবো বলো অল্প মাইনে তো পায়।
ও তখন আমাকে খোটা দিতে থাকে--এতোই টাকা যদি না থাকে তাহলে আবার সিগারেট খাও কিভাবে। বাজে জিনিসে টাকা খরচ না করলে হয়না?. ব্যস মাথাটা যায় গরম হয়ে,সবসময় সিগারেট খেতে নিষেধ করে,
এই জগড়া লাগে দুজনের মধ্যে, সারাদিন কর্ম ব্যস্ততার পর রাতে ঘরে ঢুকা মাএই এটা নেই, ওটা নেই শুনতে-: শুনতে জিবনটা ছারখার হয়ে যাচ্ছে। আর পারছিনা। আসলে কি জানো ঘরে অভাব উকি দেওয়া মাএই ভালোবাসাটা বোধ হয় পালিয়ে যায়। অভাবের কাছে ভালোবাসাটা ও একটা সময় হার মানে।
---ভুল বললেন, আসলে যে ভালোবাসা কোনো বাধা-- বিপওির কাছে হার মানে সেটাকে কখনোই ভালোবাসা বলেনা। আর কি জানেন তো প্রিয় মানুষগুলো সবসময় আমাদের ভালো চায় বিধায় আমরা তাদের একসময় আমাদের শএু ও মনে করে ফেলি। যেমনটি আপনে ভাবছেন এখন আপনার স্ত্রীর সমন্ধে।
----- আমি ঠিকেই ভাবছি, আর পারছিনা এসব নিতে,
অসহ্য কর ডিপ্রেশনে এগুলো আমাকে ভুগাচ্ছে তার উপরে আজকে ও তুমুল জগড়া হয়েছে ওর সাথে আমার।
বিরক্ত হয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে এখানে ঘন্টাখানেক হলো বসে আছি।
--- আর নিকোটিন টানছেন তাইতো?
--- হুম। আসলে ডিপ্রেশন টা কমানোর জন্য এই সিগারেটটা হচ্ছে একটা যাদুর মন্ত্র। এটা যদি আমার স্ত্রী টা বুঝতো। মাঝেমাঝে ইচ্ছে করে এসব থেকে একেবারে দূরে কোথাও চলে যাই। এই ভাবনা যখন আমার মাথায় আসে নিকোটিনের সাদা ধূয়াটা তখন আমাকে এসব ডিপ্রেশন, চিন্তাদারা থেকে দূর করে রাখে।
--সত্যিই যদি তাই হতো তাহলে আজ ৩ বছর যাবত আমি ক্রমশ এই নিকোটিনের সাথে বন্ধুত্ব করে যাচ্ছি, কই আমার ডিপ্রেশনটা কেন যাচ্ছে না, কই আমি কেন কষ্টগুলোকে ভুলতে পারছিনা।
মেয়েটির কান্নামাখা কন্ঠের এই কথাগুলো আমাকে খুব বেশি ভাবালো, একটু সহানুভূতিশীল কন্ঠে মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করলাম- মানে?
আমার প্রশ্নটার কোনো উওর না দিয়ে মেয়েটিকে আমাকে বলে উঠলো
--- আচ্ছা ভাই আপনে প্রতিদিন কয়টা সিগারেট খান।
--- তা বোধ হয় ৫- ৬ টা হবে কখনো বা ১ প্যাকেট পুরোই খেয়ে ফেলি। কেন বলোতো?
--- আচ্ছা ভাই আপনে যখন সিগারেটটা মুখের কাছে নেন তখন আপনার প্রিয় মানুষগুলোর মায়া-মায়া মুখ গুলো চোখের সামনে আপনার ভেসে উঠেনা, প্রতিদিন যখন ৩০ টা টাকা খরচ করে সিগারেট কিনেন তখন আপনার বাচ্চা না খেয়ে আছে তার দুধ লাগবে এই কথাটি মনে পড়েনা? সিগারেট টায় যতবার টান দেন তখন এটা মনে হয়না, যে প্রিয় মানুষটা এটা পছন্দ করেনা আমি ওর জন্য এটা থেকে নিজেকে বিরত রাখবো।
মেয়েটির কথাগুলো শুনে প্রচন্ড বিরক্ত কর কন্ঠে ওকে বলে উঠলাম---সিগারেট আমার কষ্ট ভুলাতে অনেক সাহায্য করে। আর তাছাড়া সিগারেট ছাড়া এখন আর আমার একটা দিন ও চলে না।
--- ও তার মানে প্রিয়মানুষ গুলোকে আপনে ছাড়তে পারবেন বাট সিগারেট টা ছাড়তে পারবেননা। কি তাইনা?
মেয়েটির প্রতিটি প্রশ্ন আমাকে ক্রমশ প্রচন্ড রাগে রাগান্বিত করলো, খুব কর্কশ কন্ঠে মেয়েটিকে বলে ফেললাম ---- আচ্ছা এতো আমাকে যে ভাষন দিচ্ছো, কিন্তু তুমি নিজেও তো সিগারেট খাচ্ছো তাও আবার মেয়ে হয়ে। তাহলে তুমি কেন খাচ্ছো, যতসব।
মেয়েটি আমার এই প্রশ্নটা শুনে প্রচন্ড হাসতে লাগলো, এই হাসির রহস্য সাধারন মানুষের বুঝা বড় দায় , এই হাসির আড়ালে যে কত ক্ষত -বিক্ষত কষ্ট আছে তা কেবলেই সেই মানুষটাই জানে। তাই আমি ও আর পাচটা মানুষের মতো এই হাসিটাকে পাগলের কান্ডকারখানা মনে করে, মেয়েটিকে মুখ ফসকে বলে ফেললাম --- পাগলের মতো হাসছেন কেন?
--- হাসছি আপনার কথা শুনে, আচ্ছা আমি তো পাগল আমি মরে গেলে তো কারো কিছু যায় আসেনা আমি মরে গেলো তো কোনো বাচ্চা ক্ষুধার যন্ত্রনায় চিৎকার করবেনা, আমি মরে গেলো তো প্রিয় কোনো মানুষ কাঁদবেনা, কিন্তু আপনে?
আপনে মরে গেলে আপনার পথ চেয়ে রোজ কপালে টিপ দিয়ে, লাল শাড়ি পড়ে অপেক্ষা প্রহরে গুনতে থাকা সেই মানুষটার কি হবে? আপনে মরে গেলে আপনার আদৌ - আদৌ করে বাবা ডাকতে চেষ্টা করা সন্তানটার কি হবে? যেই হাত দিয়ে আপনে আজ সিগারেট ধরছেন সেই হাতটা ধরে আপনাকে একদিন যারা হাটতে শিখিয়েছেন তাদের কি হবে কখনো একবার ও ভেবে দেখেছেন আপনে?
--- আপনে কিন্তু এখন একটু বেশি- বেশি করছেন? ভেবেছিলাম আপনে পাগল এখন দেখি আপনে বিদ্রোহী পাগল, যতসব
সামান্য সিগারেট কিই বা আমার করবে?
মেয়েটি তখন দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে আমাকে বলে উঠলো
---- করে ক্রমশ করে, একটা ঘর তৈরির পর যখন অনেক স্বপ্ন আর আশা নিয়ে আপনে সে ঘরে পা দিতেই আপনার একটা সামান্য ভুলে অথ্যাৎ ঘরটা তৈরিতে ব্যবহৃত কোনো একটা উপকরন ভালো না হওয়ায় ঘরটা ধসে পড়ে যায়, তখন কেমন লাগবে আপনার বলেন তো। তখন আপনে শুধু একটা কথাই ভাববেন--- ইস
ঘরটা তৈরিতে যদি একটু যত্ন আর সতর্ক হতাম তাহলে তো নিজেকে ও নিজের প্রিয় মানুষগুলোকে ও এভাবে ধসে পড়ে মরতে হতো না । সিগারেট টা ও ঠিক তেমন একেবারে মৃত্যুর নিকট আপনাকে নিবেনা,ক্রমশ নিবে,ক্রমশ, যখন আপনে একটু সুখের ছোয়া পাবেন তখনি এটা আপনাকে শেষ করে দিবে যা আপনার সাথে আপনার কাছের মানুষগুলোকে ও শেষ করে দেয়, তাদের আপনাকে ঘিরে তৈরি করা সব স্বপ্নের অবসান ঘটায়। কথাগুলো বলতে-- বলতে
মেয়েটি হঠ্যাৎ আবারো কাঁদতে লাগলো, পাগলের মতো মেয়েটির এই হাসি এই কান্না দেখে বারবার একটা কথাই মন বলছে --- কোন পাগলের পাল্লায় যে আজ পড়লাম আল্লাই জানে।
যাইহোক মেয়েটির কথাগুলোর কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে মেয়েটির এসব ভাষন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য উঠে দাড়ালাম, না এখানে আর থাকা যাবেনা, এসব আলতু- পালতু কথা শুনে মুডটা আরও খারাপ হয়ে গেলো, দুত।
এই বলে যখনি চলে যাওয়ার জন্য এক পা দিলাম, ঠিক তখনি মেয়েটি আমাকে বলে উঠলো---জানেন এক বুক স্বপ্ন নিয়ে না স্বামী র ঘরে পা রেখেছিলাম, কিন্তু স্বপ্নগুলো না পূরণ করতে পারলাম না, নিকোটিনের ধূয়া সবকিছু কেড়ে নেয়, আর দিয়ে যায় তার বিনিময় কালো ছাই।
কথাগুলে শুনে আর সামনে পা দিতে পারলামনা দাড়িয়ে গেলাম, মেয়েটির কাছে আবার গিয়ে বসে পড়লাম, তারপর কৌতুহল বর্শে মেয়েটিকে প্রশ্ন করলাম ---মানে?
---- আসলে আমরা যখন কোনো ডিপ্রেশন ভুগি তখন অনেক সময় অনেক খারাপ জিনিস করে ফেলি যা আমাদের একটু- একটু করে মৃতদারে নিয়ে যায় কিন্তু আমাদের মাথায় তখন এই চিন্তাটা আসেনা যে --- আমি ছাড়া হয়তো এমন কেউ আছে যে চলতে পারবেনা, আমি ছাড়া হয়তো কারো জিবন নিসঙ্গ, আমিই হয়তো কারো বেচে থাকার একমাএ অবলম্বন।
আর এই চিন্তাটা না আসার কারনে ক্রমশ আমরা যেমন আমাদের শেষ করে ফেলি ঠিক তেমনি নিজেদের সাথে আমাদের প্রিয় মানুষগুলোকে ও শেষ করে ফেলি যেমনটি আপনে করছেন। ডিপ্রেশন থেকে বাচতে হলে একেবারে মরে যাননা কেন নিজেকে একটু --একটু করে মারছেন নিকোটিনের ধুয়ায়। সঙ্গে নিজের প্রিয় মানুষগুলোকে ও।
মেয়েটির কথাগুলো শুনে বুঝতে পারলাম যে ও কোনো খারাপ বা রাস্তার মেয়ে নয় হয়তো ভাগ্যদোষে ওর কপালটা এমনটা হলো।কিন্তু নিকোটিনের প্রতি ওর কেন এতো ক্ষোভ , আর এতো ক্ষোভ হলে ও কেনই বা নিকোটিন টানছে।
হঠ্যাৎ মেয়েটি আমার পকেটে হাত দিয়ে সিগারেটের প্যাকেটটা নিয়ে গেলো,তারপর আমার হাত থেকে গ্যাসলাইটটা নিয়ে সিগারেটটা ধরিয়ে টানতে লাগলো আর বলতে লাগলো --- বুঝলেন ভাই, রাহুল মানে আমার স্বামী যার সাথে ভালোবেসে আমি বিয়ে করেছিলাম, এই দুই কুলে ও ছাড়া আমার কেউই ছিলোনা, আসলে ছোটবেলায় মা- বাবা মারা যাওয়ার পর একটা এতিমখানায় থেকে মানুষ হই। জানেন ভাই, জিবনে না কারো ভালোবাসা পেলাম না, খুব
ছোটবেলা থেকেই শিখে গেছি জিবনের মানে, জিবনের পথ কতটা কঠিন। পদেপদে পেয়েছি দুঃখ, যন্ত্রনা আর স্বার্থপর পৃথিবীর মানুষগুলোর জঘন্যতম আচরণ।
এতো দুঃখ পাওয়ার পর ও জিবনটাকে একটু-- একটু করে সামনের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলাম, সবকিছুর সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে স্বপ্নহীন ভাবে চলছিলাম, হঠ্যাৎ সেই সময় রাহুল আসে আমার জিবনে, রঙ্গিন করে দেয় জিবনটাকে এক মুঠো ভালোবাসা দিয়ে , যেই জিবনের কোনো মানে ছিলোনা, কোনো ভালোবাসার স্পর্শ ছিলোনা সেই জিবনে রাহুল এসে জিবনটাকে স্বপ্নিল করে দেয়। ছোট একটা কুড়ে ঘরে দুজনে একরাশ ভালোবাসা আর একরাশ স্বপ্ন নিয়ে বাসা বাধলাম ।কিন্তু সেই বাসার মাঝে নিকোটিনের স্পর্শটা সবকিছু ধ্বংস করে দেয়।
থরথর কন্ঠে মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করলাম ---মানে?
--- মানে! আসলে ওর একটা বাঝে অভ্যাস ছিলো সবসময় কারনে-- অকারনে সিগারেট খাওয়া, প্রচুর পরিমানে ও সিগারেট খেতো। তবে যেদিন ওর সাথে আমার কোনোকিছু নিয়ে একটু কথা কাটাকাটি হতো যেমন --- ঘরে চাল,ডাল কিছুই নেই আর তুমি সে চিন্তা না করে ক্রমশ সিগারেট টানছো, সেদিন বোধ হয় সিগারেটটা ওকে আর ও বেশি গ্রাস করে ফেলতো । আর ওর সিগারেট খাওয়া নিয়ে যদি কখনো কথা বলতাম , সেদিন আমাকে ইচ্ছেমতো বকে, ঘর থেকে বেরিয়ে যেতো। সহজে ঘরে ও সেদিন ফিরে আসতোনা । সারাদিন যা রোজকার করতো তা দিয়ে সিগারেট কিনে শেষ করে দিতো। কখনো বাধা দিতে পারতাম না কেননা সিগারেটের নিশাটা ওর শরীরের সাথে ওতোপ্রতো ভাবে মিশে যায়।
যা ওকে একটু-- একটু করে মৃত্যুদারে নিয়ে যায়। ওর এই অভ্যাসটার জন্য ঘরে আর ও বেশি অভাব দেখা যায়, কেননা ও যে রোজকার করতো তা সিগারেট কিনতেই শেষ করে দিতো।
কিন্তু তবুও ওকে অনেক বুঝিয়ে ওর সাথে মানিয়ে নিয়ে আমি সংসার করছিলাম।আসলে ব্ড্ড বেশি আমরা যাকে ভালোবাসি তার সমস্ত বাঝে অভ্যাস, অপরাধ সবকিছুর সাথে ও আমরা নিজেদেরকে মানিয়ে নিই।
আর আমার এই ধৈ্র্য, আর মানিয়ে নেওয়ার ইচ্ছাশক্তি হঠ্যাৎ চেনা মানুষটাকে বদলে দেয়।
--- বদলে দিলো মানে?
, ---- আমার স্বামী হঠ্যাৎ নিকোটিনকে ত্যাগ করে ফেলে, যখন জানতে পারে আমাদের মাঝে আর একটা নতুন জিবন আসছে।এমন কেউ আসছে যার আদৌ মুখে ও বাবা ডাকটা শুনতে পারবে।
ফিরে আসলো আমার সুখের দিন ছোটকুড়ে ঘরে ছোট-- ছোট স্বপ্ন নিয়ে পার হচ্ছিলো জিবন, আর সাথে আমার ছোটসোনা মনিটারর ও ক্রমান্বয় পৃথিবীর আলো দেখার দিন গনিয়ে আসছিলো।
কিন্তু হঠ্যাৎ সবকিছু আধারের অতলে ঢেকে যায়।
--- কেন?
--- ওই যে ঘরটা তৈরির করার সময় ব্যবহৃত উপকরন গুলো ভালো করে যাচাই করিনি, সর্তকতা অবলম্বন করিনা। তাইতো সুখের ঘরে পা রাখতেই ঘরটা ধসে পড়ে।
আমার যখন বাচ্চা হওয়ার সময় চলে আসছিলো ঠিক তখনি একদিন হঠ্যাৎ করে রাহুল অসুস্থ হয়ে পড়ে, প্রায় ১ সপ্তাহ বিছানা থেকে মাথা উঠাতে পারেনি ক্রমশ সারাদিন কাশি, দূর্বলতা, আর ক্লান্তি বোধে তার জিবন যাচ্ছিলো। ওর এরুপ অসুস্থতা দেখে আমি নিজেকে আর সামলাতে পারছিলামনা, কি করবো বুঝতে পারছিলাম না, পরক্ষণে-- আমার মাথায় আসলো,
প্রতিদিন ওর পকেট থেকে আমি ১০ টাকা করে নিয়ে একটা ব্যাংকে জমা রেখেছিলাম ভবিষ্যৎ কাজে লাগতে পারে এই ভেবে, ব্যস স্বামীর সুস্হতার জন্য
তাড়াতাড়ি ব্যাংকটাকে ভেঙ্গে যে কয়টা টাকা হয়েছে তা নিয়ে ওকে হসপিটালে নিয়ে যাই, ডাক্তার ওর পরীক্ষা- নিরীক্ষা করার পর আমাকে এসে বললো ---ও ব্রকাইটিস রোগে আক্রান্ত।
ডাক্তারের কথাটা শুনে
ধুম করে বসে পড়লাম,চোখের জলগুলো টপ-- টপ করে ঝরে পড়লো, যেই আকাশে আজ এতোদিন পরে অনেক সাধনার পর চাদের দেখা পেলাম, বৃষ্টি এসে সে চাদটাকে কেড়ে নিলো!
আমার চোখের জল দেখে
ডাক্তার বলে উঠলো--- আসলে অতিরিক্ত সিগারেটের খাওয়ার কারনে তার এই রোগ হয়েছে, সাধারনত প্রতিবার ধুমপানের কারনে একজন মানুষের আয়ু কমে যায় পাচমিনিট,
আর আপনার স্বামীকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে যে ওনি ধুমপানের নিশায় মগ্ন, এমন একজন ব্যক্তি স্যরি, আমার কিছুই করার নেই।
কথাগুলো বলে ডাক্তার চলে গেলো, আর আমি? অসহায় ভাবে পেটের মধ্যে হাত দিয়ে বসে রইলাম। যখন সংসার জিবনে সুখের ছোয়া একটু পেতে লাগলাম ঠিক তখনি আধারে স্পর্শে সব ধ্বংস হয়ে গেলো।
সব-- ভাবনা চিন্তা দূরে রেখে নিজেকে শক্ত করে মানুষটার কাছে গেলাম,
না ওকে বুঝতে দেওয়া যাবে, না হলে ও আমাদের বাচ্চার কি হবে এই চিন্তায় আর ও বেশি শেষ হয়ে যাবে।
এসব চিন্তা করতে- করতে আমি ওর কাছে যায়, কেবিনে পা রাখতেই ও আমার পানে তাকিয়ে অঝোর দ্বারা কাঁদতে লাগলো। কাছে যেতেই আমার হাতটা আকড়ে ধরে বলে উঠলো-- আমাকে মাপ করে দিও।
বুঝে ফেললাম মানুষটি বুঝে গেছে ও আর বাচবেনা।
কিন্তু আপনে বলুনতো আমি কিভাবে ওক মাপ করবো, ও ছিলো আমার বেচে থাকার একমাএ অবলম্বন, আর এখন ও আমাকে একা রেখে চলে যাচ্ছে নিজের সাথে আমাকেও মেরে ফেলছে কিন্তু যে আসছে তার কি হবে। পৃথিবীতো আসার আগেই সে বাস্তব তা বুঝে ফেলবে। পমথিবীতে আসার আগেই সে সমাজের মানুষগুলোর কাছে এতিম বলে গন্য হবে।
ওর কথাটার কোনো উওর না দিয়ে আমি কেবিন থেকে বের হয়ে যাই, ওয়াশরুমে গিয়ে অঝোর দারা কাঁদলাম, নিজেকে বুঝালাম ---,অনেক বুঝালাম। তারপর ওর কাছে গেলাম, ওকে অনেক বুঝালাম আরে কিছুনা, তোমার কিছুই হয়নি, এমনি সর্দী, কাশি।
কিন্তু ও সববুঝে ফেলেছে, ওর আত্না বৌধ হয় মৃত্যুপথের কথা জানতে পেরে যায়, আমার গালে হাত দিয়ে টপটপ করে চোখের জল ফেলে বলে উঠলো -যে আসছে তাকে একটু আগলে রেখো, সেদিন ওটাই ছিলো মানুষটার শেষ কথা, সেদিনের পর থেকে ও আর কথা বলেনি নিশ্চুপ হয়ে যায়, আর হয়তো সারাদিন ডিপ্রেশন ভুগতে- ভুগতে একটু বেশি আগেই আমাকে ছেড়ে চলে যায়।
ওর মরদেহটা দেখে আমি নিজেকে সামলাতে পারলাম না , কেমন জানি পাগলের মতো আচরন করতে লাগলাম,মাটিতে গড়াগড়ি করতে লাগলাম।
ওর লাশটিকে যখন সবাই নিয়ে যাচ্ছিলো,তখন আমি আর ও বেশি পাগলের মতো আচরন করতে লাগলাম, পাগলের মতো ওর লাশের পিছুপিছু ছুটতে লাগলাম, অনেক মহিলা আমাকে ধরে রাখার চেষ্টা করে কিন্তু পারেছিলোনা, একটা সময় ঠাস করে পিছল খেয়ে পড়ে যাই, পেটে প্রচন্ড ব্যাথা পাই, প্রচুর রক্তক্ষরন হয়, অজ্ঞান হয়ে যাই।
কিছুসময় পর জ্ঞান ফিরে নিজেকে হসপিটালে পাই, চোখ মেলতেই দেখি একজন
ডাক্তার আর পাশের বাড়ির ভাবিটা আমার সামনে দাড়িয়ে, আমার জ্ঞান ফিরেছে দেখেই
ভাবিটা আমার কাছে এসে আমাকে কান্নামাখা কন্ঠে বলে উঠলো---আমাকে মাপ করে দিস তোর বাচ্চাটা বাচাতে পারলাম, নষ্ট হয়ে গেছে।
কথাটা বুকের মাঝখানে লাগলো , ৯ টা মাস যাকে এতো যত্নে করে রাখার পর , এতো অপেক্ষার তার মুখ থেকে মা ডাকটা শুনার আগেই বিধাথা তাকে আমার থেকে কেড়ে নিলো।
কষ্টগুলো আর নিতে পারছিলাম না, পাগলের মতো নিজের শরীরের উপর নিজে অত্যাচার করতে লাগলাম, আমার এই অবস্থা দেখে ডাক্তার আমাকে ঘুমের ঔষুধ দিয়ে দুইদিন শান্ত করে রাখলো।
তারপর ৩ দিনের দিন হসপিটাল থেকে বের করে দেয়।অবশ্য বের করে দিবেই না কেন, আমার কাছে তো টাকা নামক সেই জিনিসটাই ছিলো না । যেটা ছাড়া এই পৃথিবীর সবকিছু নিঃশ্ব।
সেদিনের পর থেকে আর কারো কাছে আশ্রয় পেলাম না, ক্ষুদার যন্ত্রনায়, আর আশ্রয়হীন ভাবে
একা -- একা পাগলের মতো রাস্তায় -- রাস্তায় পড়ে রইলাম, আর ক্ষুদা লাগলে রাস্তার পাশে আপনেরা যে পচা খাবার পেলে রাখেন তা পৌলাউ - কুমরা মনে করে পেট ভরে খেয়ে নিই। এই আমার জিবন।
কিন্তু কি জানেন প্রত্যহ রাতের আধারে আমার এই শরীরটা
শকুনরা ক্রমশ ছিড়ে খেতে -- খেতে, আজ আমি রাস্তাঘাটের একটা আঘাছা। যার নিজের প্রতি নিজের ঘৃনাবোধ ছাড়া আর কিছুই নেই। আপনে কি চান এমন জিবন আপনার প্রিয় মানুষগুলোর পাক।
চোখের জলগুলো আর ধরে রাখতে পারলাম না, মেয়েটিকে শান্তনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা খুজে পেলাম না, শুধু মেয়েটির শেষ কথাটা বারবার কানের মধ্যে বেজে উঠে ---আপনে কি চান আপনার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে এমন হোক।
একটা ঘৃণিত মনোভাব মনের মধ্যে চলে আসলো,
সিগারেটের প্যাকেটাকে ছুড়ে ফেলে দিলাম, উঠে দাড়ালাম নিজের ফুটফুটে বাচ্চাটার চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে আসলো, নিজের প্রিয়সখার মায়ামাখা মুখটাকে চোখের সামনে ভেসে উঠলো,নিকোটিনকে দূরে সরিয়ে দিয়ে দ্রুত বাড়িতে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে গেলাম।
পিছন থেকে তখন হঠ্যাৎ মেয়েটি বলে উঠলো -- মনে রাখবেন আপনেই হয়তো কারো বেচে থাকার একমাএ আশ্বাস, হয়তো বা কারো একটুকরো সুখ, হয়তো বা কারো একমাএ অবলম্বন। কখনো
নিজের জন্য বাচতে না চাইলে ও অন্তত প্রিয় মানুষগুলোর জন্য বাচার চেষ্টা করুন। একটু সুখে থাকার অভিনয় করুন, আর একটু নাটকীয় জিবন যাপন করুন।
মেয়েটির কথাগুলো বেচে থাকার আশ্বাস বুকে জাগলো, ওকে আরও একবার দেখার জন্য পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখি --- ও নিজ থেকে সিগারেটগুলো তুলে ক্রমান্বয় খাচ্ছে লাগলো। ওর এই কান্ড দেখে
গম্ভীর কন্ঠে ওকে জিজ্ঞা সা করলাম --- এতো কিছুর পর ও তুমি কেন ধুমপান করছো? যেই ধুমপান তোমার জিবনটা শেষ করে দিলো?
মেয়েটি তখন অট্রহাসি দিয়ে বললো--- গত ৩ টা বছর রাহুলকে ছাড়া, আর আমার সোনামনিকে ছাড়া একা থাকছি।
ভাই খুব কষ্ট হয়,
কষ্টটা আর ও বেশি হয় যখন রাতের আধারে শকুন গুলো আমার এই শরীরটাকে নিজেদের খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করে, কেউ নেই ভাই এই শকুনদের হাত থেকে বাচানোর জন্য, আর যে বাচাতো সেতো নিকোটিনের সাথে বন্ধুত্ব করে চলে গেলো , তাই আমি ও নিকোটিনের সাথে বন্ধুত্ব করার চেষ্টা করছি। কিন্তু নিকোটিনটা না আমার সাথে বন্ধুত্ব করছেনা।
আচ্ছা ভাই আমার কেন কোনো রোগ হচ্ছেনা, আর কতকাল এই শকুনের হাতে নিজেকে শপে দিতে হবে।
--- ওর কথাগুলোর কোনো উওর আমার কাছে ছিলোনা। নিশ্চুপতার আড়ালে বারেবারে অসহায়ত্ব মন বলছিলো--- এতো নিষ্ঠুর কেন আমরা মানুষেরা।
-- আপনে বাসায় যান ভাই আপনার প্রিয় মানুগুলো আপনার পথ চেয়ে অপেক্ষায় আছে,কিন্তু আমার জন্য কেউ নেই, ভাই কেউ অপেক্ষা করছেনা। যান ভাই চলে যান।
।
স্বার্থপরের মতো হাটতে লাগলাম, মেয়েটিকে একা ফেলে ।
একবার ও আর পিছনে ফিরে আর তাকালাম না, যদি মেয়েটির প্রতি হৃদয়ে এতোটুকু মায়া জাগ্রত হয় এই ভেবে। কারন মায়া বাড়িয়ে কোনো লাভ নেই,ওর জন্য আমি কিছুই করতে পারবোনা।সব ভাবনা দূরে রেখে,
কখন বাড়ি গিয়ে নিজের প্রিয় মানুষটাকে আর সন্তানটাকে জড়িয়ে ধরে স্যরি বলবো, সেই ভাবনায় মও হলাম। ঠিক তখনি বারবার কেন জানি মনে হলো, সদূর থেকে মেয়েটি আমাকে আবারো বলছে --- নিজের জন্য বাচতে না চাইলো ও প্রিয় মানুষগুলোর জন্য বাচার চেষ্টা করুন।
-: লিখা- আসমা আক্তার পিংকি ( সত্য পথের দিশারী)
āĻোāύ āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āύেāĻ:
āĻāĻāĻি āĻŽāύ্āϤāĻŦ্āϝ āĻĒোāϏ্āĻ āĻāϰুāύ